হুইন্না তোমার মনে বহুত দুকু অইছে, না?
হ। বহুত দুক্কু অইছে।
দুক্কুর কাম নাই। তারা হালদার আর আমরা হইলাম গাছি। হালদার বাড়ির পোলার লেইগা গাছির মাইয়া তারা নিবো না। তুমি দুকু পাইছো খালি খালি।
হ পরে আমি এইডা বুজছি। তয় নূরজাহানের লগে মজনুরে বহুত মানাইতো। আর ওই। বাড়ির বউ অইয়া গেলে মাইয়াডা আমার বিরাট সুখে থাকতো।
হেইডা থাকতো। মরনি বুজি মানুষ ভাল। এমতেঐ নূরজাহানরে অনেক আদর করে। পোলার বউ অইয়া গেলে আরও বেশি আদর করতো। মাইয়াডাও আমগো চোক্কের সামনে। থাকতো। যহন ইচ্ছা এই বাইত্তে আইতে পারতো, তুমি আর আমি যহন ইচ্ছা দৌড়াইয়া গিয়া মাইয়াডারে দেইক্কাতে পারতাম। অহন বিয়া অইলে কোন গেরামে অইবো, আমগো গেরাম থিকা কত দূরে অইবো জামাইবাড়ি, দুই-চাইর বচ্ছরেও মাইয়াডার লগে দেহা। অইবো না। মাইয়াডারে ছাইড়া থাকতে কইলজাড়া পুইড়া যাইবো আমার।
তামাক টানা রেখে আবার হামিদার মুখের দিকে তাকাল দবির। তোমার কইলজা যাতে না পোড়ে হেই বস্তা আমি কইলাম করতে পারি।
হামিদা অবাক। কেমতে?
মাইয়া বিয়া দিয়া ঘরজামাই রাখলাম।
অমুন জামাই পাইবা কই?
চেষ্টা করলে মনে অয় পাওয়া যাইবো।
হেমুন কোনও সমবাত পাইছোনি? ঘটকায় হেমুন পোলা আনছে?
আরে না।
তয়?
আমি নিজেঐ অমুন একখান পোলা পাইছি।
হাছাঐ?
তয় মিছানি? মাইয়ার বিয়া লইয়া আমি তোমার লগে মিছাকথা কমু?
হামিদা অস্থির হল। কই পাইলা? কবে পাইলা?
আইজই পাইছি। এনামুল সাবের মেজবানি খাইতে গিয়া।
কও কী?
হ। হোনো ঘটনা।
দবির তারপর রব্বানের কথা বলল হামিদাকে। রব্বান যেভাবে যা বলেছে সব বলল। সে দেখতে কেমন, কথাবার্তা আচার ব্যবহার কেমন, বলল। তাকে কাকা কাকা করেছে তাও বলল। বলল এমন মায়াবী গলায়, শুনে হামিদার মনও রব্বানের জন্য গভীর মমতায় ভরে গেল। বলল, হুইন্না পোলাডার লেইগা মায়া লাগতাছে।
দবির বলল, দেখলেও তোমার মায়া লাগবো। কথাবার্তা হোনলে মায়া লাগবে।
তয় পোলাডা তো এক্কেরেঐ এতিম। বাপ মা ভাইবইন তো নাই। জাগা সম্পিত্তি বাড়িঘর থাকতেও নাই।
হ এইডা অইলো আসল সমস্যা।
হামিদা চিন্তিত গলায় বলল, এমুন পোলার কাছে মাইয়া বিয়া দিবা?
না না, মাইয়া বিয়া দিমু এমুন কথা আমি কই নাই। রব্বানরে দেইখা অর লগে কথাবার্তা কইয়া আমার মনে অইছে যে পোলাডার দুইন্নাইতে কেঐ নাই, আমারও একখান মাত্র মাইয়া। এত আদর কইরা পালছি। হেই মাইয়া কই না কই বিয়া দিমু? তারবাদে মাইয়া ছাইড়া কেমতে থাকুম এই হগল চিন্তা কইরা কথাডা তোমারে কইলাম।
তোমার কথা আমি বুজছি।
এই পোলার কাছে বিয়া দিলে কিছু সুবিদাও আছে।
কেমুন সুবিদা?
