হামিদা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল, একটু ব্যস্ত হল। সেই ফাঁকে রব্বানকে খেয়াল করে দেখল। তারপর বলল, আহেন বাজান, বাইত্তে আহেন। আপনের কাকায় আপনের কথা আমারে কাইল কইছে। নূরজাহানরে কয় নাই। নূরজাহান জানে না। এর লেইগা আপনেরে চিনে নাই। আহেন, আহেন। নূরজাহান, জলচকিডা আন। বইতে দে।
রব্বান হাসিমুখে বাড়িতে উঠল। আপনেও তো দেহি কাকার লাহানঐ কাকি? নাম হুইন্নাঐ আপন কইরা লইলেন! আমি তো আমার মা’রে দেহি নাই, আমার জন্মের পর পরঐ মইরা গেছে। দেখছি চাচিরে। তয় হেই চাচি আদর কারে কয় জানে না। খালি ধমকাইতো! কিলওঁতা মারতো। মা’র আদরডা আমি কোনওদিন পাই নাই। আপনেরে দেইক্কা মনে অইলো, আমার মা’য় মনে অয় আপনের লাহানঐ আছিল। বাপে মনে অয় আছিল গাছিকাকার লাহান। দুইজনেরঐ মন ভরা মায়া।
নূরজাহান ততক্ষণে জলচৌকি নিয়া আসছে। বড়ঘরের ছেমায় রাখছে জলচৌকি। সে কথা বলল না। হামিদা বলল, বহেন বাজান, বহেন।
রব্বান বসতে বসতে বলল, কাকায় কো?
ইরিখেতে গেছে। হারাদিন খেতে আছিল। বিয়ান থিকা খেতের পানি, ধানচারা ঠিক আছে কি না দেখছে। দোফরে বাইত্তে আইয়া ভাতপানি খাইয়া ইট্টু জিরাইছে তারবাদে আবার গেছে। আপনে বহেন। অহনঐ আইয়া পড়বো। ও নূরজাহান, মুড়ি মিডাই দে। আমি এককাপ চা বানাই।
রব্বান বলল, না না কাকি কিছু লাগবে না। আপনে বহেন, আপনের লগে কথাবার্তি কই।
হেইডা কন। তয় মুড়ি মিডাই খাইতে খাইতে কন। আমি চা না বানাইলাম, নূরজাহান বানাইবোনে। আমার মাইয়া কামের আছে। রান্দনবাড়ন খুব সোন্দর।
নূরজাহান দাঁড়ায়া আছে বড়ঘরের কপাট ধইরা। হামিদার কথা শুনে একটু যেন শরম পাইল। মাথা নিচা কইরা খাড়ায়া রইল। মুড়ি মিঠাই দিব কি দিব না বুঝতে পারছে না। হামিদা বলছে দিতে, রব্বান বলছে, দেওনের কাম নাই। কোনটা করব নূরজাহান?
হামিদার কথা শুনে রব্বান মুগ্ধচোখে তাকাইছে নূরজাহানের দিকে। ফাগুন দিনের বিকালবেলার রোদ আছে উঠানে। সেই রোদের আভা গিয়া পড়ছে নূরজাহানের মুখে। তাতে ভারী সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। রব্বানের বুকে একখান দোলা লাগল।
হামিদা তাকাল নূরজাহানের দিকে। কী রে, মুড়ি মিডাই দিলি না?
