একটু থামল রমিজ। চায়ে শেষ চুমুক দিল। বুকপকেট থেকে কেঁচি সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে দবিরকে একটা সিগ্রেট দিল, নিজে একটা ধরাল। একমুখ ধুমা ছাইড়া বলল, তয় গাছি টেকা লাগবো আড়াই হাজার।
দবির চমকাল। আড়াই হাজার? কও কী?
হ। এর কমে হইবো না। কামডা বিরাট কষ্টের। মালখানগর হাইট্টা যাওন আহন, জানডা বাইর অইয়া যাইবো। তারবাদে জানের ডর আছে। শিকদাররা কোনওরকমে যুদি কিছু বোঝে তয় আমার জান লইয়া টান দিবো। জান লইয়া টান দিবো মাইনি মাইরা হালাইবো আমারে হেইডা কইতাছি না। ঘেটিমেটি ধাক্কা দিল, অপমান করল, এই হগল আর কী!
এই হগল তারা ক্যান করবো আমি বুজতাছি না। আর তুমিঐ তো কইলা বহুত চালাকি কইরা কামডা তুমি করবা! আর তুমি তো রব্বানের জাগাজমিন উদ্ধার করতে তাগো ওইমিহি যাইতাছে না। তারা তোমার উপরে চেতবো ক্যা?
রমিজ বুঝল সে ধরা খেয়ে যাচ্ছে। সে যেইরকম ধাউর জিনিস, মালখানগরের শিকদাররা তার চুলের আগাও ছুঁইবো না। যে-কোনও বাড়িতে ঢোকার অনেক তরিকা তার জানা। কথা বাইর করার তরিকা জানা। ঘটকরা কথা বেইচ্চা খাউন্না মানুষ। তাগো লগে চালাকিতে গিরস্তরা পারেনি।
সিগ্রেটে বড় করে টান দিয়া রমিজ বলল, হেইডা ঠিকঐ আছে। অপমান তারা আমারে করতে পারবো না। ওই হগল আমি মেনেজ করুম। তয় যাওন আহনের কষ্ট। রাইতে থাকনের কষ্ট। খাওন দাওনের খরচা। গাছি, আড়াইয়ের নীচে অইবো না।
দবির শুরু করল দেড় থেকে। না ঘটক, দেড় পাইবা। কামডা কইরা দেও।
না না, দেড় মেড়ে অইবো না।
দেড় কম না। চিন্তা কইরা দেহো। মালখানগর যাওন আহন, থাকন খাওন বড়জোর তিনশো খরচা। বাকি বারোশো তোমার কামের।
না না দেড়ে অইবো না গাছি। আড়াইঐ লাগবো।
শেষতরি দুইয়ে রাজি হইল রমিজ। আজই কাজ শুরু করবে সে। প্রথমে রব্বানকে খুঁইজা বাইর কইরা তার খবরাখবর, মতামত লইবো। মতামত লইয়া আইবো গাছির। বাইত্তে। একহাজার এডভান্স নিবো। নিয়া কাইল মেলা দিব মালখানগর। পাঁচদিনের দিন বিয়ালবেলা গাছির বাইত্তে আইয়া বেবাক খবর দিবো। হেদিন নিবো বাকি একহাজার। আর বিয়া যদি রব্বানের লগে নূরজাহানের হয় তয় একখান নতুন লুঙ্গি আর একখান। সিল্কের পাঞ্জাবি দিতে হইবো রমিজরে। কিসসা খতম।
রমিজের লগে এইভাবে কিসসা খতম করে বাড়ি ফিরল দবির। জশিলদিয়া থেকে চক পাড়ি দিয়া মেদিনীমণ্ডল আসতে আসতে দেখে মাথার উপর শেষ ফাল্গুনের বিশাল ঝকঝকা আকাশ। মাইল মাইল চকমাঠ সবুজ হয়ে আছে ইরির তরতাজা চাড়ায়। ইরি চকের ফাঁক ফোকর দিয়া নালা ধরে বইছে পানির ধারা। এক খেত থেকে আরেক খেতে যাচ্ছে পানি। গুমগুম গুমগুম করে চলছে পাম্প মেশিন। দুই-চারজন গিরস্ত লোক এইদিক ওইদিকে তদারক করছে ধান পানির। বিলের বাড়ির উঁচু শিমুলগাছটায় যেন আগুন লেগে গেছে, এত ফুল ফুটেছে। রোদে ভেসে যাওয়া আল্লাহপাকের এই সুন্দর দুনিয়ার দিকে তাকায়া দবির মনে মনে বলল, হে আল্লাহ, হে পাকপরওয়ারদিগার, আমার মনোবাঞ্চা তুমি পূরণ করো মাবুদ। আমার নূরজাহানরে পছন্দ মতন জামাই দেও। তারে সুখে শান্তিতে রাখো। তুমি। যা চাও তাই তো হয়। তোমার ইশারা ছাড়া গাছের পাতা লড়ে না। তুমি ইশারা করো। রব্বান যা যা কইছে বেবাক কথা য্যান সত্য হয়। রব্বানের লগে য্যান আমার নূরজাহানের বিয়া অয়। তুমি রহম করো মাবুদ, তুমি রহম করো।
.
