মতিমাস্টার হাসিমুখে বললেন, দেও।
মুকসেদ বলল, আমারে ইট্টু কম কইরা দিয়ো বইন। বিয়ানবেলা বেশি খাইতে পারি না আমি। আর তোমার লেইগা রাইখো কইলাম। বেবাক আমগো খাওয়াইয়া দিয়ো না।
আছিয়া হাসল। না দাদা। অনেক জাউ আছে। আমরা খাওনের পরও পোলাপানে আরও এক-দুই থাল কইরা খাইতে পারবো।
রসের জাউ খেতে খেতে মতি মাস্টার একসময় বললেন, আল্লাহর ঘরের চেয়ে পবিত্র আর কিছু হইতে পারে না। এনামুল সাবে খুব ভাল একটা কাজ করল গ্রামে। মানুষের নামাজ আদায় করার ঘর তৈরি করে দিলেন।
মুকসেদ মুখের জাউ গিলে বলল, সেইটা ঠিক আছে। তয় ইমাম হইতাছে আমগো হুজুরে। মান্নান মাওলানা। সে নিজে যুদি ঠিক থাকে…
কথা শেষ করল না মুকসেদ।
মতিমাস্টার বললেন, না না ঠিক থাকবেন। মানুষকে নিয়া খারাপ চিন্তার দরকার নাই। আল্লাহপাক তাকে হেদায়েত করুন। দোষ ত্রুটি কাটায়া তিনি য্যান ইমামতিটা ঠিক মতন করেন। বিচার সালিশ শরিয়ত মোতাবেক করেন। কারও উপর য্যান অবিচার না করেন। আমরা তাঁর জন্য সেই দোয়াই করি।
তারপর হঠাৎ করেই যেন রসের জাউয়ের মূল স্বাদটা টের পেলেন মতি মাস্টার। কথার তালে ছিলেন বলে যেন বুঝতে পারেন নাই এমন দুর্দান্ত স্বাদ হয়েছে জিনিসটার। বললেন, জাউটা কেমন লাগছে?
মুকসেদ হাত দিয়াই জাউ খাচ্ছে। হাতের চার আঙুল বেঁকা করে খানিকটা জাউ তুলে মুখে দিল। দিয়া বলল, বিরাট সাদের জিনিস। খাজুরের রসের কোনও তুলনা হয় না। মাস্টারসাব। আল্লায় কত সাদের নিয়ামত যে মাইনষের লেইগা দিছে, তার মইদ্যে এই একখান হইল খাজুরের রস।
মতিমাস্টার বললেন, আরবদেশে যত উদ্ভিদ আছে, গাছপালা আছে তার মধ্যে খাজুরগাছকে বলা হয় রানি। খাজুর ফল খুবই পরিচিত আর দামি। আরবরা বলে উৎকৃষ্টতম ফল। এর উপরে কোনও ফল হয় না। খাজুরের রস দিয়া ‘নাবিয’ নামের মদ তৈরি করা হয়। ওই মদ বেদুইনদের বিরাট পছন্দ। খাজুরের বীজ গুঁড়া করে উটের খাবার খইল তৈরি করে আরবরা। প্রত্যেক বেদুইনের দুইটি স্বপ্ন থাকে, পানি আর খাজুর খেতে পাওয়া। হজরত মুহাম্মাদ সাল্লালাহেআল্লাইহেওয়াসাল্লাম আদেশ দিয়াছিলেন, তোমার চাচি, খেজুরকে সম্মান করো। কারণ আদমের মতো একই উপাদানে তারা তৈরি হয়েছে। মদিনা ও তার আশেপাশে একশো রকমের খাজুরগাছ দেখতে পাওয়া যায়।
মুকসেদ তারপর অন্যরকম একটা কথা বলল। তার অর্থ হইল খাজুর খুবই পবিত্র গাছ। এই গাছ ঝুইরা রস বাইর করে দবির গাছি। আমগো খাওয়ায়। আর তার মতন একটা মাইনষের মাইয়ারে লইয়া হুজুরে যেই কারবারটা শুরু করছে, এইডা তো বড় অন্যায়। হইতাছে মাস্টার সাব।
মতি মাস্টার আরেকটু রসের জাউ মুখে দিয়া বললেন, এখন মসজিদের ইমামতি করবেন হুজুর। মন আগে যেমুনই আছিল, এখন হয়তো বদলাবেন। এখন হয়তো সত্যিকার ভাল মানুষ হয়ে যাবেন।
মুকসেদ বলল, আল্লায় য্যান তারে সুমতি দেয়।
৩.৭ কোন বাড়ির পোলা
আপনেরে চিনলাম না বাজান। কোন বাড়ির পোলা আপনে?
