এই নিয়া কথা বলল না মুকসেদ। রসের হাঁড়ি রান্ধনঘরে নামিয়ে বলল, রসের জাউ রান্ধো বইন। বেবাকতে মিলা খামুনে।
আছিয়া হাসিমুখে বলল, দবিরগাছি আইছিলো নি?
হ। আমিঐ খবর দিছিলাম। দুই ঠিলায় যা রস অয় দিয়া যাইতে কইছিলাম। এক ঠিলা আমগো বাড়ির মাইনষের লেইগা আরেক ঠিলা তোমগো লেইগা। কো, আমার মা আর বাজানে কো? ওডে নাই? মাস্টার সাবে ওডে নাই?
হিরা-মানিককে–বাজান ডাকে মুকসেদ।
আছিয়া বলল, উটছে বেবাকতে। অহনতরি কেঁতার তলে।
তয় তুমি জাউ বহাইয়া মা’র কামডি সাইরাহো, মাস্টার সাবরে কও বাজানের কাম সারাইতে। আমি কুলে কইরা দিয়ামুনে। তোমরা বাকি কাম সারাইয়া আহো। রইদ উটলে আমি অগো রইদ্রে আইন্না বহামুনে।
আইচ্ছা।
দৌড়ে বড়ঘরে গিয়া ঢুকল আছিয়া। সেরখানেক আলা চাউল (আতপ চাউল) এনে, ধুয়ে পাকলে চোখের পলকেই রসের জাউ চড়ায়া দিল চুলায়। বাড়িতে ততক্ষণে খবর হয়ে গেছে। মুকসেদ আসছে। হিরা-মানিক খলবল খলবল করতে শুরু করেছে।
প্রথমে হিরাকে জায়গা মতন নিয়া গেল মুকসেদ। লগে গেল আছিয়া। তার কাজ শেষ হওয়ার পর আছিয়া ডাকলো, দাদা, অইয়া গেছে।
ততক্ষণে একটু একটু রোদের আভা দেখা দিয়েছে। কুয়াশা পাতলা হচ্ছে। এই অবস্থায় হিরাকে এনে আবার চকিতে তুলল মুকসেদ। কথা প্যাচিয়ে বসিয়ে দিল। ঠিক একইভাবে সারল মানিকের কাজ। ততক্ষণে উঠানের অর্ধেকটায় রোদ। পুরানা ছেঁড়া একটা হোগলা আছে বেশ বড় সাইজের। সেই হোগলা নিজেই এনে রোদে বিছাল মুকসেদ। শীত পড়ার লগে লগে গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে মোটা মোটা পায়জামা ফুলহাতা পুরানা গেঞ্জি সোয়েটার কানটুপি মোজা এইসব কিনে এনেছিল। উঠানে হোগলা বিছিয়ে ঘরে ঢুকে দেখে হিরা মানিক একদম রেডি। হিরাকে পায়জামা গেঞ্জি সোয়েটার কানটুপি মোজা পরায়া যেমন ফিটফাট করছে আছিয়া, মতি মাস্টার করছেন মানিককে। সকালবেলার কাজ সেরে গরমে ওমে ভালরকম আরাম পাচ্ছে ছেলেমেয়ে দুইটা। আনন্দে খলবল খলবল করছে।
মুকসেদ তাদের দুইজনকে একে একে উঠানের রোদে এনে বসাল। ওদিকে চুলায় টগবগ টগবগ করে ফুটছে খাজুরের রসের লগে আলা চাউল। মনোহর একখান গন্ধে ভরে গেছে গনি মিয়ার আঙিনা। হিরা মানিক বুঝে গেছে ভাল জিনিস রান্না হচ্ছে বাড়িতে। গন্ধে আকুল হয়েছে তারা।
আছিয়া আবার ঢুকে গেছে রান্ধনঘরে। মুকসেদ বসেছে হিরা-মানিকের মাঝখানে। তাদের ভঙ্গিতে তাদের লগে খেলছে, কথা বলছে। মতি মাস্টার হাতমুখ ধুয়ে এসে একটা জলচকি নিয়া বসলেন রোদে, হিরা যেখানটায় বসেছে তার একেবারে গা ঘেঁষে। তার পরনে লুঙ্গি আর মোটা খদ্দরের সাদা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির ওপর বেশ মোটা খদ্দরেরই চাদর। চাদরটার রং হালকা নীল। পায়ে পুরানা স্যান্ডেল। চাদরে গা ঢেকে বেশ আরাম করে রোদে বসেছেন। মুকসেদ একবার তাঁর দিকে তাকাল। তিনিও তাকিয়ে ছিলেন মুকসেদের দিকেই। চোখাচোখি হতেই বললেন, হঠাৎ রস নিয়া আসলেন দাদা?