ওই মিয়া, তোমার নাম রব্বান?
রমিজের হাতে কেঁচি সিগ্রেট জ্বলছে। মুখে একটা পানও আছে। ডাইন হাতের বুইড়া লউংয়ের পরের লউংয়ে এক চিমটি চুনা লাগানো। কথার ফাঁকে লউং থেকে একটুখানি চুনা দাঁতে লাগাল। পান চাবাতে চাবাতে সিগ্রেটে টান দিল। তার পরনে নীল লুঙ্গি আর হলুদের কাছাকাছি রঙের সিল্কের পুরানা পাঞ্জাবি।
এখন দুপুরের শেষভাগ। রব্বান বসে আছে ঠাকুরবাড়ির মাইট্টালরা যেখানে থাকে সেখানে, আমগাছতলার ঘাসে। তার চারপাশে নৌকার ছইয়ের মতন অনেকগুলি ছই। ছইয়ের উপর পাতলা সাদা পলিথিন, আকাশি রঙের পলিথিন। এইগুলি মাইট্টাল কামলাদের থাকার ঘর। শীতকাল গেছে, তখন ছইয়ের উপর পলিথিন দেওয়ার দরকার হয় নাই। এখন দিতে হইতাছে বৃষ্টির হাত থিকা বাঁচার জন্য। বৃষ্টির তো কোনও ঠিকঠিকানা নাই। যে-কোনওদিন দিনে আর নাইলে রাইত্রে দুই-চাইর ছিটা নামলেই হইল। ঘুমের তেরোটা বাজবো। এইজন্য শীত শেষ হওয়ার লগে লগে ছইয়ের উপরে পলিথিন লাগাইছে মাইট্টাল কামলারা, জোগালুরা।
সকাল থেকে আজ কাজে লাগছে রব্বান। কামলার কাজ। গোড়া ভরতি কইরা ইটা বালি সুরকি রাস্তায় নিয়া ফালাইছে। তার লগে আছে রাড়িখালের দল। তয় দুপুর তরি কাজ করার পর ঘেটি টনটনাইতাছে। দুপুরে একঘণ্টার ছুটি আছে নাওয়া ধোওয়া খাওন দাওনের। সেই ছুটিতে আইসা নাওন ধোওনের কাজটা রব্বান করে নাই। লাভ কী? নাইয়া ধুইয়া তো ওই কামেই যাওন লাগবো। শইল্লে তো মাটিমুটি ভরবোই। তার থিকা বিয়ালে কাম সাইরা একবারে নাইয়া হালাইলেই হইল।
খাওয়াদাওয়া শেষ কইরা এই মতলব লইয়া সে বইসা আছে। বিড়ি সিগ্রেট পান তামাক কোনওটার অভ্যাস নাই। শুধু তিনবেলা ভাতটা হইলেই হইল। আর একটু চা। চায়ের একখান নেশা রব্বানের আছে। সকালে নাস্তা খাওনের পর, দুপুরে ভাত খাওনের পর আর বিকালে এককাপ কইরা চা খাইলে তার শইল্লে বেদম ফুর্তি আসে। এখন ভাত পানি খাওনের পর তার খুব চা খাইতে ইচ্ছা করতাছিল। ইট্টু পরঐ কামে গিয়া লাগতে হইব। কামের ওইখানে চা পাওয়া যায়। দেশগ্রামের কয়েকটা পোলাপান হাতে বিরাট ফেলাস (ফ্লাস্ক) আর একহান বালতিতে চায়ের কাপ লইয়া ঘোরে। কাপটি অতি ছোট। পোলাপানের খেলনাপাতির মতন। হেই কাপের এককাপ চা’র দাম আটআনা। তিন চুমুকও অয় না। দুই চুমুকেই কাপ ফিনিশ। আর এমুন পচা চা, ফেলাসের বাইক্কা (বাসি) গন্দ আর চিনিতে ভরা। খাইলে চা মনে অয় না, মনে অয় চিনি গোলা গরম পানির শরবত। মাইট্টাল কামলারা অনেকে ফুটাংগিরি (ফুটানি) মাইরা ওই চাঐ ফুরুক ফুরুক কইরা খায়। রব্বানও বিয়ানে এককাপ খাইছে। খাইয়া দুনিয়ার বিরক্ত। ইস এর থিকা ঘোড়ার মুত খাওন ভাল।