পোলাটার বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ বছর। মাথায় বাবরি ধরনের তেলতেলা চুল। মুখে দাড়িমোচ। গায়ের রং কালো। তবে চেহারায় মিষ্টতা আছে। লম্বায় দবিরের মতনই। হবে। একহারা গড়ন। পরনে ঢোলাঢালা খাকি প্যান্ট আর ফুলহাতা খয়েরি রঙের গেঞ্জি। গলায় গেরুয়া রঙের পুরানা মাফলার। পায়ে টায়ারের স্যান্ডেল। সবই অতি পুরানা, অতি ময়লা।
দবিরের কথায় হাসল সে। কেমনে চিনবেন? আমি এই গেরামের পোলা না।
তয়?
আমগো বাড়ি হইল মালখানগর। মালখানগরের নাম হুনছেন না? ওই যে বোসের বাড়ি আছে! বোসরা আছিল মালখানগরের জমিদার। এতবড় বাড়ি আছিল তাগো, একখান বাড়ির মইদ্যে বাওন্নখান গল্লি (গলি)। বাড়ির পুবপাশে বিরাট দিঘি, বিরাট বান্ধাইন্না ঘাটলা। উত্তর দিকে আরেকখান দিঘি। উনিশ শো ছয়তিরিশ সালে মহাত্মা গান্ধী আইছিলেন মালখানগর গ্রামে। আমি হেই গেরামের পোলা। বোসের বাড়ির উত্তর মিহি যেই দিঘি আছে হেই দিঘির পুবপারে আমগো বাড়ি।
দবিরের কপালে দুই-তিনটা ভাঁজ পড়ল। আপনে হিন্দু?
আরে ধুরো। হিন্দু অমু ক্যা? মোসলমান, মোসলমান। আমার নাম হইল রব্বান। রব্বান শিকদার। মালখানগরে অহন কি আর আগের লাহান হিন্দু আছেনি? যেই দুই-চার ঘর আছে তারা হইল গরিব। দুইন্নাইর গরিব। নাপিত সাহা কামার, এই পদের। বোসের বাড়ি কি অহন আর বোসের বাড়ি আছে। মোসলমানরা দখল মখল কইরা লইছে। তয় আমগো গেরাম বিক্রমপুরের অনেক গেরামের মতনঐ ধনী গেরাম। বিরাট বিরাট ধনী আছে। ঢাকায় কায়কারবার করে। গেরামে সাই সাই দালান কোঠা উডাইছে। গেরামড়া বহুত সোন্দর। যেই দুই-চাইর ঘর গরিব মানুষ আছে তাগো মইদ্যে আমি একজন। তয় আমগো আততীয় স্বজনরা পয়সাআলা। জাগা সম্পত্তি বাড়িঘর, ঢাকার টাউনে কায়কারবার করে, চাকরি বাকরি করে। মালখানগরের সিকদারগোও নাম আছে। খালি আমারঐ কিছু নাই। মা বাপ ভাই বইন কেউ নাই। অনাথ এতিম। একটা চাচা আছে, হেই চাচার সংসারে মানুষ অইছি।
দবির বুঝল রব্বান একটু গল্পবাজ টাইপের। এককথার জবাবে অনেক কথা বলে। তবে বলে খুব সুন্দর করে। কথার ফাঁকে ফাঁকে হাসে। হাসিটা সুন্দর। কথা আর হাসি যার সুন্দর মানুষ তাকে সহজেই পছন্দ করে। দবিরও রব্বানকে খুব পছন্দ করল। হাসিমুখে বলল, মালখানগর থিকা আপনে বাজান এতদূর আইছেন ক্যা? কই মালখানগর, কই মেদিনমণ্ডল?