মুকসেদ হাসল। হঠাৎ না। দবিরগাছিরে বইলা রাখছিলাম। সে তো এই বাড়িতে আহে না, এর লেইগা ভাবলাম, আমগো বাইত্তে আইতে কই। দুই ঠিলা রস রাখুমনে। এক ঠিলা আমার ভাইর সংসারের লেইগা আরেক ঠিলা হিরা মানিকের লেইগা। নাইলে তো এইবারের শীতে আমার মা-বাজানের আর রস খাওয়া হইব না। তয় মাস্টারসাব আইজকার রসখানও পড়ছে। লাল টকটইক্কা রস। তয় বেবাক রস লাল আছিল না। যেই দুই ঠিলা লাল আছিল ওইডাঐ আমারে দবির দিছে। সব রস তো লাল অয় না। খাজুরগাছের সবাব তো আপনে জানেন। পুরুষ খাজুরগাছের রস অয় সাদা। বেশি মিডা অয় না। মিডা অয় মাইয়া খাজুরগাছের রস। রং অয় লাল।
হ এইটা জানি। দেখেন আল্লার কুদরত। একই রকম গাছ। তয় রস দুই রকম।
জে।
কিন্তু দবিরগাছি এই বাড়িতে আসবো না বললেন, কারণটা কী?
আপনে জানেন না?
কিছুটা জানি। গাছির মেয়ে নূরজাহান…
না খালি ওইটা না।
তবে?
মনে মনে মান্নান মাওলানাকে যতই গালাগাল করুক মুকসেদ মুখে সেই গালাগালের ভাব ফুটায় না। বেশ সয়সম্মান করেই কথা বলে।
এখনও সেইভাবেই বলল। আরে হুজুরে তো আরেকখান কাম করছিল।
কী?
নূরজাহানরে বিয়ার পোরোসতাব দিছিল।
মতি মাস্টার বেশ একটা ধাক্কা খেলেন। কন কী?
হ। ওই যে ঘটকা আছে ল্যাংড়া বসির অরে দিয়া পোরোসতাব পাঠাইছিল। গাছি রাজি হয় নাই। এনামুল সাবরে দিয়া মিটমাট করছে।
মতি মাস্টার মাথা নাড়লেন। ভাল কথা না।
জে। খুব খারাপ কথা। নাতিনের থিকাও ছোড় মাইয়াডারে বিয়া করতে চায়। তয় মজজিদের ব্যাপার না থাকলে এনামুল সাবের কথাও হেয় হোনতো না। গাছির মাইয়ারে বিয়া কইরা ছাড়তো। কীর লেইগা করতো, বুজছেন তো?
জি বুজছি। ভাল কথা না।
মানিক আজ একটু চুপচাপ। রোদে বেশ চুপচাপ বসে আছে। চোখ শীতের চকমাঠের দিকে। হিরা বাপকে পাশে পেয়ে তার কোলের কাছে চেপে গেছে। মতি মাস্টার মেয়ের মাথাটা কোলের কাছে ধরে মাথায় পিঠে আনমনা ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মেয়েটা শিশুর ভঙ্গিতে আদর নিচ্ছে।
মানিক একবার বাবার দিকে তাকাল। এই তাকানোটা খেয়াল করল মুকসেদ। বোনকে বাবা আদর করছে, এখনই হয়তো সে লেছড়ে লেছড়ে আসবে বাবার কাছে। বোনকে ধাক্কা দিয়া সরায়া দিতে চাইবে। বোনও সরবে না। দুইজনে একটা কিলাকিলি লাগবে। বিষয়টা বুঝে মুকসেদ বসল মানিকের গা ঘেঁষে। আহো বাজান তুমি আমার কাছে আহো। তোমারে আমি আদর কইরা দেই।
