নূরজাহান তখন হাঁটতে হাঁটতে বাঁশঝাড়তলার ওদিকটায় যাচ্ছে। তাকে ওইদিকে যেতে দেখে ভাদাইম্মা লাফ দিয়া উঠল। লেজ নাড়তে নাড়তে নূরজাহানের পিছন পিছন চলল। অন্যান্য দিন ভাদাইম্মার লগে নানান পদের মজা করে নূরজাহান, খেলা করে। আজ সেইসবের কিছুই সে করছে না। আনমনা ভঙ্গিতে হাঁটছে। বাঁশের বনে আর গাছগাছালির পাতায় পাতায় ফাগুন মাসের রোদ হাওয়া খেলা করছে। মাঝিবাড়ির দক্ষিণ দিককার নামায়, চকের মুখে একটা শিমুলগাছ। সেই গাছে ফুল ফুটেছে। শিমুল ফুলে লাল হয়ে আছে গাছটা। তাকালে মনের ভিতরটা কেমন করে ওঠে।
বাঁশঝাড়তলায় এসে শিমুল গাছটার দিকে তাকায়া রইল নূরজাহান। মজনু মরনির কথার। লগে লগে তার মনে আসল কালরাতে বাবার মুখে শোনা রব্বান নামের মানুষটার কথা। রব্বানের লগে নূরজাহানরে বিয়া দিয়া তারে এই বাড়িতে রাইখা দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করছে। দবির-হামিদা। ঘরজামাই। যদি রব্বানের লগেই শেষতরি বিয়া হয় নূরজাহানের তয় আর শ্বশুরবাড়ি বইলা কিছু এই জীবনে হইলো না তার। যেই বাড়িতে জন্ম সেই বাড়িতেই কাটবো জিন্দেগি। মজনুর লগে বিয়া হইলে মরনি আম্মার বাড়ি হইত জামাইবাড়ি। সেইটা না হইলে অন্য কোনও বাড়িতে, অন্য কোনও গেরামে বিয়া হইলে কেমুন হইতো জামাইবাড়ি, সেই বাড়ির মানুষজন, ঘর দুয়ার, হৌর হরি দেওর ননদ। আর জামাই!
বিয়ার কথাবার্তা হওয়ার পর থেকেই এইসব যখন তখন ভাবে নূরজাহান। কয়েকদিন ধরে শুধুই ভাবছে মজনুর কথা। কুট্টি আলফুর ঘটনা জানার পর থেকে মজনু যেন মনের আরও অনেকখানি জুড়ে বসেছিল। কত স্বপ্ন কতভাবে তারপর থেকে দেখছেনূরজাহান। কালরাতে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আজ স্বপ্নভাঙা মন নিয়া এখন এই দুপুরবেলা বাশঝাড়তলায় দাঁড়ায়া মাঝিবাড়ির শিমুল ফুলে ভরা গাছটার দিকে তাকায়া আছে নূরজাহান। মজনু-মরনির কথা ভুলে তার এখন মনে পড়ছে রব্বান নামের মানুষটার কথা। কেমন দেখতে সে? বাবায় যে বলল মায়াবী চেহারা, কথাবার্তা সোন্দর, হাসি সুন্দর। জামাই হিসাবে নূরজাহানের কি ভাল লাগবো তারে? অনাথ এতিম মানুষ। দুনিয়াতে কেউ নাই। তার লগে বিয়া হইলে কোনওদিন জামাইর দিককার কোনও বাড়িতে নাঐর যাইতে পারবো না নূরজাহান। এই গেরামের মইধ্যেই, এই বাড়ির মইধ্যেই জিন্দেগি কাটবো।
নূরজাহান একটা নিয়াস ছাড়ল। আর সেদিন বিকালের মুখে মুখেই রব্বানের লগে তার দেখা হয়ে গেল।
.
এইডা কি গাছিকাকার বাড়ি না?
