মুকসেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, খানিক উদাস হয়ে রইল। তারপর বলল, অহন যেই ইমাম সাব আইছেন তিনি মানুষ কেমুন?
গম্ভীর প্রকৃতির। চুপচাপ নিজেরে নিয়া থাকেন। কোরান কিতাব পড়েন। একলা একলা পায়চারি করেন। আমি দুই একদিন কথা বলছি। বাড়তি কথাবার্তা বলেন না। প্রশ্ন করলে উত্তর দেন, আর নিজের কিছু জানার থাকলে ওইটা জানতে চান।
আল্লাহর দুনিয়ার মানুষ এহেকজন এহেক পদেরঐ হয়।
তবে লোক তিনি ভাল।
আমি চিন্তা কইরা দেকছি মাস্টার সাব, দুইন্নাইতে ভাল মানুষঐ বেশি। যেই দুই চাইরটা খারাপ মানুষ আছে, ওই খারাপগুলিতে বদমাইশি কইরা দুইন্নাইডা ছ্যাড়াভেড়া কইরা হালায়।
একটু হাসল মুকসেদ। অমুন একটা বদমাইশের নাম আমার মুখে পেরায় আইয়া পড়ছিল, নামডা আমি কইতে চাই না। আপনে আমারে হিগাইছেন, মাইনষের ভাল গুণের কথাটা কইবেন, বদগুণের কথাটা না কওনই ভাল।
হ সেইটাই আপনি মাইনা চলবেন।
তয় মাস্টার সাব আমারে আইজ আপনে ইট্টু মজজিদ বিষয়ে বলেন তো! দুনিয়ার পয়লা মজজিদ কেমতে হইল, এইসব আমারে ইন্টু বলেন। রসের জাউ অইতে অইতে মজজিদের কথা হুনি।
হিরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মতি মাস্টার বললেন, কাবাগৃহই হচ্ছে পৃথিবীর সর্বপ্রথম ইবাদত গৃহ। সুরা আল ইমরান’ এর ৯৬ আয়াতে আল্লাহপাক বলেছেন, “নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা মক্কাতেই অবস্থিত, তা সৌভাগ্যযুক্ত ও বিশ্বজগতের পথপ্রদর্শক। কাবাঘর মোট এগারোবার নির্মিত হয়েছে। প্রথম নির্মাতা ফেরেশতাগণ। আল্লাহপাক তাঁর ফেরেশতাগণকে বললেন, “আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি প্রেরণার ইচ্ছা প্রকাশ করছি। শুনে ফেরেশতারা বললেন, হে পরওয়ারদিগার আমাদেরকে ছাড়া অন্য সৃষ্টি পৃথিবীতে কলহ বিবাদ ও রক্তারক্তি করবে এবং একে অপরের প্রতি হিংসাপরায়ণ হবে। তারপর বলল, এই সৃষ্টি আমাদের মধ্য হতে করুন আল্লাহপাক। তা হলে আমরা পৃথিবীতে কলহ বিবাদ রক্তারক্তি কিছুই করব না, এবং কেউ কারও সঙ্গে হিংসা বিদ্বেষ করব না। আপনার প্রশংসায় সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকবো, আপনার নির্দেশ মেনে চলবো, কখনও আপনার অবাধ্য হবো না। তখন আল্লাহপাক বললেন, “তোমরা যাহা জানো না, আমি তাহা জানি। তখন ফেরেশতারা। মনে করল যদিও তারা আল্লাহর কথার প্রতিবাদ করে নাই, তবু তারা ভাবল যে তাদের কথায় আল্লাহপাক হয়তো তাদের ওপর রাগান্বিত হয়েছেন। তারা ভয় পেয়ে গেল। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আরশে আজিমকে জড়িয়ে ধরল এবং কাঁদতে কাঁদতে মাথা উঁচু করে আল্লাহর গজবের হাত হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য হাতের আঙুল দিয়া ইশারা করল। এই অবস্থায় তারা বহুক্ষণ পর্যন্ত তওয়াফে থাকল। তখন আল্লাহপাক তাদের উপর দৃষ্টিপাত করলেন এবং রহমত নাজেল করলেন। আল্লাহপাক তাদের জন্য আরশে আজিমের নীচে চারটি স্তম্ভবিশিষ্ট একখানা গৃহ নির্মাণ করলেন। তারপর আল্লাহতাআলা বললেন, “তোমরা আরশকে ছাড়িয়া এই গৃহকে তওয়াফ করো। তখন থেকে ফেরেশতারা এই গৃহকে তওয়াফ করতে লাগল। এটাই বায়তুল মামুর’ নামে অভিহিত হল। এই গৃহে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টায় একেক দলে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা হাজির হয়, তওয়াফের পর তারা আর ফিরে আসে না। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বললেন, তোমরা পৃথিবীতে যাও এবং তথায় এই গৃহের অনুরূপ একখানা গৃহ প্রস্তুত করো। আল্লাহপাক পৃথিবীতে তাঁর সৃষ্টিকে এই গৃহ তওয়াফ করতে আদেশ দিলেন। যেমন করে আশমানবাসীগণ বায়তুল মামুরের তওয়াফে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা রত আছে।
মুকসেদ বলল, তওয়াফ অর্থ কী মাস্টার সাব?
তওয়াফ হচ্ছে প্রদক্ষিণ। প্রদক্ষিণ করা। প্রদক্ষিণ অর্থ বোঝেন তো?
জে বুঝি। ঘোরা।
জি।
বায়তুল মামুর সমন্ধে একটু বলেন?
বায়তুল মামুর হচ্ছে বেহেশতের একটি বিশিষ্ট নূরানি মসজিদ। শোনেন তার পরের কথা। হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম যখন আশমান থেকে অবতরণ করেন, মানে নেমে আসেন, তখন তিনি সর্বপ্রথম বায়তুল্লাহ শরিফকে তওয়াফ করেন। তার সঙ্গে ফেরেশতাদের দেখা হলো। ফেরেশতারা তাঁকে বললেন, বায়তুল্লাহ শরিফ তারা তওয়াফ করছেন হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লামের পৃথিবীতে আগমনের দুই হাজার বছর আগে থেকে। হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহুআনহু হতে বর্ণিত আছে, হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম হজ্জ করলেন এবং সাতবার ওই গৃহ তওয়াফ করলেন। তওয়াফের সময় ফেরেশতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। ফেরেশতারা বললেন, “আমরা আপনার দুই হাজার বৎসর পূর্ব হইতে হজ্জব্রত পালন করিয়া আসিতেছি। হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তওয়াফে কী কী দোয়া পাঠ করতে?’ ফেরেশতারা বললেন, “আমরা এই দোয়া পাঠ করি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করিতেছি এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদের অস্তিত্ব নাই এবং আল্লাহ অতি মহান।
হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম তাদের দোয়ার সঙ্গে যোগ করতে বললেন ‘আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কাহারও ভালমন্দ কিছুই করিবার ক্ষমতা নাই।
ফেরেশতারা তাদের দোয়ার সঙ্গে হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম যা বললেন তা যুক্ত করে দোয়া পাঠ করলেন।
হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম যখন বায়তুল্লাহ শরীফ পুনরায় নির্মাণের পর হজ্জ করলেন তখন তওয়াফের ফেরেশতারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, সালাম জানালেন। হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, “আপনারা তওয়াফের মধ্যে কোন কোন দোয়া পাঠ করতেন?’ ফেরেশতারা বললেন, আমরা আপনার আদিপিতা আদম আলাইহেওয়াসাল্লামের উল্লেখিত প্রথম দোয়া পাঠ করতাম। তারপর দ্বিতীয় দোয়াটি আগের দোয়ার সঙ্গে যোগ করে পাঠ করতাম। ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম ওই দোয়ার সঙ্গে যোগ করলেন, তিনি সর্বোচ্চ ও সর্বমহান।
