মতি মাস্টার যেভাবে হিরাকে আদর করছেন সেই ভঙ্গিতে মানিককে আদর করতে লাগল মুকসেদ।
মতি মাস্টার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আপনেরে একটা কথা বলব দাদা?
জে বলেন। বাপ হিসাবে এইটা বলা ঠিক না। তারপরও বলি। আমার কিন্তু মানিকের চেয়ে হিরার জন্য মায়া লাগে বেশি। মাইয়াটারে আমি মনে হয় বেশি আদর করি।
মুকসেদ হাসল। জে সেইটা আমি বুঝি।
একসময় আরবদেশে কন্যা সন্তান জন্মাইলে জ্যান্ত কবর দেওয়া হইতো, জানেন?
জে, শুনছি।
সেই সময়টাকে বলা হয় জাহিলিয়া যুগ। জহল হইতাছে আরবি শব্দ। অর্থ হইলো মূর্খতা, অজ্ঞানতা, বর্বরতা। প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে ইসলাম প্রচারের পূর্বকাল পর্যন্ত সময়কে সাধারণত জাহিলিয়া বলা হয়। এই যুগে নবজাতক শিশুকন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হত। এই বিষয়ে একটা বইতে আমি পড়েছিলাম, একজন আরব বাণিজ্য উপলক্ষে বিদেশে যাওয়ার সময় তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বলে গেল, যদি তোমার পুত্রসন্তান হয় তবে তাকে লালন পালন করবে, আর যদি কন্যাসন্তান হয় তা হলে তাকে জন্মের পর আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিবে।
মুকসেদ হতভম্ব হয়ে মতি মাস্টারের মুখের দিকে তাকায়া রইল।
মতি মাস্টার হিরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, আরেকটা ঘটনা এত করুণ, শুনলে চোখে পানি আসে।
বলেন মাস্টারসাব, শুনি।
সেই যুগে আরব দেশে ওসমান নামে একজন লোক বাস করতেন। খুবই কঠিন হৃদয়ের মানুষ। তার চোখে কোনওদিন পানি আসত না। কোনওদিন কাঁদত না। জীবনে শুধু একবার কেঁদেছিল। তার স্ত্রী চাঁদের আলোর মতন ফুটফুটা একটা কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। ওসমান কন্যাসন্তান রাখবে না। জীবিত কবর দিবে। সেই শিশুকন্যার জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছে। কবর খুঁড়তে গিয়া ওসমানের দাড়িতে মাটি লেগে গেছে। ওইটুকু শিশুকে যখন সে জীবন্ত কবর দিচ্ছে, শিশুটি দুইহাত দিয়া তার বাবার দাড়িতে লেগে থাকা মাটিটুকু ঝেড়ে পরিষ্কার করে দিয়েছিল। তারপরও মেয়েটিকে সে জীবন্ত কবর দেয় আর জীবনে ওই একবারই কাঁদে।
ঘটনাটা বলতে বলতে চোখ ছলছল করে উঠল মতি মাস্টারের। হিরার মাথাটা বুকে জড়ায়া ধরলেন তিনি। অন্যদিকে তাকায়া চোখের পানি সামলালেন।
মুকসেদেরও মনটা তখন ভারাক্রান্ত। সেও অন্যদিকে তাকায়া রইল।
মতি মাস্টার বললেন, কায়েস বিন আসিম নামে একজন লোক ছিল সেই যুগে। তার চেয়ে বড় পাপী আর কেউ ছিল বলে আমার মনে হয় না। সেই তার নিজের দশটি কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছিল। মেয়েদের বয়স পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে। ‘কিতাবুল আগানী’তে উলেখ আছে, কায়েস যখন তার কন্যাসন্তানদের কবরস্থানে নিয়া জীবন্ত কবর দিচ্ছিল, তখন তার কন্যারা বলে উঠেছিল, বাবা, তুমি আমাদেরকে এইরকম ধুলাবালি ভরা মাটিতে ফেলে যাচ্ছ কেন? মেয়েদের এই করুণ আকুতি পাষাণ হৃদয় পিতার হৃদয়ে একটুও দাগ কাটে নাই। একটুও বিচলিত করে নাই সেই নিষ্ঠুরকে। একটা-দুইটা না, দশটা কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছিল কায়েস।
