হারুন আইসা দোকানে বসার পর বাড়ি যায় রমিজ। গিয়া নাস্তাপানি খায়। আর যেদিন ঘটকালির কামে কোথাও যাইতে হয় সেইদিন বাজারেই নাস্তা করে। দোকানে বইসা মোস্তফার চায়ের দোকান থেকে দুইখান পরোটা, একটুখানি সুজির হালুয়া আর গোরুর খাঁটি দুধের এক গেলাস চা। খাইয়া দাইয়া, একখান কেঁচি সিগ্রেট ধরাইয়া ঘটকালির কামে মেলা দেয়।
আজ দবির তারে বাড়িতে না পাইয়া যখন বাজারে আসছে, দবিররে দেইখা মুখটা একটু কালা করল রমিজ। দোকানে গাহেক নাই। একলা চুপচাপ বইসা আছে রমিজ। দুইদিকে মাথা নাইড়া বলল, না গাছি, তোমার মাইয়ার কপাল ভাল না। দোজবর, বুইড়া ধুইড়া ছাড়া তো জামাঐ পাই না। মান্নান মাওলানা তোমার মাইয়ার মনে অয় বিয়া বন্দ কইরা রাকছে। নাইলে এত চেষ্টা আমি করতাছি, কাম অইতাছে না ক্যা? আমার ঘটকালি জীবনে তো এমুন কেস আর দেহি নাই। আইজ শ দুয়েক দিয়া যাও। সাতঘইরার এক পোলার খবর পাইছি। হারুন দোকানে আইলেঐ ওই পোলার খোঁজে মেলা দিমু।
দোকানের সামনে কাঠের একটা বেঞ্চ পাতা। বেঞ্চের দুইপাশ দিয়া দুইখান হাত দশেক লম্বা মাঝারি মাপের মোটা পুরানা বাঁশ খাড়া কইরা দোকানের ঝপ উপরের দিকে উঠানো। দবির বেঞ্চে বইসা হাসল। না ঘটক, সাতঘইরা তোমার যাওন লাগবে না।
রমিজ অবাক। ক্যা? মাইয়া বিয়া দিবা না? নাকি বিয়া ঠিক কইরা হালাইছো?
না না ঠিক করি নাই। ঠিক করনের লেইগাঐ তোমার কাছে আইছি। বাইত্তে না পাইয়া দোকানে আইলাম।
রমিজ উদগ্রীব হল। বিষয়ডা কী কও তো?
হারুনের দোকান বরাবর ওইপাশে মোস্তফার চায়ের দোকান। দবির সেইদিকে তাকায়া বলল, দুইকাপ চা পাড়াও এইমিহি।
মোস্তফার কর্মচারী রমজান বলল, আনতাছি।
রমিজের তখন অন্য কোনওদিকে খেয়াল নাই। খালি মনে হইতাছে একটা কাম হাতছাড়া হইয়া গেল। গাছিরে ম্যালাদিন ধইরা ঘুরাইয়া, টালটি পালটি কইরা টেকা খাওনের বন্দবস্তডা নষ্ট অইয়া গেল। কামের কাম কিছুই না কইরা, পোলা দেহনের কথা কইয়া, আবল তাবল পোলার খোঁজখবর দিয়া টেকা খাওয়ার কামডা ভালই চলছিল। ওইডা গেল।
দবির বলল, ঘটকালির কাম তুমিই করবা। পোলাড়া খালি আমার দেহা। টেকা পয়সা কিছু তোমারে আমি দিমু। আমি মানুষ ঠকাই না। যে যেই কাম কইরা যা পাওনের হেইডু। তারে আমি দেই।
দবিরের কথায় হারিয়ে যাওয়া ভরসা ফিরা আসল রমিজের। মুখে হাসি ফুটল। তয় ঘটনা কইয়া হালাও। দেরি করতাছো ক্যা?
রমজান দুই গেলাস চা নিয়া আসল। রমিজ আর দবিরের হাতে ধরাইয়া দিয়া যেইভাবে আসছিল সেইভাবে পা চালায়া ফিরা গেল। রমিজ উত্তেজনায় বিরাট একটা চুমুক দিল চায়ে। লুইস করে একটা শব্দ হল।
দবিরও তার চায়ে চুমুক দিল। তারপর রব্বানের কথা পুরাটা খুলে বলল। রমিজ চা খেতে খেতে শুনল। চা শেষ করে কেঁচি সিগ্রেট ধরাল। এখনও সকালের নাস্তা করা হয় নাই। খালি পেটে চা, লগে সিগ্রেটে, গ্যাসট্রিকের সমস্যা আছে, ওইসব মনেই রাখল না। কিছুক্ষণ পর বুক গলা জ্বলবে, পেটে বায়ু জমবে, ভাবলই না। মন দিয়া দবিরের কথা শুনল। শুইনা খুশি। ভাল পোলা তো?
