আর কিছু না ভেবে পায়ের কাছ থেকে চাকা (মাটির ঢেলা) তুলে কাকটার দিকে ছুঁড়ে মেরেছে মরনি। ধুর কাওয়া ধুর, যা যা।
শিকার নিয়ে এমনিতেই বিব্রত ছিল কাক তার ওপর এই আক্রমণ, ভয়ে শিকার ফেলে কা কা রবে আকাশ পাথালে উড়াল দিয়েছে দাঁড়কাক আর মুরগির ছাওটা ধপ করে পড়েছে গাছতলায়। পড়ে উঠে যে দৌড় দিবে সেই ক্ষমতা ছিল না। ঠোকরে ঠোকরে বুকের কাছটায় বেশ একটা গর্ত করে দিয়েছে দাঁড়কাক। দুইহাতে ছাওটাকে তুলে উঠানে নিয়া আসছে মরনি। হলুদ বাটার সঙ্গে চুন মিশিয়ে অতি যত্নে যখন ছাওটার ক্ষতের ওপর লাগাচ্ছে, খয়েরি চাদর পরা একজন মানুষ এসে দাঁড়াল অদূরে। মানুষটাকে মরনি খেয়াল করল না। ছাওটার যত্ন শেষ করে, পলোতে আটকে উদাস হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। কেন যে তার তখন মজনুর কথা মনে পড়ল! কেন যে বুকটা হা হা করতে লাগল!
আস্তে করে গলা খাকারি দিল লোকটা। চমকে লোকটার মুখের দিকে তাকাল মরনি। কেডা, কেডা আপনে?
লোকটা কাঁচুমাচু গলায় বলল, এইডা নুরু হালদারের বাড়ি না?
মানুষটার যে নাম ছিল নুরু হালদার সেকথা যেন মনেই ছিল না মরনির। আজ অচেনা একজন মানুষের কথায় মনে পড়ল। বুকটা আবার তোলপাড় করে উঠল। বলল, হ। আপনে কে?
মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। আমারে কি তুমি আর অহন চিনবা! তয় তোমারে আমি দেইক্কাঐ চিনছি। কোনও কোনও মানুষ থাকে চেহারা তাগো সহজে বদলায় না। তোমার চেহারা অমুন। আঠরো উনিশ বচ্ছরেও বদলায় নাই। আগের লাহানঐ আছে।
লোকটাকে তবু চিনতে পারল না মরনি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সে বলল, ভাল আছ বইন?
এবার বিব্রত হল মরনি। আছি ভালঐ তয় আপনেরে তো চিনতে পারি না।
দাঁড়িমোচে ভরা ভাঙাচোরা মুখে হাসল সে। কেমতে চিনবা! এতদিন বাদে দেখলা! আমার নাম আদিলউদ্দিন। বাড়ি কামাড়গাও।
হঠাৎ হঠাৎ কত যে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে মানুষের জীবনে! সময়ের চাপে কাছের মানুষ যায় পর হয়ে, বহুদূর পথ ঘুরে একদার আপনজন ফিরে আসে আপনজনের কাছে। তবে সময় অতিক্রম করে যত কাছেই আসুক তারা, সেই সময়ের দূরত্বটা অতিক্রম করতে পারে না। আদিলউদ্দিনকে চিনার পরও মরনি তা পারছিল না, আগের মতোই তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
আদিলউদ্দিন বলল, অহনও চিনো নাই বইন? আমি তোমার বইনজামাই। মজনুর বাপ।
মজনুর বাপ কথাটা শুনে কেঁপে উঠল মরনি। মনে হল এ কোনও মানুষ না, এ যেন এক আততায়ী দাঁড়কাক। হালদার বাড়ির আঙিনায় এসে ঘাপটি মেরে বসেছে, মা কুকরার মতো মজনুকে নিয়ে যখন ঘর থেকে বের হবে মরনি তখনই সাঁ করে এসে দুই পায়ের ধারাল নখে খামছে ধরবে মজনুকে। আকাশ পাথালে উড়াল দিয়ে মজনুকে নিয়ে চলে যাবে দূর অজানায়।
মুখখানা হাসি হাসি করে আদিলউদ্দিন বলল, তোমার বইনের নাম আছিল অজুফা, মজনুর জন্মের কয়দিন বাদেই চইলা গেল। মজনুরে কুলে লইয়া বইয়া রইছিলা তুমি। এই হগল তোমার মনে নাই বইন? ভুইল্লা গেছ?
