না, ভুল। ভুল চিন্তা করছিল নূরজাহান। তার মনে যা আছিল, দবির-হামিদার মনেও তা আছিল। তারাও চাইছে মজনুর লগে বিয়া হউক নূরজাহানের। বাবায় নানান পদের কথার ফাঁকে কথাডা উডাইছিলো। মরনি আম্মায় হেই কথার ধার দিয়াও যায় নাই। মজনুরে বলে অহন বিয়াই করাইবো না। করাইবো তিন-চাইর বচ্ছর পর। তয় তিন-চাইর বচ্ছর পরও যুদি নূরজাহানরেই বাড়ির বউ কইরা নিতে চাইতো, তয় কি তিন-চাইর বচ্ছর নূরজাহানের মা বাপে মজনুর লেইগা বইয়া থাকতো না?
থাকতো! কথাবার্তা পাকা অইয়া গেলে, দেশগেরামে কত মাইয়া এইভাবে বইয়া থাকে! তখন তো আর কোনও ঝামেলাও থাকে না! বিয়া ঠিক অইয়া রইছে এমুন মাইয়ার পিছেও তো কেউ লাগতে আহে না। মান্নান মাওলানার মুখ বন্ধ হইয়া যাইতো। এনামুল সাবেও কিছু মনে করতো না। সব দিক ঠিক রাখন যাইতো।
রাতটা নূরজাহান এইসব ভাইবা আর ঘুমাইতে পারে নাই। মনটা খুব খারাপ হইছে। মরনি আম্মায় এত আদর করে তারে, দুইবার দুইভাবে তারে বাঁচাইলো আর এত কিছুর পর একবারও চিন্তা করলো না নূরজাহানরে পোলার বউ করন যায়! মজনুর লগে এমন কোনও কথাও আইজ তরি নূরজাহানের হয় নাই যে সে মজনুরে ভালবাসে, তারে বিয়া করতে চায়। মজনুও কোনওদিন এমন কিছু বলে নাই। সবই মনে মনে। মজনুর মনে। কী আছে নূরজাহান পুরাপুরি বোঝেও নাই। সে বুঝছে শুধু তার নিজের মনটা। তার মন মজনুরে চায়। মজনুর মন তারে চায় কি না পুরাপুরি বুঝতে পারে নাই। যা দুই একটু আভাস পাইছে কথাবার্তায় তাতে পুরাপুরি বুঝা যায় না কিছুই।
এই অবস্থায় কী করার আছে নূরজাহানের! এত বেহায়া তো সে না যে মজনুরে কোনও না কোনওভাবে খবর দিয়া নিজের মনের কথা জানাইবো! মজনু জাইনা ধরবো মরনি আম্মারে। খালা, আমি নূরজাহানরে বিয়া করুম। তুমি গাছিমামার লগে কথা কও।
নূরজাহানের তারপর পরির কথা মনে হইছে। আজিজ গাওয়ালের মাইয়া পরি। নূরজাহান কি পরির কাছে যাইবো? পরি লেখাপড়া জানে। পরিরে দিয়া কি মজনুরে একটা পত্র লেখাইবো? পত্রে জানাইবো নিজের মনের কথা! পত্র লেখলে সেই পত্র কারে দিয়া। পাঠাইবো ঢাকায় মজনুর কাছে!
