রব্বান তার স্বভাব মতন হাসল। হ মালখানগর থিকা আপনেগো গেরাম বিরাট দূর। তাও আইছি। আইছি কাকা পেডের দায়ে। গেরামে কোনও কাম কাইজ নাই। আমার চাচায় গেছে বুড়া হইয়া। পোলাপানে অহন সংসার দেহে। খেতখোলা চোয়। ধানপান মন্দ অয় না। আমিও তাগো লগে খেতখোলার কাম করতাম। তয় ধান পান উডনের পর তারা। যে যার মতন সংসারের ধান রাইক্কা, কিছু বেইচ্চা টেকা পয়সা ভাগ কইরা লয়। আমি যে কামলার লাহান খাডি আমারে চাইর আনা পয়সাও দেয় না। চাইলে বকাবাজ্জি করে। লুঙ্গি পিরন কিননের টেকাডাও দেয় না। খালি থাকন খাওন। তাও আমি থাকি এমুন একখান। ঘরে, ওইডা ঘরের কোনও জাতঐ না। লাকড়ি খড়ি, দুই-তিনডা বরকি আর আমি। বাড়ির পোলা অইয়াও থাকি বাড়ির কামলার লাহান।
চাচা কি আপন চাচা?
হ। একদোম আপন। আমার বাপের বড়ভাই।
বড়ভাই?
হ। আমার বাপে অল্প বসে মইরা গেছে। বাপের আগে মরছে মা’য়। আমার জন্মের সময়। তারবাদে বাপে আর বিয়াশাদি করে নাই। অসুইক্কা মানুষ আছিল। মা’য় মরনের দুই-তিন বছর পর হেয় মরলো। আমি কাকার পোলাপানের লগে বড় হইলাম।
আপনের বাপ চাচারা দুই ভাইঐ।
হ। আমার কোনও ফুবু নাই। মা’র দিকে মামা খালারা আছে। মা’য় মরণের পর তারা কেঐ আমার খোঁজখবর লয় নাই। আমার নানার বাড়ি হইল বহর গেরামে। তারাও গরিব। আর পোলা জন্ম দেওনের সময় তাগো বাড়ির মাইয়া মইরা গেছে, পোলাডা অইলো অলইক্কা (অলক্ষুনে)। হেই পোলারে কে দেকতে আইবো? কে নিবো? চাচায় চাচি হালাইতে পারে। নাই দেইক্কা রাখছিলো। বাইত্তে তো কুত্তা বিলাইও পালে মাইনষে। আমারেও অমতেঐ পালছে। উটতে বইতে লাত্তিগুতা, বকাবাজ্জি। চাকরের লাহান সংসারের বেবাক কাম করাইতো ছোডকাল থিকা। বড়কালে অইয়া গেলাম কামলা।
দবিরের দিকে তাকাল রব্বান। আর সইজ্য অইতাছিল না কাকা, বুজলেন। এর লেইগা বাইত থিকা বাইর অইয়া আইয়া পড়ছি।
দবির চিন্তিত গলায় বলল, বেবাকঐ বুজলাম, তয় একখান কথা বুজলাম না বাজান?
রব্বান মাথা চুলকাল। কোনডা বোজেন নাই কন তো কাকা? জাগাসম্পত্তির কথা, বাড়িঘরের কথা। খাড়ন খাড়ন আপনের কিছু কইতে অইবো না, আমিঐ কইতাছি। আমার বাপ আর চাচায় দুইভাই, তাগো বাপের সম্পত্তির মালিক আমার বাপে আর চাচায়। আমি বাপের একমাত্র পোলা। আমার বাপের ভাগের সম্পত্তি পুরাডা একলা আমার পাওনের কথা। কারণ দাদার সম্পত্তির অর্ধেকের মালিক তো আমার বাপে, আরেক অর্ধেকের মালিক চাচায়। বড় অইয়া এইডা আমি বুজছি। বুইজ্জা একদিন কথাডা উডাইছিলাম। হুইন্না আমার চাচায় খুবই মনে কষ্ট পাইলো। কইলো, বুজছিলাম এই কথা তুই একদিন উডাইবি। তয় আর কোনওদিন উডাইচ না। তরে যে লাইল্লা পাইল্লা বড় করছি, তর পিছে এতদিনে আমার যে খরচা অইছে, তাতে তুই অহন আর ভাগে কিছু পাবি না। থাক আমার সংসারে। আমি তরে হালামু না। আমার পাঁচ পোলা, তিন মাইয়া। তারা তরে আপন ভাইঐ মনে করে। তয় তুই জাগা সম্পত্তির দাবি করছস হোনলে বেবাকতে রাগ করবো। তরে বাইত থিকা বাইর তো করবোই, মাইর ধইরও করতে পারে।
এইডা কোনও কথা হইলো?