হ পোলা ভাল। আমগো পছন্দ অইছে। মাইয়ার মায়ও পোলা দেখছে।
তয় আমার অহন কী করন লাগবো?
রব্বানের লগে কথা কইবা।
অর্থাৎ ঘটকালি?
হ। সাফ ঘটকালি। চৌদ্দো গুষ্টির খবর লইবা। মালখানগর যাইবা। শিকদারবাড়ির পোলা। রব্বান যা যা কইছে বেবাক ঠিক আছে কি না, বাপ দাদার নাম অর্থাৎ…
বুজছি বুজছি। আর কওন লাগবো না। আমি জানি অহন কেমতে কী করতে অইবো।
তয় আইজ থিকাই কামে লাগো। রব্বানরে বিচড়াইয়া বাইর করতে একমিনিটও লাগবো না তোমার। আগে অর লগে কথাবার্তা কইয়া তারবাদে দুইয়েক দিনের মইদ্যে মালখানগর যাও।
রমিজ চায়ে চুমুক দিয়া চিন্তিত গলায় বলল, হেইডা নাইলে গেলাম। তয় তুমি যেমতে যা কইলা, চাচায় আর চাচাতো ভাইরা জাগাসম্পিত্তির বিষয়ে রব্বানের উপরে যেমুন চেতা, রব্বান জানের ডরে পলাইয়া আইছে, আর জিন্দেগিতে ওই মিহি যাইবো না। এই অবস্থায় ওই গেরামে রব্বানের চাচা আর চাচাতো ভাইগো কাছে তার সমবাত লইতে যাওন ঠিক অইবো কি না বুজতাছি না। গেলে না আবার ঘেটি ধাক্কা খাই। লাখিগুতাও খাইতে পারি, গোরুর লাডি দিয়া চকে হালাইয়া পিডাইতেও পারে।
দবিরও চায়ে চুমুক দিল, চিন্তিত হল। এইডা কথা খারাপ কও নাই। তয় পোলার বাপ দাদার জাত বংশের খবরাখবর না লইয়া মাইয়া বিয়া দেই কেমতে? রব্বান যা কইছে ওইডা বিশ্বাস কইরা বিয়া দিলাম, পরে দেহা গেল বেবাক মিছাকথা।
না না, সমবাত না লইয়া আথকা একজনরে পছন্দ অইলো আর মাইয়া বিয়া দিয়া দিবা, ঘটক অইয়াও এই কথা আমি কমু না। আছে, খবরাখবর লওনের অন্যপথ আমার জানা আছে।
কেমুন কও তো?
মালখানগর আমি যামু। গেরামের মানুষজনের লগে কথা কইয়া শিকদার বংশের খবর লমু। রব্বান রব্বানের বাপের খবর লমু। গেরামের মাইনষে বেবাকতে বেবাকতের খবর রাখে। রব্বান হাছা কইছে না মিছা কইছে পাঁচ মিনিটে আমি জাইন্না হালামু।
দবির হাসল। ভাল বুদ্ধি।
আরে মিয়া বুদ্ধি ভাল না অইলে ঘটক অওন যায়নি। তয় ওই শিকদার বাইত্তেও আমি যামু। রব্বানের চাচা, চাচতো ভাই বেবাকতের লগে আমি কথা কমু। এমুন কায়দা কইরা তাগো পেট থিকা রব্বানের কথা বাইর করুম তারা উদিসও পাইবো না। তিন দিন সময় নিলাম। আইজ কাইল পশশু। আইজ রব্বানরে বিচড়াইয়া বাইর কইরা অর লগে কথা সারুম। কাইল বিয়ানে উইট্টা মেলা দিমু মালখানগর। ফজরের আয়জানের লগে লগে মেলা দিলে…। না না তিনদিনে অইবো না গাছি। মালখানগর যাইতে একদিন লাগবো, আইতে একদিন লাগবো। মাঝখানে একটা দিন যাইবো খবরাখবর লইতে। আগে পিছে দুইদিন, মাঝখানে তিনদিন। মোট পাঁচদিন। পাঁচদিনের দিন বিয়ালে তোমার বাইত্তে আইয়া তোমারে ফাইনাল কথা জানামু।