মুকসেদ কাতর গলায় বলল, মাস্টারসাব এইসব ঘটনা আর শোনতে চাই না। বহুত খারাপ লাগতাছে। কষ্টা হইতাছে।
মতি মাস্টার বললেন, আমারও কষ্ট হচ্ছিল। তবু বললাম। আমি আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটার জন্য, ছেলেটার জন্য জান দিয়া দেই, আপনার বোন জান দিয়া দেয়, আর এক ধরনের মানুষ আপন সন্তানকে…
কথা শেষ না করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন মতি মাস্টার।
রান্ধনঘরে আছিয়া খাজুরের জাউ নিয়া ব্যস্ত। চুলায় টগবগ টগবগ করে ফুটছে রস আর চাউল। চুলার পারে বসে আগুনের তাপে আরাম পাচ্ছে আছিয়া। জাউ হতে আরও সময় লাগবে। চাউল ফুটে গলে রসের লগে মিশে, সামান্য ঘন আর নয়তো পাতলা ট্যালট্যালা জাউ হবে। সামান্য ঘনটাই বানাবে আছিয়া। ঘনটাই পছন্দ করবে সবাই।
উঠানে রোদ তখন আরেকটু প্রখর হয়েছে। রোদের তাপ একটুখানি বেড়েছে। চকমাঠ, বাড়ির উঠান পালান, গাছপালা ঝোঁপঝাড় থেকে উধাও হতে শুরু করেছে কুয়াশা। শীতে জবুথবু হয়ে হিরা বসে আছে বাবার কোলে কাছে মুখ দিয়া, দুইহাতে তাকে জড়িয়েও ধরেছে। মানিক বসে আছে মুকসেদের গা ঘেঁষে। এখন আর তেমন খলবল খলবল করে শব্দ করছে না তারা, মুখেও ছেবড়ি (ফেনা) নাই। শীতের হাত থেকে রোদের তাপে চুপচাপ আরাম নিচ্ছে।
মতি মাস্টার বললেন, মুকসেদ দাদা, এনামুল সাবের মসজিদের খবর কী? কতখানি হইলো।
মুকসেদ বলল, কাম তো ধুমাইয়া চলতাছে। মাডি মুডি উডাইন্না হইয়া গেছে। ইট বালি সিমিট রট বেবাক আইয়া পড়ছে। ওস্তাগার জোগালুগো থাকনের ঘর হইছে, বিয়ান থিকা। সন্ধ্যা তরি কাম চলে। মজজিদের দেওয়াল হইয়া গেছে। দুই-একদিনের মইদ্যে ছাদ ঢালাই দিবো। হুজুর আর মোতালেব বিয়ান থিকাঐ ওহেনে থাকে। হুজুরে খালি ভাত খাওনের লেইগা দোফরে একবার বাইত্তে আহে।
একটু থেমে যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে মুকসেদ বলল, ও কয়দিন ধইরা ভাবতাছি আপনেরে একখান কথা জিগামু, জিগাইতেই পারি না।
কী কথা?
খাইগোবাড়ির হুজুরের খবর কী?
আগের হুজুরের?
হ।
ঢাকায় তার চিকিৎসা চলছিল। তবে একটা সময়ে সে আর ঢাকার হাসপাতালে থাকতে চায় নাই।
ক্যা?
হোনলাম, তিনি আপেল মেম্বার, মাসুদ খান সাহেব তাদেরকে বলছেন, আমি আমার গ্রামে গিয়া থাকতে চাই। পরিবার, ছেলেমেয়েদের কাছে গিয়া থাকতে চাই। আল্লাহপাকের যখন আদেশ হবে তখনই মরণ হবে। নিজের গ্রামে, নিজের বাড়িতে, পরিবারের সবার মধ্যে থাইকাই মরতে চাই। তখন তারা তারে নোয়াখালিতে, তার গ্রামে পাঠাইয়া দিছে। মাওলানা হুজুরের দুই ছেলে আসছিল বাবাকে নিতে। খান সাহেবরা ভাল টাকা পয়সাও দিয়া দিছেন।