আমিও কই, এইডা কোনও কথা হইলো! দেশে বিচার সালিশ আছে না, আইন আছে না? আমি দেশগেরামের মাতবরগো কাছে বিচার দিতে পারি। চেরম্যান মেম্বরের কাছে বিচার দিতে পারি। কোট কাঁচারিতে গিয়া কেস করতে পারি। তয় আপনে কইবেন এই হগল করি নাই ক্যা? করি নাই কাকা ডরে। চাচার সইজ্জা পোলাড়া অতি পাজি। আমারে একদোম জব কইরা হালাইবো। জানের থিকা জাগাসম্পত্তি বেশি অইলোনি, কন? আগে তো জানে বাঁচতে অইবো, নাকি! জানে বাচনের ডরে আমি কেঐরে কিছু কই নাই। কামলার লাহান ওই বাইত্তে পইড়া আছিলাম। চাচায় কইলো, না না চাচারে আমি একদিন। কইলাম, আমার বিয়ার বস অইতাছে, বিয়াশাদি করলে বউ লইয়া খামু কী? চাচায় কইলো, ক্যা, অহন যেমতে খাচ অমতেই খাবি। তুই আমগো খেতখোলায় কামলা দিবি আর তর বউ বাড়ির কাম করবো। হোনলেন কথা? আমি তো কামলা আছি। বউডা অইবো বান্দি। এই হগল হোনতে হোনতে আর পারলাম না কাকা। দিলাম ছাইড়া চাচার সংসার। বাড়ি থিকা কেঐরে কিছু না কইয়া আমার দুই-চাইরহান কাপড় চোপড় যা আছিল, একখান ছিড়া ব্যাগ আছিল, হেই ব্যাগ লইয়া এই মিহি আইয়া পড়ছি। হুনছি এই মিহি বিরাট সড়ক অইতাছে। কামের আকাল নাই। কামকাইজ কইরা নিজের জীবন নিজেই চালামু। ওই মালখানগর মিহি ইহজিন্দেগিতে আর যামু না।
হাঁটতে হাঁটতে জাহিদ খাঁ-র বাড়ি বরাবর সড়কে উঠল দবির আর রব্বান। আজ ফাল্গুনমাসের প্রথম শুক্রবার। এনামুল সাহেবের মসজিদে আজই প্রথম নামাজ হল। জুম্মার নামাজ। মাইকে আজান দিলেন মান্নান মাওলানা। পাড়ার এই বাড়ি ওই বাড়ি থেকে নামাজি মানুষরা এল জুম্মা পড়তে। এনামুল সাহেব ঢাকা থেকে আসছেন কাল বিকালে। মসজিদে জুম্মার নামাজ হবে তারপর মুসল্লিদের মেজবানি খাওয়াবেন তিনি। মুসল্লিদের সঙ্গে গ্রামের গরিব মিসকিনরাও খাবে। তাঁর আত্মীয় স্বজনরাও অনেকে এসেছে। দেলোয়ারার মেয়ে মাফিন আসছে জামাই নিয়া। এনামুলের বউ পারভিন আসছে, দেলোয়ারা আসছে। এনামুলের ভাইবোনরা প্রায় সবাই আসছে, আসে নাই শুধু মাজারো ভাই। এনামুলের মা। আসতে পারেন নাই। তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না। শরীরের ওজন এত বেড়েছে, দুই পা শরীরের উপরের অংশের ভার রাখতে পারে না। তিনি আছেন বিছানায় পড়ে। মন্নাফ হাওলাদারের ছেলেরা আসছে বউ বাচ্চাকাচ্চা নিয়া। দুইটা ষাঁড় গোরু জবাই করা হয়েছে। লগে বালাম চাউলের ভাত, ডাল আর অবশেষে ঘন দুধের ফিরনি। বাড়ির পালানে শামিয়ানা টাঙিয়ে, মাটিতে দস্তরখান বিছিয়ে খেতে দেওয়া হয়েছে মুসল্লিদের। জুম্মা শেষ করে সবাই আসছে দেলোয়ারাদের পালানে। মোতালেব আর মান্নান মাওলানা জুম্মা শেষ করে মুসল্লিদের নিয়া আসছে খেতে। গোরুর তেলতেলা সুরা গোস্তর লগে বালাম চাউলের ভাত, তারপর ডাল, তারপর ওইরকম ফিরনি, খেয়ে এনামুলের যে কী তারিফ শুরু করল সবাই। একদিকে পাড়ায় একখান এত সুন্দর মসজিদ করেছে এনামুল, চাইছিল চল্লিশ দিনে, পারে নাই। দুই মাস লাগল। তাও মাত্র দুই মাসে মসজিদের কাজ শেষ করে, যেদিন প্রথম জামাত হল মসজিদে সেই দিনই মেজবানি, বিরাট ব্যাপার!
