দুপুরের ছুটিতে আইসা নাইতে ধুইতে হয় নাই দেইখা হাতে একটু সময় রব্বানের ছিল। তাড়াতাড়ি ভাতপানি খাইয়া ভাবছে বাজার মিহি মেলা দিব। আগে ফাসকেলাস এককাপ চা খাইবো সেন্টুর দোকানে তারবাদে আবার গিয়া কামে লাগবো। এই মতলব কইরা উঠি উঠি করছে, লোকটা পান চাবাতে চাবাতে সামনে আইসা খাড়াইলো।
কথা শুইনা রব্বান তার মুখের দিকে তাকালো। তারপর উইঠা দাঁড়াইল। জে কাকা। আমি রব্বান। রব্বান শিকদার। বাড়ি মালখানগর। আপনে আমারে চিনলেন কেমতে? এহেনে তো আমারে কেঐ চিনে না! না না, দুই-চাইরজনে চিনে। যাগো লগে থাকি তারা কহেকজনে চিনে আর চিনে গাছিকাকায়, কাকি আর তার মাইয়ায়। কী জানি নাম মাইয়াডার? মনে অইছে, মনে অইছে। নূরজাহান। দুনিয়ার আলো।
রমিজ পিরিক করে পানের পিক ফেলল, সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, তোমারে বিচড়াইতে গেছিলাম কামের ওই মিহি। হোনলাম খাইতে আইছো ঠাকুর বাইত্তে। এর লেইগা আইলাম। এহেনে আইয়া কহেকজনরে জিগাইছি তোমার কথা। কেঐ চিনে না। শেষমেশ বুড়া এক বেডা দেহাইয়া দিল। উই যে আমগাছতলে বইয়া রইছে ওই ছেমড়ার নাম রব্বান।
রব্বান তীক্ষ্ণচোখে রমিজের দিকে তাকাল। তয় আপনেরে তো চিনলাম না কাকা? আপনে কেডা? কী মনে কইরা আমারে বিচড়াইতে আইছেন? বাড়ি কই আপনেগো? এই গেরামে?
আরে না মিয়া। আমগো বাড়ি কান্দিপাড়া। আমার নাম রমিজ। রমিজ ঘটক।
ঘটক? আপনে ঘটকালি করেন?
ঘটকালি না করলে ঘটক অয় কেমতে মিয়া?
রব্বান তার মধুমাখা হাসিটা হাসল। হ ঠিকঐ কইছেন। যে যেই কাম করে তার নামের লগে হেই কামড়াও জড়ায়া যায়। যেমন নাপতালি করলে অয় নাপিত, মাছ ধরনের কাম করলে অয় জাউলা। কাপড় বুনলে অয় জোলা নাইলে তাতি।
তুমি তো দেহি মিয়া কথার ওস্তাদ!
হ কাকা, কথা কইতে আমার বহুত ভাল লাগে। কথা কইয়া আমি বহুত আরাম পাই। লন হাঁটা দেই। আমার কামের মিহি যাওন লাগবো। আটতে আটতে কথা কমু নে।
লও।
আবার পিরিক করে পানের পিক ফেলল রমিজ। সিগ্রেটে ফুক ফুক করে শেষ দুইটা টান দিয়া রাস্তার ধারে ফালাইয়া দিল। কথাবার্তি হুইন্না মনে অইল তুমি বুদ্ধিমান পোলা। তয় অহন আন্তাজ করো তো, তোমার কথা আমি কার কাছে হোনলাম, ঘটক অইয়া কীর লেইগা তোমারে বিচড়াইতে আইলাম?
রব্বান হাসল। আমি পুরাপুরি কইতে পারুম। ইট্টুও বেমিল হইব না। আপনে আমার কথা হেনেছেন গাছিকাকার কাছে।
ঠিকঐ কইছো। তয় পরেরডাও কও।
মনে হয় গাছিকাকার কাছে আমার বেবাক কথা হুইন্না আপনে আমার লেইগা বিয়ার পোরোসতাব লইয়া আইছেন।
এইডাও ঠিক। তয় কও দিহি কার মাইয়ার লেইগা পোরোসতাব আনছি?
