হামিদা অবশ্য রোজই একবার বলে, তুই যহন ডরাচ তয় আমি জিনালার সামনে হুই। তুই আমার জাগায় হে।
না মাইয়া তার জাগাঐ হুইবো। জানালা বন্ধই রাখবো।
আজও তাই করেছে।
শুয়ে পড়ার কতক্ষণ পর নূরজাহান ঘুমায় এটা কখনও ঠিক মতন বুঝতে পারে না দবির। বুঝতে পারে হামিদা। এইজন্য হামিদাকে অনেক সময়ই কথাটা জিজ্ঞাসা করে। যদি নূরজাহানকে নিয়া কোনও কথা বলার থাকে, আবার সেই কথা এমন কথা, নূরজাহানকে তারা শুনাতে চায় না তখন রাতেরবেলা নূরজাহান শুয়ে পড়ার পর অনেকক্ষণ ধরে তামাক টানে দবির তারপর একসময় জানতে চায় নূরজাহান ঘুমিয়েছে কিনা। আর দবিরকে যে রাতে এইভাবে দুয়ার খোলা রেখে তামাক টানতে দেখে হামিদা, সে বুঝে যায় আইজ মাইয়ারে লইয়া কোনও কথা আছে।
দবিরের সেই নমুনা দেখেই চকিতে এখনও ওঠে নাই হামিদা। স্বামীর হোগলার বিছানায় বসে আছে। এখন দবিরের কথা শুনে একবার চকির দিকে তাকাল। তাদের দিকে পিছন ফিরে শুয়ে থাকা নূরজাহানকে দেখল তারপর বলল, হ ঘুমাইয়া গেছে। যা কওনের কইতে পারো।
মুখ থেকে হুঁকা নামাল দবির। কুপির আলোয় হামিদার মুখের দিকে তাকাল। না, ওই শালার পো শালায় তো আমারে খালি ঘুরাইতাছে আর টেকা খাইতাছে।
কার কথা কও? কে টেকা খাইতাছে?
আরে ওই রমিজ্জা শালায়। ঘটকায়।
বুজছি, বুজছি।
এই তরি একহাজার একশো টেকা দিছি শালার পো শালারে। পছন্দ মতন একখান পোলা আনতে পারল না নূরজাহানের লেইগা। যেইডি আনে হেইডি অইলো ওই যে দেলরা বুজির বাইত্তে থাকে মতলা, রাবির জামাই, বাদলার বাপ, ওই পদের। এক্কেরে ফকির মিসকিন। ওইরকম সমন্দ আমি করুম না।
না হেইডা করবা ক্যা? আমার মাইয়া ইট্টু কালাকোলা, তয় চেহারা সুরত ভাল, শইল সাস্ত ভাল। অরে অমুন ম্যাড়া ধরার কাছে বিয়া দিবা ক্যা?
দবির আবার হুঁকায় কয়েকটা টান দিল। আরে হের লেইগাঐ তো দিতাছি না। এই তরি দোজবর সমন্দ আনছে দুইডা। একটা আনছে, বেডার বস অইবো আমার থিকাও বেশি।
না না এই হগল সমন্দ অইবো না।
তয় মাইয়া তো বিয়া দেওন লাগবো, নাকি? ওই শুয়োরের পোর হাত থিকা তো এনামুল। সাবে বাঁচাইয়া দিছে। দিয়া কইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভাব মাইয়া বিয়া দিয়া দেও। হেইদিনে পর আইজ তার লগে দেহা অইলো। হেয় মজজিদ বানাইয়া বেবাক কাম শেষ করল আর আমি মাইয়াডার বিয়ার কোনও ভাওঐ করতে পারলাম না। আইজ তার মুখের মিহি শরমে আমি চাই নাই। তয় হেয় একবার আমার সামনে আইছে, আমি ঠিক লাহান খাইতাছি কিনা জিগাইছে। তহন আরও ডর করছে। এই না জিগায়, গাছি, মাইয়ার বিয়ার কী করলা? আল্লার রহমত যে জিগায় নায়। মেজবানি লইয়া ব্যস্ত আছিল দেইখা মনে অয় তার মনে আছিল না। জিগাইলে আমি বিরাট শরম পাইতাম।
শরম পাইবা ক্যা? তারে কইতা, চেষ্টা করতাছি। ঘটক লাগাইছি।
হ হেইডা তো কইতাম। তয় বিয়া মাইয়াডার আইটকা রইল ক্যা? আউন্নায়ঐ না।
এইডা আমিও চিন্তা করতাছি। ওই শুয়োরের পোয় আবার আমার মাইয়ার বিয়া বন্দ কইরা রাখলোনি?