থাকবো তো আমগো বাইত্তে। বিয়ার টেকা পয়সা খরচাপাতি তেমুন লাগবো না। অন্য জাগায় মাইয়া বিয়া দিতে গেলে যেই কয়টেকা আমি জমাইছি হেতে তো কিছুই অইবো না। এনামুল সাবে নাইলে কিছু টেকা দিল। আর দিবো কেডা? পরে দেহা গেল জমিনডু বেচতে অইলো মাইয়ার বিয়ার লেইগা। বুড়া বসসে যহন গাছ ঝুরতে পারুম না তহন না খাইয়া মরণ লাগবো।
হ কথা ঠিক। তয় চিন্তা করো।
আমার চিন্তা আমি করছি। অহন চিন্তা করবা তুমি। তুমি যুদি মনে করো হ এই সমন্দ করন যায় তয় আমি রব্বানের লগে কথাবার্তির ববস্তা করুম। রব্বান কইলাম আমারে কইছে ও আর কোনওদিন মালখানগর যাইবো না। অর জানের ডর আছে। বিয়াশাদি কইরা এই মিহিঐ থাইক্কা যাইবো।
তারবাদেও কথাবার্তি ও যা কইছে বেবাক ঠিক আছে কি না, নাকি মিছাকথা কইছে এই হগল খোঁজখবর লওন লাগবো না?
দবির হুঁকা নামায়া রাইখা হাসল। আরে ওই হগল তো অনেক পরের কথা। আগে সমন্দ করবা কিনা হেইডা চিন্তা করো। রব্বানরে দেহো তারবাদে সেন্না ওই হগল।
হ। তয় পোলাডারে ডাকাও, দেহি ইট্টু।
ডাকামুনে। কাইল থিকা মনে অয় সড়কের কামে লাগবো। ডাইক্কা আনুমনে! কামে না লাগলেও বিচড়াইয়া বাইর করতে পারুম। ঠাকুরবাড়ির ওইমিহি থাকে। মকবুল নামে এক মাইট্টালের নাম কইছিল। তার কাছে গেলেই পামুনে।
হামিদা হাই তুলল। দেইখা দবির বুঝল ঘুম আসতাছে তার। উইঠা দুয়ার বন্ধ করল সে। হামিদা উইঠা গেল চকিতে, দবির ফুঁ দিয়া কুপি নিভাইয়া হোগলার বিছানায় শুইয়া পড়ল।
.
কাল রাতে মা বাবার বেবাক কথাই শুনছে নূরজাহান।
তারা মনে করছিল নূরজাহান ঘুমায়া গেছে। আসলে সে ঘুমায় নাই। কয়েকদিন ধরে ঘুমটা আগের মতন শুইয়া পড়লেই আসে না। অনেক আবল তাবল কথা মনে। হয়। বেবাকই বিয়াশাদির কথা। আর বিয়াশাদির কথা মনে হইলেই মনে হয় একজন মানুষের কথা। মজনু। মজনুর মুখটা চোখের সামনে ভাইসা ওঠে। তার কথা বলার ভঙ্গি, হাটাচলা, তাকানো আর ওই যে পলাইয়া পলাইয়া সিগ্রেট খাওয়া, সব মনে পড়ে। নিজে সামনে বইসা বাড়ির বউর মতন মজনুরে পোলাও মোরগ বাইড়া খাওয়াইছিল, এইসবও মনে পড়ে। মনের খুব ভিতরে মজনুরে নিয়া একটা স্বপ্নও তৈরি হইছিল। যুদি মজনুর লগে তার বিয়া হয়! বিয়া হইলে কুট্টি যেমুন পাগল হইছিল আলফুর জন্য সেও তেমুন পাগল হইব মজনুর জন্য। কুট্টি তো তার আলফুরে পাইয়া গেছে। বিয়া হইয়া গেছে। অহন পোলাপানও হইবো। মনের মানুষরে লইয়া যা যা ভাবছে সব হইয়া গেছে কুট্টির।
আর নূরজাহানের?
এতদিনকার স্বপ্নটা কাইল রাইতে শেষ হইয়া গেছে। রমিজ ঘটকের কাছে বাপরে দৌড় পাড়তে দেইখা নূরজাহান একদিন ভাবছিল রমিজরে মরনি আম্মার কাছে ক্যান পাড়ায় না বাবায়? মজনুর লগে তার বিয়ার সমন্দ লইয়া রমিজ যুদি একবার মরনি আম্মার কাছে যায় তয়ঐত্তো কাম অইয়া যায়।
