কথা বলতে বলতে পানিতে চোখ ভরে গেল মানুষটার। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চাদরের খুঁটে চোখ মুছল সে। মুছতে মুছতে বলল, সত্য কথাডা তোমারে আমি কই বইন। এই গেরামে আহনের আগে তোমগো কথা আমার মনেই অয় নাই। মনে অইছে এহেনে আইয়া। কাইল বিয়ালে। মজনুর লগে কথা আমি ঠিক কইছি, তারে চিনছি, চিন্না বুকটা আমার ভাইঙ্গা গেছে, ইচ্ছা করলে তারে আমি বেবাক কথা কইতে পারতাম, নিজের পরিচয় দিতে পারতাম, দেই নাই। ক্যান দেই নাই জানো? পোলাপানের উপরে মন উইঠা গেছে আমার। খালি মনে অয় আমার কোনও পোলাপান নাই।
চোখের পানি দরদর করে গাল বেয়ে পড়তে লাগল আদিলউদ্দিনের। কাঁদতে কাঁদতে গায়ের চাদর ফেলে দিল সে। বলল, দেহো বইন দেহো, পোলারা যদি এমতে পিডায়….।
কথা শেষ করতে পারল না আদিলউদ্দিন, বুক ঠেলে ওঠা কান্না ঠেকাবার জন্য ছটফট করতে লাগল।
লাঠির বাড়িতে তার সারা শরীরে দড়ির মতন দাগ পড়েছে। সেই দাগ দেখে বুকটা হু হু করে উঠল মরনির। এই মানুষটার ওপর সতেরো আঠারো বছর ধরে যে রাগ জমেছিল সেই রাগ উধাও হয়ে গেল। গভীর আবেগে দুইহাতে মানুষটাকে সে জড়িয়ে ধরল। আহেন আপনে, আহেন। বহেন। বইয়া কথা কন।
ধরে ধরে আদিলউদ্দিনকে এনে পাটাতন ঘরের সামনের তক্তায় বসিয়ে দিল মরনি। পোলা অইয়া বাপরে মারে, কেমুন পোলা জন্ম দিছেন?
আদিলউদ্দিন কোনও কথা বলল না। চাদরের খুঁটে চোখ মুছতে লাগল।
মরনি বলল, একই বাপের পোলা একজন অয় ডাকাইত একজন অয় ফেরেস্তা। মজনুরে দেখলে, তার লগে কথা কইলে আপনে এইডা বুজবেন।
আদিলউদ্দিন বলল, এইডা আমি বুজছি বইন।
লগে লগে বুকটা ধ্বক করে উঠল মরনির। তবে কী মজনুর উপর দখল নিতে, সব খোঁজ খবর নিয়ে এই বাড়িতে এসেছে আদিলউদ্দিন! শুনেছে মজনু খলিফা হয়েছে। ভবিষ্যতে ভাল টাকা পয়সা রোজগার করবে। নিজের সংসারে আর ফিরতে পারবে না আদিলউদ্দিন, মজনুই হবে তার একমাত্র ভরসা, এই রকম চিন্তা! মজনুর কাঁধে চড়ে শেষ জীবনটা সে কাটিয়ে দিবে।
এই সব ভেবে ভিতরে ভিতরে খুবই রাগ হল মরনির। খানিক আগের মায়া মমতা হাওয়া হয়ে গেল। আহুজঘর থেকে যে ছেলেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, মরনি যাকে বুকে তুলে নিয়ে এসেছিল, এতগুলি বছর কেটে গেছে যে ছেলের কোনও খোঁজ নেয়নি বাপ, আজ তার অবস্থা ভাল দেখে তার কাঁধে এসে সওয়ার হবে, মরনি বেঁচে থাকতে কিছুতেই তা হতে দেবে না।
এই সব নিয়ে কথা বলবার জন্য তৈরি হল মরনি। লোকটাকে এখনই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য তৈরি হল। তার আগেই আদিলউদ্দিন বলল, তুমি আমারে কী বোজতাছো কে জানে, তয় আমি কইলাম মজনুর লেইগা এই বাইত্তে আহি নাই। অর লেইগা আমি কোনওদিন কিছু করি নাই। বাপ অইয়াও বাপের দায়িত্ব পালন করি নাই। পোলায় জানেই না তার বাপ বাইচ্চা আছে না মইরা গেছে। এতকাল পর অমুন পোলার সামনে আইয়া খাড়ন যায় না। পোলাগো কাছ থিকা বহুত অপমান জিন্দেগিতে অইছি, আর অইতে চাই না। আমার একটা পোলা অন্তত থাউক যার কাছ থিকা আমি কোনওদিন অপমান অমু না। দরকার অইলে সারাজীবন তারে বাপের পরিচয় দিমু না, তাও ভাল।
এ কথায় আগের রাগ ক্রোধ ভুলে গেল মরনি। মজনুকে নিয়ে অন্যরকম একটা অহংকার হল। গলায় জোর নিয়ে বলল, বাপেরে পিড়ান তো দূরের কথা, তারে অপমান কইরা কথা কওনের মতন পোলা মরনি বানায় নাই। বাপ যত ইচ্ছা খারাপ অইবো, পোলা খারাপ বানামু ক্যা!