অইতে পারে। শালায় তো কুফরি কালাম (এক ধরনের বদদোয়া) জানে। কুফরি কালাম দিয়া মাইনষের অনেক ক্ষতি করন যায়। এইডা আমার অনেক আগে একদিন মনে অইছিল। এর লেইগা গেছিলাম খাইগোবাড়ির হুজুরের কাছে। হুজুররে বেককিছু ভাইঙ্গা কইলে হেয় ববস্তা নিতে পারতো। আমগো বরাত খারাপ। হুজুর নিজেই তো চইলা গেলো!
হামিদা চমকাল। চইলা গেলো? কও কী তুমি? হুজুরে মইরা গেছেনি?
হ। গলায় ক্যান্সার অইছিল হেইডা তো তুমি হোনছোঐ। ঢাকার হাসপাতালে আছিল, ওহেন থিকা দেশে গেছিলো গা। যাওনের কয়দিন বাদেই আল্লায় তারে উড়াইয়া নিছে।
আহা রে!
নতুন করে তামাক সাজিয়ে আবার টানতে লাগল দবির। বাইরে অন্ধকার রাত ঝিমঝিম করছে। বাঁশঝাড়ে শনশন করে বইছে ফাগুন হাওয়া। ঝিঁঝি ডাকছে, দূরে ডাকছে একটা রাতপাখি। পুকুর পারের ওদিকটায় জোনাকপোকা উড়ছে। তাদের মোলায়েম আলো বিন্দু বিন্দু জ্বলছে।
হামিদা বলল, শুয়োরের পোয় যুদি আমার মাইয়ার বিয়া বন্দ কইরা রাখে, যুদি এমুন ববস্তা করে যে বচ্ছরের পর বছর যাইবোগা আমার মাইয়ার বিয়া অইবো না তয় তো আর কোনও উপায় থাকবো না। বাইধ্য অইয়া অর কাছেঐ মাইয়া বিয়া দেওন লাগবো।
এইডাঐ আমি চিন্তা করতাছি।
দবির অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তামাক টানতে লাগল। কিছুক্ষণ টেনে আবার হামিদার দিকে তাকাল। তোমারে আইজ দুইহান কথা কমু। মন দিয়া হোনবা।
হামিদা একটু আগায়া আসলো। আইচ্ছা কও।
যেদিন আমি খাইগো বাড়ির হুজুরের কাছে গেছিলাম হেদিন ফিরনের সময় গেছিলাম মরনি বুজির বাইত্তে। নানানপদের কথার ফাঁকে, নূরজাহানের বিয়ার কথা কইতে কইতে এক ফাঁকে বুজিরে জিগাইলাম, আমি তো আমার মাইয়া বিয়া দেওনের চেষ্টা করতাছি বইন, তুমি তোমার মজনুরে বিয়া করাইবা না? ইটটু চালাকি কইরা কথাডা আমি উডাইছিলাম। আমার মনের মইদ্যে আছিল, মরনি বুজি আমার মাইয়াডারে এত আদর করে, এই কথা হুইন্না মনে অয়। কইবো, আপনের মাইয়া আমারে দেন গাছিদাদা। আমার মজনুর লগে অরে বহুত মানায়। আমার একখান পোলা আছে, পোলার বউ অইলে একটা মাইয়াও পামু। বুজি এই হগল কথার ধার দিয়াও গেলো না। কইলো, না মজনুরে অহন বিয়া করামু না গাছিদাদা। আমার পোলার বিয়ার বস অয় নাই। অরে বিয়া করামু আরও তিন-চাইর বচ্ছর পর।
