গামছায় হাতমুখ মুছতে মুছতে জলচকিতে বসল দবির। হামিদা চা এনে দিল। চায়ে চুমুক দিয়া বলল, কামে লাগছেন নি বাজান?
হামিদার হাতে নিজের খালি চায়ের কাপ দিয়া রব্বান বলল, না কাকা লাগি নাই। যেই কাম চাই ওইডা অরা আমারে দিবো না। ম্যানাজারের নিজের লোক আছে। তাগো দেয় ভাল কাম আর তাগো কাছ থিকা ম্যানাজারে কমিশন খায়। আমি একবার কইতে চাইলাম, দিমু নে, আমিও কমিশন দিমু নে। তয় কইতে সাহস পাই নাই। কইলে দেহা গেল হিতে বিপরীত হইল।
তয় অহন কী করবেন?
ওই কাম করুম। গোড়ায় কইরা ইটা বালি টানুম।
ভারী কাম তো? পারবেন?
পারতে অইবো। নাইলে খামু কী? তয় আমার মনে হয় কী কাকা, দুই-চাইরদিন কষ্টমষ্ট কইরা করতে পারলে অব্বাস অইয়া যাইবো। অন্য মাইনষে পারলে আমি পারুম না ক্যা? তাগো শরিলও শরিল, আমার শরিলও শরিল।
দবির কথা বলল না। রান্নাচালায় দবিরের জন্য তামাক সাজাতে ব্যস্ত হামিদা। তবে কান পাইতা রাখছে উঠানের দিকে। আড়চোখে রব্বানকে দেখছে আর তার কথা শুনছে।
বিকালের রোদ এখন গাছপালার মাথায় আর ঘরের চালে উঠতে শুরু করেছে। চকেমাঠে পড়ে থাকা রোদ ধীরে ধীরে মোলায়েম হচ্ছে। চারদিকে ঝিরঝির করে বইছে হাওয়া। পাখপাখালি ডাকছে গাছে গাছে। গরম ভাবটা কমতে শুরু করেছে।
দবির বলল, তয় থাকনের ব্যবস্তা কী করলেন? ঠাকুর বাইত্তে আছেন? ওই যে মকবুল না কি ওই বেডার লগে?
ওই বাইত্তে আছি। তয় ওই বেডার লগে না। আপনেরে কইছি না বেডার সবাব ভাল না। আমি অহন থাকি অন্য একটা ছাপরায়। রাড়িখালের ওই দিককার মাইটাল অরা। মানুষটি ভাল।
একটু থামল রব্বান। তারপর বলল, কী আর করুম কন কাকা? এই জীবনডাই আমি আস্তে আস্তে মাইন্না লইতাছি। তয় বিপাকে পড়ম রাস্তার কাম শেষ অইয়া গেলে! তহন যামু কই? কাম পামু কই? খামু কী? তহন মনে অয় দেশগেরামে আর থাকন যাইবো না। ঢাকার টাউন মিহি মেলা দেওন লাগবো। ঢাকার টাউনে গিয়া জোগালুর কাম করুম আর নাইলে রিশকা চালামু। তয় কথা ওই একটাঐ, মালখানগর মিহি আর কোনওদিন যামু না। মইরা গেলেও যামু না!
দবির কথা বলল না। চায়ে শেষ চুমুক দিয়া রান্নাচালার দিকে তাকাল। হামিদা দ্রুত পায়ে আইসা কাপটা আগে নিল তারপর হুঁকা ধরাইয়া দিল দবিরের হাতে। দবির আনমনা ভঙ্গিতে তামাক টানতে লাগল।
বিকাল শেষ হয়ে আসার লগে লগে উঠল রব্বান। তয় আমি অহন যাই কাকা। হাজ অইয়াইলো। দোয়া রাইখেন। কাইল থিকা আল্লার নাম লইয়া কামে লাইগ্যা যামু। রাড়িখালের অগো লগেঐ থাকুম, অগো লগেঐ খামু। খরচা কম। টেকা পয়সা ভালই জমান যাইবো।
হামিদা দাঁড়িয়ে ছিল রান্নাচালার ওদিকটায়। তার দিকে তাকাল রব্বান। যাইগো কাকি! দোয়া রাইখেন।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে বাঁশঝাড়তলার ওদিক থেকে ফিরা আসছে নূরজাহান। লগে ভাদাইম্মা আছে। সে যখন উঠানের দিকে আসছে, রব্বান তখন বাড়ি থেকে নামছে। মুখ ঘুরিয়ে সে একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল। কথা বলল না।
পশ্চিম আকাশে ডিঙ্গি নৌকার মতন একটুখানি চাঁদ দেখা যাচ্ছে।
.