একটু থেমে মরনি বলল, মজনুর লেইগা যহন আহেন নাই তাইলে এই বাইত্তে আহনের কাম আছিলো কী?
মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় আদিলউদ্দিন বলল, আমি আইছি। একখান য়োড়ার লেইগা।
য়োড়ার লেইগা?
হ। য়োড়া ছাড়া মাইট্টাল অওন যাইবো না। য়োড়া কিননের পয়সা আমার কাছে নাই। একখান য়োড়া যদি দেও বইন, বড় উপকার অয়।
য়োড়া আপনেরে দিমুনে। কাম করবেন সড়কে, থাকবেন কই?
কইতে পারি না।
শীতের দিন যেহেনে ওহেনে তো পইড়াও থাকতে পারবেন না। কেতা (কাঁথা) কাপোড় আছেনি?
না, কিছু নাই।
তয়?
আদিলউদ্দিন কথা বলল না।
মরনি বলল, মজনু বাইত্তে থাকে না। ইচ্ছা করলে আমগো বাইত্তে আপনে থাকতে পারেন। তয় একখান কথা মানন লাগব। আপনে যে মজনুর বাপ এইডা মজনুরে কোনওদিন কইতে পারবেন না।
একথা শুনে মরনির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল আদিলউদ্দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কমু না, কোনওদিনও মজনুরে কমু না, বাজান রে, আমি তর বাপ।
পলোর ভিতর মুরগির ছাওটা তখন কোনও রকমে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতাছে। উঠে এক সময় দাঁড়াবে ঠিকই, বেঁচেও যাবে কিন্তু তার চারপাশে থাকবে পলোর বেড়া। পলো তুলে নেওয়ার পর বেড়া একটু বড় হবে। এই বাড়ির উঠান পালানই হবে তখন আর একটা পলো। সেই পলোর বৃত্ত ভেঙে একমাত্র মৃত্যুই পারবে তাকে মুক্তি দিতে।
.
১.২৭
বারবাড়ির সামনে বিশাল একখান নাড়ার পালা। যে লম্বা বাঁশের চারপাশ ঘিরে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে পালা দেওয়া হয়েছে সেই বাঁশের মাথায় ঘোর কালো বর্ণের। একখান হাড়ি বসান। হাড়ির সামনের দিকে খড়িমাটি দিয়ে আঁকা হয়েছে দুইখান চোখ। ফলে দূর থেকে নাড়ার পালাটাকে দেখায় পেটমোটা কাকতাড়ুয়ার মতো। কাক চিল, ইঁদুর বাদুর না, এই কাকতাড়ুয়াটি যেন মানুষকেই ভয় দেখায়। ম্যাটম্যাটা জ্যোৎস্না রাতে অচেনা পথিক যখন এই বাড়ির সামনে দিয়া যায়, হঠাৎ করে নাড়ার পালার দিকে তাকিয়ে কলিজা কেঁপে ওঠে তাদের। মনে হয় এটা নাড়ার পালা না, এটা তেনাদের একজন। পরহেজগার মানুষের বাড়ি দেখে বাড়ির ভিতর ঢুকতে পারছে না। বারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে ভিতর বাড়ির দিকে। যেন বাড়ালেই সেই পা বেঁধে ফেলবে মান্নান মাওলানার বাড়ি বন্ধের দোয়া। সেই বন্ধন মুক্ত করবার সাধ্য তেনাদের নাই।