ঝাঁঝাল গলায় মরনি বলল, বেবাক মনে আছে, কোনও কিছু ভুলি নাই। আপনের মনে না থাকতে পারে, আমার আছে।
পলোয় আটকানো ছাওটার দিকে তাকিয়ে রইল মরনি। এখনও কাত হয়ে পড়ে আছে। চোখ ঢুলু ঢুলু। ঘাড়টা জোর করে সোজা রাখতে চাইছে, পারছে না। প্রায়ই মাটিতে ঠেকে যাচ্ছে ঠোঁট। হলুদ চুন কতটা কাজ করতাছে কে জানে! বাঁচিয়ে রাখা যাবে তো ছাটাকে!
মরনির রাগি মুখ দেখে, ঝাঁঝাল গলা শুনে আদিলউদ্দিন একটু দমে গেছে। হাসি হাসি মুখ ম্লান হয়েছে। মরনি সেসব পাত্তা দিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আপনের লগেঐ তাইলে মজনুর কাইল দেহা অইছিলো?
হ। তুমি বোজলা কেমতে?
মজনু আমারে কইছে।
কী কইছে?
মজনুরে দেইক্কা কেমুন করতাছেন আপনে, এই হগল।
চাদরটা ভাল করে গায়ে জড়াল আদিলউদ্দিন। উৎসাহি গলায় বলল, আর, আর কী কইলো? আমি যে অর বাপ এইডা তো আমি অরে কই নাই!
না, ওইডা জানে না।
তয়?
তয় আবার কী! আমারে কইলো এমুন এমুন ঘটনা। আপনেগো বাড়ি কামাড়গোও এইডা হুইন্না আমার ইট্টু চিন্তা লাগছিল। তয় বিশ্বাস অয় নাই। আপনে মাইট্টাল অইবেন ক্যা? আপনে তো ভাল গিরস্ত আছিলেন!
আদিলউদ্দিন আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ আছিলাম। অহনও আছি।
তয় মাইট্টাল অইতে আইছেন ক্যা?
কপালে টাইন্না আনছে।
কেমতে?
পরের ঘরে তিনডা পোলা আমার। মার লাহান অইছে তিনজনে। সাই (মহা) পাজি। বড়ডার বয়স ষোল্ল সতরো। জাগা জমিন খেতখোলা বেবাক বুইজ্জা লইছে। তিন ভাইয়ে মিল্লা চোয় (চষে)। আমারে কামলার লাহান খাডায়। কথা কইলে পোলাপানের মায় ওডে পিছা (ঝাড়) লইয়া। তিন পোলায় গরুর লাডি দিয়া বাইড়ায়। মাইর ধইর খাইয়াও রইছিলাম। যামু কই! শেষতরি আর পারলাম না। তিন চাইরদিন আগে এমুন বাইড়ান বাইড়াইলো, এই চাইদ্দরডা গায় আছিলো, এই লুঙ্গিডা ফিন্দন, ঘেড়ি ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে তিন পোলায় বাইতথন বাইর কইরা দিল।
কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা ধরে এল আদিলউদ্দিনের। তবে এসব পাত্তা দিল না মরনি। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, তহন আরেক পোলার কথা মনে অইছে, না? তহন বাইর হইছেন আরেক পোলা বিচড়াইতে (খুঁজতে)!
মরনির কথায় একেবারেই কাতর হয়ে গেল আদিলউদ্দিন। চোখ ছলছল করে উঠল। না না পোলা বিচড়াইতে বাইর অই নাই। এই গেরামে আইছি মাইট্টাল অইতে। শইল্লে খাইটা যেই কয়দিন পারুম বাইচ্চা থাকুম। নিজের গেরামে, নিজের বাইত্তে, ঐ সংসারে আর ফিরত যামু না।