রব্বানরে কেমুন দেখলা?
আজ রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আর ঘরে তামাক নিয়া বসে নাই দবির। নূরজাহান শুয়ে পড়ার পর তামাক সাজায়া হুঁকা হাতে উঠানে আইসা বসছে। হামিদা তখনও টুকটাক কাজ করছে ঘরে। দবিরকে উঠানে গিয়া বসতে দেখে বুঝতে পারছে, কথা আছে। নূরজাহান শুয়ে পড়েছে ঠিকই, মনে হয় ঘুমায় নাই। এইজন্য দবির গেছে উঠানে। আর এখন ফাল্গুন মাইসা রাইত। ঘরের থেকে উঠানে আরাম বেশি। অন্ধকার জোনাক পোকা জ্বলে চারদিকে, দুয়ারের সামনে জ্বলছে কুপি, হাওয়ায় শিমুল ফুলের মৃদু গন্ধ। উঠানে অনেক রাত তরি বইসা থাকতে আরাম লাগে।
দবির শুধু আরামের জন্য উঠানে আসে নাই, আসছে হামিদার লগে রব্বানরে নিয়া কথা বলার জন্য। হামিদাও সেইটা বুঝছে। বুইঝা হাতের কাজ শেষ কইরা স্বামীর পাশে আইসা দাঁড়াইছে। দবির ফিরি নিয়া বসছে। হামিদাকে দেখে তামাক টানা থামায়া কথাটা জিজ্ঞাসা করল।
হামিদা বলল, না পোলা ভাল। আমার পছন্দ হইছে।
ঘরজামাই করবানি এই পোলা?
আমার আপিত্তি নাই।
একবার দেইখাঐ এত পছন্দ কইরা হালাইলা?
ভাল মানুষ এক পলক দেকলেঐ চিনো যায়। পোলাডার মুকহান দেকলেঐ মায়া লাগে। কথা হুনলে মায়া লাগে। আদব লেহাজ জানা পোলা। তোমারে দেইক্কা জলচকি ছাইড়া দিল। আমারে কাকি কাকি করল। কথা কয় কী সোন্দর কইরা। না পোলা ভাল। এমুন পোলার কাছে যে কেঐ মাইয়া বিয়া দিতে চাইবো। খালি একহান জিনিসঐ খারাপ। মুখের দাড়িমোচ।
ওইডা কোনও বিষয় না। দাড়িমোচ কামাইতে কতক্ষুন লাগে। দুলালের সেলুনে গেলেই অইলো।
দবির কয়েকটান তামাক খেল। তোমার মাইয়ার মতলব কিছু বুজলানি?
কেমতে বুজুম? ও তো রব্বানের লগে কথাবার্তি কয় নাই।
দেখছে তো?
হ দেখছে। পয়লা ও ওই দেখছে।
মাইয়ার মুক দেইখা বুজা যায় নাই পোলাডারে অর ভাল লাগল না মন্দ।
আমার মনে অয় মন্দ লাগে নাই।
কেমতে বুজলা?
আমার মাইয়ারে আমি চিনি। তোমার আমার যারে ভাল লাগবো, পছন্দ অইবো তারে অরও ভাল লাগবো, অরও পছন্দ অইবো। তুমি আমি দুইজনেঐ মরনি বুজির পোলা মজনুরে পছন্দ করছিলাম, তোমার মাইয়াও করছিল।
কেমতে বুজলা? মজনুরে লইয়া তোমারে কিছু কইছে?
