হজরতদের বাড়ি ছাড়িয়ে রাস্তার ওপর কতগুলি পিচের ড্রাম রাখা। খানে খানে ভুর দিয়া রাখা কার্পেটিং করায় গুঁড়া পাথর, মোটাদানার বালি, সাধারণ বালিও আছে। আর ইটের পাঁজা তো আছেই। কয়দিন আগে কোলাপাড়ার ওইদিকে গিয়েছিল দবির। সেখানে দেখে আসছে পিচপাথর মিকচার হচ্ছে বিশাল গাড়ির মতন একটা মেশিনে। মিকচার হওয়ার পর মেশিনই জিনিসটা ঢেলে দিচ্ছে রাস্তায়, লোকজন ধুমাইয়া কাজ করছে। রাস্তার ধারে পিচের ড্রামের তলায় লাকড়ির আগুন দিয়া পিচ গলানো হচ্ছে। রোলার আছে বেশ কয়েকটা। নানান পদের রোলার। ছোট মাঝারি বড়। এলাহি কারবার।
রব্বান বলল, কী চিন্তা করেন কাকা?
দবির হাসিমুখে রব্বানের দিকে তাকাল। না কিছু না। আপনে যান বাজান। আপনে তো যাইবেন ঠাকুরবাড়ি। ওই বাড়ি তো পিছে হালাইয়া আইলাম।
অসুবিদা নাই। আমি বেকার মানুষ। এমুন খাওন খাইছি, অহন ইট্টু হাঁটন ভাল। তয় আরাম লাগবো। লন আপনেরে আউগ্নাইয়া দিয়াহি। আপনের বাড়িডাও চিন্না আহি। আপনেগো গেরামেই যখন থাকন লাগবো, চিন পরিচয় যহন অইলো, বাড়িডা চিন্না রাখি। আর আপনের নামডা আমি জানি না। তয় সাবের কথায় বুজছি, আপনে গাছি। রসের। কারবার করেন।
হ বাজান। শীতের দিনে করি। অন্যদিনে ইট্টু খেতখোলা আছে ওইডি করি। ছোড সংসার। আপনের কাকি আর আমার একখান মাত্র মাইয়া নূরজাহান। পুরাপুরি বিয়ার লাইক (লায়েক) অয় নাই। বেবাক মিলাইয়া আল্লায় ভালই রাকছে। তয় আপনেরে লইয়া ইট্টু চিন্তায় পড়ছি।
রব্বান অবাক। আমারে লইয়া চিন্তায় পড়ছেন? কন কী? ক্যা? আমি আবার কী করলাম?
না ওই যে কইলেন কামকাইজও করতাছেন না, থাকনের জাগাও নাই।
হ। তয় কামের ব্যবস্তা আমি কইরা হালামু কাকা। কনটেকদারে যুদি সর্দারের এসিসটেনের কাম না দেয় তয় লেবারের কাম করুম। টেকা রুজি করন লাগবো না! নইলে খামু কী? বাঁচুম কেমতে?
হেইডা ঠিক আছে! তয় থাকন?