তারবাদে দেহা গেল নূরজাহান যা ভাবছে ঘটনা তেমুন না। মজনুদাদার চিন্তাও মরনি আম্মার মতন। নূরজাহানরে বিয়া করবো এমুন চিন্তা সে করেই নাই।
ছি ছি! তয় শরমে এক্কেরে মইরা যাইবো নূরজাহান। জিন্দেগিতে মজনুরে আর এই মুখ দেহাইতে পারবো না। পরিরে দিয়া পত্র লেখাইলে পরি হইয়া থাকলে সাক্ষী। পরির সামনে গিয়াও তো তারবাদে খাড়ইতে পারবো না নূরজাহান।
সবকিছু মিলায়া নূরজাহানের মনটা এলোমেলো হয়ে গেল। মজনুর চেয়েও কেন যে মরনি আম্মার ওপর অদ্ভুত এক অভিমান হল তার। মায়ের ওপর যেমন অভিমান হয় কোনও কোনও ছেলেমেয়ের, মরনি আম্মার ওপর নূরজাহানের অভিমানটা তেমন। আধা। ঘুমে আধা জাগরণে রাতটা তার কাটল। সকাল থেকে মনমরা ভঙ্গিতে, উদাস ভঙ্গিতে নিজের কাজগুলি করল, সংসারের টুকটাক কাজ করল দুই একটা। দবির না, হামিদা তাকে খেয়াল করল। রান্নাচালায় বসে দুপুরের রান্না করতে করতে মেয়ের দিকে তাকাল। হামিদা। তাকিয়ে দেখে উঠানে দাঁড়ায়া হিজল বউন্নার টেকটার দিকে উদাস চোখে তাকায়া আছে। দবির বাড়িতে নাই। দশগন্ডা জমিনে ইরির চাষ শুরু হইছে। সে গেছে সেই কাজে। ভাদাইম্মা বসে আছে রান্নাচালার অদূরে।
হামিদা নূরজাহানকে ডাকল। নূরজাহান, এই মিহি আয়।
নূরজাহান আসল। কী?
কী অইছে তর?
কো কী অইছে?
বিয়ান থিকা দেকতাছি মনমরা।
কীয়ের মনমরা।
হ। আমি তর মুক দেকলে বুজি। মুখটা হুগনা। মনে অয় কী জানি চিন্তা করতাছস?
না কিছুই চিন্তা করি না।
তয়?
তয় আবার কী? রাইত্রে ঘুমড়া ভাল অয় নাই।
ক্যা?
কইতে পারি না।
হামিদা তীক্ষ্ণচোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। তর বাপের আর আমার কথাবার্তা হোনছসনি?
নূরজাহানও মায়ের মুখের দিকে তাকাল। তারপর মিছাকথা বলতে শুরু করল। কোন কথা?
তর বাপে আর আমি তো কাইল রাইতে বহুত প্যাচাইল পারছি।
কুনসুম?
তুই হুইয়া পড়নের পর।
আমি হুনি নাই।
তয় যে কইলি রাইত্রে ঘুম অয় নাই।
একদোম অয় নাই হেই কথা কই নাই। হইছে। তয় ভাল না। বাবারে দেকলাম খোলা দুয়ারের সামনে বইয়া তামুক খাইতাছে আর তুমি বইয়া রইছো বাবার বিচনায়। তারবাদে আমি ঘুমাইয়া গেছিলাম। ঘুমড়া ভাঙছে রাইত দোফরে। তহন আমার লগে হুইয়া তুমি বেভোর ঘুম। মোগলায় হুইয়া বাবায় নাক ডাকতাছে। আমার আর ঘুম আহে নাই।
হামিদার তারপরও সন্দেহ গেল না। তার মনে হল নূরজাহান তাদের কথা শুনেছে। ওইসব শুনেছে বলেই মনমরা হয়ে আছে।
তারপরই মনে মনে একটা ধাক্কা খেল হামিদা। তয় কি নূরজাহান মজনুরে পছন্দ। করে? সে চাইছিল মজনুর লগে তার বিয়া হউক? দবিরের মুখে মরনি বুজির কথা শুইনা মন ভাইঙ্গা গেছে মাইয়াডার! এমুন যুদি হয় তয় তো মাইয়াডা মনে মনে হারাজীবন কষ্ট পাইবো। সংসার করবো একজনের, ভাববো আরেকজনের কথা। যে-কোনও দুঃখ বেদনায়। মনে অইবো, আহা এই জামাইর জাগায় যুদি ওই জামাই হইতো তয় এই দুঃখ বেদনা আমার হইতো না। সে আমার মনে দুঃখ দিতো না। আমারে সুখে রাখতো। আমার মন বুইঝা চলতো।
হামিদারও তারপর মন খারাপ হল। আল্লায় আমার মাইয়াডার কপাল এমুন করছে ক্যা? এই বসে এতকিছু ক্যান ঘটতাছে অর জীবনে! এই বসেই যহন এতকিছু ঘটতাছে, বাকি জীবন তো পইড়া রইছে। আরও কী না কী যে আছে অর জীবনে!
