এনামুল হাসিহাসি মুখে মুসল্লিদের খাওয়াদাওয়ার তদারক তো করছিলই, গরিব মিসকিন যারা আসছে তাদের দিকেও নজর রাখছিল। দবিরকে একবার জিজ্ঞাসা করেছে, খাইতাছেন ঠিক মতন?
দবির কথা বলবার আগেই আলফুকে বলল, ওই আলফু, গাছিরে আরেকটু গোস্ত দে।
আলফু তার কথা মতনই কাজ করল। দবির খাওয়াদাওয়ায় খুব একটা ওস্তাদ না। তবে রান্না আজ এত ভাল হয়েছে, গোস্তটা যা মুলাম হইছে, দবিরের মতন সবাই খেয়ে মুগ্ধ। মান্নান মাওলানা দূর থেকে একবার দবিরের দিকে তাকিয়েছিল। মুখটা গম্ভীর। দবিরকে মসজিদে ঢোকার সময়ও একবার দেখেছে সে। দবির জুম্মা পড়তে আসছে দেখেও মুখটা গম্ভীরই ছিল তাঁর।
এই মেজবানিতেই রব্বানকে দেখল দবির। তার পাশে বসেই খাচ্ছিল। জুয়ান বয়সের পোলা, তবে খাওয়াদাওয়ায় তেমন জুয়ানকি বোঝা গেল না। তেমন বেশি খেল না। দবিরের মতনই। খাতিমদাররা একবারে হাতের গামলা থেকে একটা টিনের থালায় করে যতটা ভাত তুলে দিল, ভাত ওই অতটাই। একহাতা সুরা গোস্ত দিল তারপর দিল ডাল। সব শেষে ফিরনি। ওই একবার করে। যা দিল তাই খেল রব্বান। কোনওটাই পরের বার আর চাইল না।
তখন থেকেই রব্বানকে খেয়াল করছিল দবির। মেজবানি খেয়ে ফিরার সময় দেখে তার লগে লগে হাঁটা দিছে। হাঁটতে হাঁটতেই কথাবার্তা শুরু করেছিল। এত কথার পর এখন অন্য কথাটা জিজ্ঞাসা করল দবির। আপনেরে বাজান কে দাওত দিছিল?
রব্বান অবাক। কে দাওত দিবো? কেঐ দেয় নাই। আমারে চিনে কে যে দাওত দিবো? আমি তো এই গেরামে অচেনা। আততীয় স্বজন চিনা পরিচিত মানুষ একজনও নাই। আইছি কাম বিচড়াইতে। কাম একখান পাইছিও। তয় লই নাই। কী কাম হোনবেন? কামলার কাম। এক্কেরে কামলার কাম। গোড়ায় কইরা সড়কের কামের ইটা বালি টানন লাগবো। রোজ অইলো ষাইট টেকা। কামডা আমার পছন্দ অয় নাই। তাও একদিন করছি। আইজ তিনদিন অইলো এই গেরামে আইছি। পয়লা দিন আইতে আইতে বিয়ান অইয়া গেছে। মাওয়ার বাজারে এক হইটালে ভাত খাইছি। কয়ডা টেকা আছিল জেবে। ওইডা দিয়াঐ খাইছি। রাইত্রে মাওয়ার বাজারে, একখান মুদি দোকানের সামনে ব্যাগ। মাথায় দিয়া হুইয়া রইছিলাম। পরদিন বিয়ানে গেছি সড়কের কামের ওহেনে। কনটেকদার সাবের ম্যানাজাররে ধরলাম। কাম করতে চাই সাব। কয় লাইগ্যা যাও। ইটা বালি টানো। ষাইট টেকা রোজ। ব্যাগহান কনটেকদার সাবের সিমিট রাখার ঘরে রাইক্কা বিসমিল্লা বইলা ইটার বোঝা উডাইলাম মাথায়। বিয়ানে দেহি গরদান আর সিধা করতে পারি না। এমুন কাম তো জিন্দেগিতে করি নাই। করছি খেতখোলার কাম। হ ওইডিও কামলার কাম, তয় এত কঠিন কাম না। পরদিন কইলাম, ম্যানাজার সাব, এই কাম আমি পারুম না। আমি মালখানগর হাই ইসকুলে কেলাস সেভেনতরি পড়ছি। আপনে আমারে লেবার সর্দারের কাম দেন। সর্দারের এসিসটেন বানাইয়া দেন। দেয় নাই, বুজলেন কাকা, দেয় নাই। আমিও রাগ কইরা আর কামে গেলাম না। জেবের পয়সা খরচা কইরা হইটালে ভাত খাই। থাকি ওই যে ওই বাড়িডায় ছাপরা মাপরা ওডাইয়া মাইট্টাল লেবাররা যেমতে থাকে…
ঠাকুরবাড়িটা দেখাল রব্বান।
দবির বলল, ওহেনে আপনের চিনা পরিচিত কেঐ আছে?
