ফেরেশতারা এই দোয়া পাঠ করলেন।
ততক্ষণে রোদ আরও চড়েছে। রোদে তাপে শীত কমেছে অনেক। আছিয়া রসের জাউ চুলা থেকে নামিয়েছে। দুইটা টিনের খাবদা থালে (যে থালায় খাবার বেশি ধরে) জাউ বেড়ে ঠান্ডা করার জন্য রেখেছে। বেশি গরম জাউ পোলাপানে মুখে দিতে পারবে না। একটা অ্যালুমিয়ামের জগে পানি নিয়েছে, টিনের দুইটা হাতলআলা মগ নিয়েছে। কথা শোনার ফাঁকে রান্ধনঘরের দিকেও চোখ ছিল মুকসেদের। আছিয়ার কাজ শেষ হয়েছে দেখে সে মতি মাস্টারকে বলল, জাউ হইয়া গেছে মাস্টার সাব। আমি বইনরে ইট্টু সাহাইয্য করি। আমার মা-বাজানের খিদা লাইগা গেছে। তাগো খাওয়াই। খাওয়াইতে খাওয়াইতে আপনের কথা হুনুম নে। তার বাদে আমরা খামু নে।
মতি মাস্টার হাসিমুখে বললেন, ঠিক আছে দাদা, ঠিক আছে।
মুকসেদ উঠে দাঁড়াতে যাবে, দেখা গেল তার জামার কোনা টেনে ধরে রেখেছে মানিক। মানিকের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে মুকসেদ বলল, ছাড়ো বাজান, ছাড়ো। তোমার খাওন আনতাছি।
মানিকের হাত ছাড়িয়ে রান্ধনঘরে এল সে। দেও বইন, বাজানের থালাডা আমারে দেও।
ছেলেমেয়েকে জাউ খাওয়াবার জন্য দুইটা চামচও ধুয়ে রেখেছিল আছিয়া। দুই থালে দুই চামচ দিয়া একটা থাল মুকসেদের হাতে দিল সে, আরেকটা নিজে নিয়া উঠানে এল। খাবার দেখে খলবল খলবল করে উঠল হিরা-মানিক। বাপের কোল থেকে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকাল হিরা। সকালবেলার রোদের মতন আনন্দে ফেটে পড়ছে মুখ।
মুকসেদের হাতে জাউয়ের থাল দেখে একই অবস্থা মানিকের। তারা দুইজন দুইজনকে চামচে করে জাউ খাওয়াতে লাগল। মতিমাস্টার উঠে গিয়া পানির জগ আর মগ দুইটা এনে রাখল তাদের কাছে।
রসের জাউয়ের গন্ধে তখন উঠানে একটা কাক নামছে। বাড়ির মোরগ মুরগিগুলি এদিক ওদিক চরছে। চারটা হাঁস পালে আছিয়া। হাঁসগুলি কুঁড়া খেয়ে নেমে গেছে পুকুরে। শালিক পাখি ডাকছে ঘরের চালে বসে।
হিরা-মানিক দুইজনেই তখন হুমহাম করে, বেশ মজা করে, ঠোঁটে মুখে নানা রকমের স্বাদের শব্দ করে রসের জাউ খাচ্ছে। মতি মাস্টার তার মতো করে আবার কথা বলতে শুরু করেছেন। জান্নাত হতে হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লামকে আল্লাহপাক যখন পৃথিবীতে নামালেন তখন তার মাথা ছিল আকাশে আর পা মাটিতে। তাঁর পা যখন। মাটি স্পর্শ করল তখন আকাশে বিদ্যুৎ চমকাবার মতন দৃশ্য দেখা গেল। আল্লাহপাক হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লামকে নাড়া দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ষাট হাত লম্বা হয়ে। গেলেন। হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম আল্লাহপাকের কাছে আরজ করলেন, “হে। আল্লাহ! আমি ফেরেশতাদের আওয়াজ শুনতে অক্ষম কেন?’ জবাবে আল্লাহপাক বললেন, ইহা তোমার অপরাধের কারণেই, কিন্তু এখন তুমি পৃথিবীতে যাও। সেখানে তোমার। ইবাদতের জন্য একখানা গৃহ প্রস্তুত করো। ওই গৃহ তওয়াফ করো এবং চারপাশে আমার প্রশংসা করো, যেমন তুমি আমার ফেরেশতাদেরকে আরশের চারপাশে করতে দেখেছো।
হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম চলতে লাগলেন, পৃথিবী তার নিকটতর হতে লাগল এবং বিশাল প্রান্তর, পাহাড় পর্বত নদীনালা সবকিছুই সংকুচিত হতে লাগল। বিশাল প্রান্তর আর সমুদ্র তিনি এক এক পদক্ষেপে অতিক্রম করতে লাগলেন। পৃথিবীর যে যে জায়গায় তাঁর পায়ের স্পর্শ পড়ল সেইসব জায়গা আবাদি ও বরকতময় হতে লাগল। তিনি বহু প্রান্তর ও সমুদ্র অতিক্রম করে পবিত্র মক্কাভূমিতে এসে পৌঁছালেন। তারপর বায়তুল হারাম বা কাবা শরীফ নির্মাণ করলেন। হজরত জিবরাইল আলাইহেওয়াসাল্লাম যখন তাঁর পাখা দিয়া পৃথিবীর মাটিতে আঘাত করলেন তখন কাবা শরীফের ভিত পৃথিবীর সবচেয়ে নীচের স্তর। থেকে উপরের স্তরে দৃশ্যমান হল। ফেরেশতারা সেই ভিতের উপর পাথর ঢালতে লাগলেন। সেইসব পাথর এত বড় বড় আকৃতির যে ওই পাথরের একটি তিরিশজন পুরুষমানুষেও তুলতে পারবে না। এইসব পাথর ফেরেশতারা সংগ্রহ করেছিলেন পাঁচটি পর্বত থেকে। ১. লেবানন ২. তুরেজিতা ৩. তুরেসিনা ৪. জুদি বা আরারাত পর্বত ৫. হেরা পর্বত।
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহুআনহু বলেছেন, হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম। প্রথম কাবাগৃহ নির্মাণ করেন। তারপর তিনি সেখানে নামাজ ও তওয়াফ আদায় করেন। অনেকদিন পর মানুষের বেইমানি ও কুফুরির সীমা অতিক্রম করলে মানবজাতির শাস্তির জন্য হজরত নূহ আলাইহেওয়াসাল্লামের জামানায় আল্লাহর হুকুমে এক মহাপ্লাবনের সৃষ্টি হয়। এই সময় কাবাগৃহও সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়।
তারপর আল্লাহপাক হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম ও হজরত ইসমাইল। আলাইহেওয়াসাল্লামকে নবি মনোনিত করে দুনিয়াতে পাঠালেন। তারা কাবা শরীফের ভিত ও দেওয়াল মাটি খুঁড়ে তুললেন। কাবাগৃহ বেহেশতের বায়তুল মামুরের বরাবর সোজা, নীচে স্থাপন করা হয়েছে।
মতি মাস্টারের কথা খুবই মন দিয়া শুনছিল মুকসেদ আর আছিয়া। ফাঁকে ফাঁকে হিরা মানিকের খাওয়ার কাজও চালিয়ে গেছে। একথাল জাউ শেষ করে আরও খেতে চেয়েছে হিরা-মানিক। আছিয়া আরও আধাথাল পরিমাণ জাউ এনে দিয়েছে। দেড়থাল করে রসের জাউ খেয়ে দুইজন তারা মহাখুশি। পানি খেয়ে, মুখ মুছে দু’জনেই এখন আনন্দিত মুখে বসে আছে। আছিয়া মতিমাস্টারের দিকে তাকালেন। এইবার আপনেরা খান। বেইল তো অনেক অইছে।