নূরজাহান কোনওরকমে বলল, সেয় যে না করতাছে।
আরে সেয় তো না করবো। তর দেওন তুই দে। তারবাদে চা বানাইতে যা।
রিকাবিতে করে মুড়ি আর নারকেল দিয়া তৈরি করা খাজুড়া মিঠাই এনে রব্বানের হাতে দিল নূরজাহান। যদিও ঘটনা সে জানে, তবে বুঝতে দিচ্ছিল না হামিদাকে, তবু শরম করছিল তার। রব্বানের মুখের দিকে যেন তাকাতে পারছিল না।
রিকাবি হাতে নিয়া রব্বান আড়চোখে একবার নূরজাহানকে দেখল।
মুড়ি মিঠাই খেতে খেতে হামিদার দিকে তাকাল রব্বান। বহেন কাকি, বহেন। আমার কাছে শরম পাইয়েন না। আমি আপনের ছেলের মতন। ছেলের কাছে মা’র আবার শরম কীয়ের। আমারে একহান ফিরি দেন আর আপনে বহেন এই জলচকিতে। তারবাদে মায়ে পুতে কথাবার্তি কই! কাকায় আহুক, তার লগে দেহা কইরা তারবাদে যামু নে।
না না বাজান, আপনে জলচকিতেই বহেন। আমি ফিরি আইন্না বইতাছি।
ভাদাইম্মা ছিল বাঁশঝাড়তলার দিকে। বাড়িতে অচেনা মানুষের গলা পেয়ে ছুঁইটা আসছে। আইসা রব্বানরে দেইখা দুই-তিনখান ঘেউ দিছে। হামিদা তারে দিছে ধমক। খেউক্কাই না। আমগো চিন পরিচিত মানুষ।
নূরজাহান তখন চা বানাতে গেছে রান্নাচালায়। মনের ভিতর তার অদ্ভুত এক অনুভূতি। এই মানুষটা যুদি তার জামাই হয়! এই বাড়িতেই যুদি থাকে! মানুষটারে কি তার ভাল লাগবে! মানুষটার কি ভাল লাগবো তারে!
রব্বান যখন চা খাচ্ছে তখন দবির আসলো। খেতখোলার কাজে হাত পায়ে প্যাককাদা লাইগা আছে। আনমনা ভঙ্গিতে বাড়িতে উঠছিল, রব্বানকে উঠানে বসে থাকতে দেখে অবাক। হাসিমুখে বলল, আপনে কুনসুম আইলেন বাজান?
রব্বান চায়ের কাপ হাতে উঠে দাঁড়াল। আইছি তো অনেকক্ষুন হইল কাকা। কাকি মুড়ি মিডাই চা বেবাক খাওয়াইছে। আপনের লেইগা দেরি করতাছিলাম আর আপনেগো। কথা চিন্তা করছিলাম। আপনে যেমুন ভাল মানুষ, কাকিও আপনের মতন ভাল মানুষ। নূরজাহানের লগে তেমুন কথা হয় নাই। দেখছি তারে। তয় এইডা আমি সাফ সাফ বুজছি, মা-বাপ ভাল হইলে মাইয়া ভাল না হইয়া পারে না। আপনেরা তিনজনেই ভাল মানুষ।
দবির আগের মতনই হাসিমুখে বলল, ইট্টু বহেন বাজান, আমি হাত-পাও ধুইয়াহি।
তারপর হামিদার দিকে তাকাল। নূরজাহানের মা, আমার লেইগা তামুক সাজাও।
হামিদা বলল, চা খাইবা না? তোমার লেইগাও তো চা রাকছে নূরজাহানে।
তয় দেও। আগে চা দেও। তারবাদে তামুক।
দবির ঘাটপারের দিকে চলে গেল।
নূরজাহান এদিকটায় নাই। রান্নাচালায় বসে চা বানাইছে, সেই চা হামিদা নিয়া দিছে রব্বানরে। নূরজাহান তারপর চলে গেছে বাঁশঝাড়তলার দিকে। পিছন পিছন গেছে ভাদাইম্মা। নূরজাহান যেদিকে যায় সেও যায় সেইদিকে। নূরজাহান যায় আগে আগে, পিছন পিছন লেজ নাড়তে নাড়তে যায় ভাদাইম্মা।
তবে বাঁশঝাড়তলার দিকে কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য দিনের মতন ভাদাইম্মাকে নিয়া ছুটাছুটি হইচই করছে না নূরজাহান। আজ সকাল থেকেই সে গম্ভীর। এখন রব্বানকে দেখে আরও গম্ভীর হয়েছে।
ঘাটপার থেকে উঠানে এসে দবির দেখে জলচকি ছেড়ে ফিরিতে বসেছে রব্বান। হামিদা চলে গেছে রান্নাচালায় দবিরের চা গরম করতে। দবিরকে দেখে রব্বান হাসিমুখে বলল, আপনে জলচকিতে বহেন কাকা। বইয়া চা তামুক খান। আমি আর ইট্টু বহি, তারবাদে যামু নে।