নূরজাহান দাঁড়ায়া আছে ছাড়াবাড়িটার দিকে মুখ করে। ফাগুন মাসের বিকাল হয়ে আসা রোদে ঝকমক ঝকমক করছে গিরস্তবাড়ির উঠান পালান, গাছগাছালি আর চকমাঠ। হাওয়া আছে। হাওয়ায় ঠান্ডা ভাব নাই। বেশ গরম। চকেমাঠে ইরি ধানের চারা গোড়ায় পানি পাইয়া ধীরে ধীরে সবুজ হচ্ছে। পদ্মা থেকে পাম্প দিয়া পানি আনা হচ্ছে গ্রামে। এক খেত থেকে আরেক খেতে পানি নেওয়ার জন্য নালা কাটা হয়েছে। খেতের পর খেত ভরে গেছে পদ্মার পানিতে। রোদ হাওয়ায় সবুজ ইরিমাঠ ঝিমঝিম করে।
নূরজাহান তাকায়া ছিল চকের দিকে, তবে দেখছিল না কিছুই। মনের মধ্যে ওই সেই অভিমান। মজনু, মরনি আম্মা। এত আপন তাদের দুইজনরে ভাবছে নূরজাহান আর তারা ভাবল না তার কথা!
এই সময় ছাড়াবাড়ির পাশ দিয়া হাঁইটা আসল লোকটা। নূরজাহানদের বাড়িতে ওঠার মুখে দাঁড়ায়া জিজ্ঞাসা করল কথাটা। লগে লগে তারে চিনতে পারল নূরজাহান। দবির যেমন যেমন বলছে চেহারা সুরত তেমনই। মাথায় বাবরি চুল, মুখে দাড়িমোচ ভরা, পরনে। ময়লা সাদা শার্ট আর খাকি ফুলপ্যান্ট, পায়ে টায়ারের স্যান্ডেল। মুখটা হাসিহাসি।
নূরজাহান কথা বলবার আগেই সে বলল, আমার নাম রব্বান। রব্বান শিকদার। কাইলঐ গাছিকাকার লগে চিন পরিচয়। বাড়িডা সেয়ই আমারে চিনায়া দিছে। সড়কের কামে লাগনের কথা আছিলো আইজ। লাগি নাই। এর লেইগা মনে করলাম কাকার লগে ইট্টু দেহা কইরা যাই। কাকায় নাই বাইত্তে? আপনে…। আরে ধুরো, তোমারে আপনে কমু ক্যা? তুমি তো আমার থিকা ম্যালা ছোড। তোমারে তুমি কইরা কই। আমি তোমারে চিনছি। তুমি কাকার মাইয়া। একমাত্র মাইয়া। তোমার নামও আমি জানি। কাকায় কইছে। নূরজাহান। আমি ইট্টু লেখাপড়া জানি। তোমার নামের অর্থডা কইতে পারি। নূর অর্থ হইল আলো, আর জাহান হইল দুনিয়া। দুইডা মিল্লা তোমার নামের অর্থ হইল দুনিয়ার আলো। বিরাট ভাল নাম।
বলেই হাসল রব্বান। সেই ফাঁকে নূরজাহান খেয়াল করল রব্বানের হাসি খুব সুন্দর। মোচ দাড়িতে মুক ঢাইকা আছে, তাও চেহারাডা বুঝা যায়। ভালই। দবির ঠিকঐ কইছে, কথায় চেহারায় মায়া মায়া ভাব আছে। কথা একটু বেশি কয়। তয় শোনতে খারাপ লাগে না।
নূরজাহান কথা বলবার আগেই ঘর থেকে বাইর হইয়া আসল হামিদা। অচেনা একজন মানুষকে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়া থাকতে দেখে ব্যস্ত হয়ে মাথায় ঘোমটা দিল।
নূরজাহান বলল, বাবার কাছে আইছে মা।
মুখে প্রায় আইসা পড়ছিল, কাইল রাইতে বাবায় যার কথা কইছে এইডাই সেয়। বলল না ধরা পড়ার ভয়ে। বললেই হামিদা বুঝে যাবে দুপুরবেলা তার লগে মিছাকথা কইছে নূরজাহান। কালরাতে মা-বাবার বেবাক কথাই সে শুনছে।
হামিদা কথা বলবার আগেই রব্বান তার স্বভাব মতন হাসিমুখে বলল, আমি মালখানগরের রব্বান কাকি। গাছিকাকার লগে…