কইতে পারুম কইলাম।
কও। আমি তো হোনতে চাই।
গাছিকাকার মাইয়া। নূরজাহান। দুনিয়ার আলো।
রমিজ মুখের ভিতরকার পানে খচর মচর কইরা দুই-তিনটা চাবান দিল। ঠিক, একদোম ঠিক। তুমি চালাক আছো? বেবাকঐ বুইজ্জা হালাইছো। তয় শেষ কথাডাও কও।
শেষ কথা জানি কোনডা কাকা?
আরে মিয়া, এইডা তো আবার বলদার মতন জিগাইলা।
ও বুজছি বুজছি। নূরজাহানের লগে গাছিকাকায় যুদি আমার সমন্দ করতে চায়, হেই সমন্দে আমি রাজি কি না! রাজি থাকলে…
ওইডি পরের কথা। আগে পয়লাডা কও।
হ।
রাজি কি না?
রমিজের মুখের দিকে তাকায়া তার সুন্দর হাসিটা হাসল রব্বান। নূরজাহান মাইয়া মন্দ না। এক বাপের এক মাইয়া। গাছিকাকায় আর কাকি মানুষ ভাল। তাগো মাইয়াও ভাল। হইবো।
হ মাইয়া ভাল। বহুত ভাল। এক বাপের এক মাইয়া বিয়া করলে জামাই পায় পোলার আদর। ওই আদরডা গাছির ফিমিলিতে তুমি পাইবা।
পয়লা কথাডা যুদি হোনতে চান তয় কই কাকা। ইট্টু শরম করতাছে কইতে, তাও কই।
অন্যদিকে তাকিয়ে লাজুক গলায় রব্বান বলল, আমি রাজি কাকা।
আলহামদুলিল্লাহ।
খুশির চোটে মুখের পানে ঘচর ঘচর করে আবার কয়েকটা চাবান দিল রমিজ, আবার একটা সিগ্রেট ধরাইলো। খাইবানি একখান সিকরেট? অব্বাস আছে?
না কাকা। পান তামুক বিড়ি সিকরেট কোনওডার অব্বাস নাই। অব্বাসের মইদ্যে আছে ইট্টু বেশি কথা কওন। কিচ্ছা মিচ্ছা কওন। তাও পাইছি আমার বাপের কাছ থিকা। আমার বাপের নাম হইল আশ্রাবউলাহ শিকদার। তার কথা আমার মনে নাই। আমি ডাঙ্গর অওনের আগেঐ মইরা গেছে। তার আছিল কিচ্ছা কওনের অব্বাস। বহুত গল্পবাজ মানুষ আছিল। তয় আছিল ভাল মানুষ। আমার লাহান।
হজরতদের বাড়ির ওইদিককার সড়কে উঠে রমিজ বলল, অহন অন্যকথা কও।
বিয়ায় কী চাই হেই হগল কথা?
হ।
কী চামু কন? আপনে তো কাকা আমার খবর বেবাকঐ পাইছেন গাছিকাকার কাছে। বাপের জাগাসম্পিত্তি থাকতেও আমি অহন পথের ফকির। রাস্তার কামে কামলা দিতাছি। তয় এই কামলাগিরি আমি করতে চাই না কাকা। আমার একখান নিশা আছে চায়ের। চা আমি নিজে বহুত ভাল বানাই। এই যে নতুন এতবড় সড়ক অইতাছে এই সড়কের ধারে, বাজার বোজারে যুদি ছোট্ট একহান চা-র দোকান দিতে পারি, এই ধরেন পোনরো-বিশ হাজার টেকা খরচা কইরা চা-র দোকান দিতে পারি তয় আরামছে জিন্দেগিডা কাড়াইতে পারি। চায়ের দোকান চালান হইল হালকা পাতলা কাম। রুজিও করন যাইবো ভাল। এইডা যুদি গাছিকাকায় আমারে কইরা দেয়?
রমিজ পান চাবাল, সিগ্রেটে টান দিল। মনে করো এইডা তোমার অইয়া গেছে।
আলহামদুলিল্লাহ।
তয় থাকবা কই? তোমার তো থাকনের জাগা নাই।