আছিল না। একদিন কাম কইরা দুই-চাইরজনরে চিনছি। তারা থাকতে দিছে। আর অহন তো শীতের দিন না। গাছতলায় হুইয়া থাকলেও অসুবিদা নাই। মকবুল নামে একজন আছে, হেয় আমারে তার লগে থাকতে দিছে। তয় বেডার সবাব ভাল না কাকা। রাইত্রে শইল্লে হাত দেয়। বদ উদ্দিশ্য। কাইল রাইত্রে আর অর লগে থাকি নাই। ব্যাগ রাখছি। একজনের ছাপরায় আর নিজে হুইয়া রইছি গাছতলায়। আইজ বিয়ানে হোনলাম গেরামের নতুন মজজিদে জুম্মা হইবো, তারবাদে মেজবানি। জুম্মা পড়তে পারলাম না শইল নাপাক দেইক্কা। নাই ধুই নাই তো! এর লেইগা চকে খাড়ইয়া রইছিলাম। যেই জুম্মা শেষ অইছে, মেজবানি আরম্ব অইছে, গিয়া খাইতে বইয়া গেছি।
দবিরের মুখের দিকে তাকাল রব্বান। তার মিঠা হাসিটা হাসল। এই হইল কাকা আমার হিসটোরি।
রব্বানের কাকা ডাকটা ভাল লাগছিল দবিরের। এরকম করে কেউ কখনও ডাকে নাই। রব্বানকেও ভাল লাগছিল। কত সহজ সরল পোলা। পেডে কোনও কথা রাখে না। বেবাক কইয়া দেয়। চিন পরিচয় অইয়া সারল না, জিন্দেগির বেবাক কথা কইয়া দিল।
এসব ভাবতে ভাবতে সড়কের দিকে তাকাচ্ছে দবির। মাটির কাজ প্রায় ফেরিঘাট তরি গেছে। আর দিন দশ-পনেরোর মধ্যে ওইদিককার মাটির কাজ শেষ হবে। এইদিক থেকে ইট বিছানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। কোলাপাড়ার ওইদিক তরি কার্পেটিংও হয়ে গেছে। একলগে তিন রকমের কাজ চলছে। রিকশা তো অনেক আগে থেকেই আসছে গ্রামে, এখন ট্রাকও আসছে। ট্রাককে ট্রাক মালামাল আসছে কন্ট্রাকটরদের। চইত বৈশাখ মাসের মধ্যে পুরা কাজ শেষ হবে সড়কের। ঢাকা থেকে বাস ট্রাক গাড়ি বেবি টেক্সি বেবাক আসবে এইদিকে। মাওয়ায় রেডি আছে কয়েকটা ফেরি। লঞ্চ আছে এপার ওপার করার। ছোট ছোট স্পিডবোটও আছে। দোকানপাট ম্যালা হয়ে গেছে কুমারভোগ চৌরাস্তার ওখান থেকে ফেরিঘাটের দিক তরি। চৌরাস্তার সোজাটা চলে গেছে পদ্মার পারে। ওদিকটায় চর পড়ে শুধু বালি আর বালি। বামদিককার রাস্তা চলে গেছে লৌহজংয়ের দিকে আর ডানদিকে তো মাওয়া ফেরিঘাট। গেরাম আর গেরাম থাকলো না, টাউন অইয়া গেলো। বিজলিও আইসা পড়ছে মাওয়া তরি। পল্লিবিদ্যুৎ। টাকাআলা লোকরা বাড়িতেও নিচ্ছে বিজলি। সন্ধ্যার পর টিমটিমা কেরোসিন কুপির আলো কমতে শুরু করছে। এখন আছে শুধু দবিরের মতন গরিব মানুষের বাড়িতে। টাকাআলা লোকের বাড়িতে বিজলি। এনামুল সাব তাঁর বাড়িতে নিছেন, মসজিদে নিছেন। এখন গ্রামের টাকাআলা লোকের বাড়িতে টেলিভিশন, ফ্রিজ চলে। গেরাম অহন টাউন। কয়দিন পর রাস্তা চালু হইলে কায়কারবারও বাড়ব মাওয়ার ওইদিককার কারবারিগো। মাওয়া তরি বাসে কইরা মানুষ আসবো, তারপর ফেরিতে কইরা। পদ্মা পার হইয়া ওই পারে গিয়া যার যেই মিহি বাড়ি ওই মিহি যাইবো গা। কেউ যাইবো খুলনা যশোর, কেউ ফরিদপুর বরিশাল। ওইপারের রাস্তার কামও শেষ হইয়া আইলো। কামের কাম করলো একখান এরশাদ সাব। আর কিছু করুক আর না করুক রাস্তাঘাট ম্যালা বানাইয়া দিল দেশে। অহন শুনা যাইতাছে চৌরাস্তা থিকা সোজা বরাবইর যেই একটুখানি রাস্তা পদ্মা তরি গেছে ওইদিকে ভবিষ্যতে পদ্মা বিরিজ হইব। বিরিজ হইয়া গেলে ফেরিফুরির আর দরকার হইবো না। লঞ্চ মঞ্চে কে উটবো। যাগো মাওয়া তরি আহনের। কাম তারা মাওয়া তরি আইবো, যারা খুলনা যশোর যাইবো, ফরিদপুর বরিশাল যাইবো তারা বাসে গাড়িতে কইরা সোজা যাইবো গা বিরিজ পার হইয়া।