থাকুম নে কেঐর লগে বন্দবস্ত কইরা। আমারে লইয়া আপনে চিন্তা কইরেন না কাকা। আপনেরে দেইখা আপনের লগে বইয়া খাইতে খাইতে মনে অইলো আপনে মানুষ ভাল। কথা কইয়াও মনে অইলো। এই যে অহন কইলেন আমারে লইয়া চিন্তায় পড়ছেন এইডা হুইন্না আরও ভাল লাগল। আইজকাইল কেঐ কেঐরে লইয়া চিন্তা করে না কাকা। দুনিয়ার বেবাক মানুষ স্বার্থবাজ অইয়া গেছে। যে যারে লইয়া চিন্তা করে। অন্যরে লইয়া চিন্তা করে না। নাইলে আপন চাচায় আমার লগে কী করলো হোনলেন না! চাচাতো ভাইগো ডরে বাড়ি ছাড়লাম। নাইলে বাপের সম্পিত্তি যা পাইতাম হেতেই আমার জিন্দেগি রাজার হালে চইলা যাইতো। নিজের ভাগের জমি চুইতাম, ঘরবাড়ি করতাম, বিয়াশাদি করতাম। ভাল গিরস্তের জীবন অইতো।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রব্বান। হইল না। কী করুম? কপালের ফের। তয় আমি মনে করি কাকা, জাগাজমিন ঘরবাড়ির থিকা মাইনষের জান অনেক বড়। জান বাঁচান। ফরজ। আমি ফরজ কামডা করছি। জান বাঁচানের লেইগা বেবাক ছাইড়া আইয়া পড়ছি। কোনওদিন তাগো মুখ আমি আর দেখতে চাই না।
রব্বানের জন্য খুবই মায়া লাগছে দবিরের। ইচ্ছা করছে বাড়িতে নিয়া যায় পোলাটারে। বাঁশঝাড়ের ওদিককার লাকড়ি খড়ি রাখার ঘরটায় তারে থাকতে দেয়। যেই কয়দিন কাম কাইজ না অইলো, দবিরই কষ্টমষ্ট কইরা খাওয়াইলা। তিনজন মানুষের লগে একজন মানুষ। খাইতেই পারে। চাউল ইকটু বেশি লাগবো, তরকারি ইকটু বেশি লাগবে। আর কী!
তবে এসব ভাবনা রব্বানকে টের পেতে দিল না দবির। বাড়ির কাছাকাছি এসে আঙুল তুলে নিজের বাড়িটা দেখাল। উই যে টেকটা দেখতাছেন বাজান, ইজল বউন্না ডুমইরের জঙ্গডা দেখতাছেন তারপর কদমগাছ আর বাঁশঝাড়আলা বাড়ি আমার।
রব্বান হাসিমুখে বলল, বুজছি বুজছি। তয় আপনে বাইত্তে যান কাকা। আমি যাই বাজার মিহি। কনটেকদার সাবের ম্যানাজারের লগে কথা কইয়া দেহি কী কয়? কাইল থিকা কামে লাগনঐ লাগবো। নাইলে উপায় নাই।
রব্বান দ্রুত বাজারের দিকে হাঁটতে লাগল। দবির কয়েক পলক দাঁড়িয়ে তাকে দেখল তারপর মনের ভিতর গোপন একটা ইচ্ছা নিয়া বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
.
নূরজাহান ঘুমাইছে?
হামিদা বসে আছে দবিরের বিছানায়। মেঝেতে এখন আর নাড়ার উপর হোগলা, হোগলার উপর মোটা কাঁথা বিছিয়ে শুতে হয় না। খালি হোগলা। হোগলার মাথার দিকে বালিশ নিয়া শুয়া পড়লেই ঘুমাইয়া যায় দবির। হামিদা আর নূরজাহান আগের মতনই চকিতে। নূরজাহান জানালার ওদিকটায়, হামিদা মেঝের দিকে।
।আজ রাতের খাওয়াদাওয়া হয়েছে অনেক আগে। মা-মেয়ে খেয়েছে ঠিকঠাক মতনই, শুধু দবির তেমন খেতে পারে নাই। দুপুরে এনামুল সাবের বাড়িতে মেজবানি খেয়ে সেই যে পেট ভরে আছে, পেটে টানই পড়ছে না, ক্ষুধা লাগছেই না। তবু একটুখানি ভাত দবির খেয়েছে। তারপর থেকে খোলা দরজার সামনে বসে তামাক খাচ্ছে। নূরজাহান তার সেই পুরানা কায়দায়, শাড়িতে মুখ ঢেকে, জানালার দিকে মুখ দিয়া শুইয়া পড়ছে। শোয়ার আগে জানালা বন্ধ করছে। দবির হামিদা চায় জানালা খোলা থাকুক, রাতের ঝিরঝিরা বাতাসটা ঘরে ঢুকুক। নূরজাহান চায় না। সে ডরায়। রাতে আথকা ঘুম ভেঙে গেলে, এই জানালা দিয়া তাকালে ছাড়াবাড়ির হিজল ডুমুর বউন্নার গাছগুলি দেখা যায়। অন্ধকার রাত হলে তো কথাই নাই, জ্যোৎস্না রাত হলেও গাছগুলি আর ঝোঁপজঙ্গল কেমন ভুতুড়ে মনে হয়।
