হ এই হগল ঠিক আছে। আমিও এমতেঐ চিন্তা কইরা রাকছি। তয় এই জাগায় টিনের একচালা কইরা থাকতে বেড়াগো জান বাইর অইয়া যাইবো। যেই শীত পড়ছে।
এইসব শীতে মিয়া কামলা-কোমলাগো কিছু অয় না। অরা এই হগলে অভ্যস্ত।
একটু থামলেন মান্নান মাওলানা। তয় আমি অহন ইট্টু বাড়িমিহি যাই। নাস্তা পানি খাইয়াহি। ফয়জরের নমজ পইড়া আইয়া পড়ছি। খিদা লাইগ্না গেছে।
হেইডা আমারও লাগছে। তয় আমার নাস্তা এহেনেই দিয়া যাইতে কমু নে। খামু তো মুড়ি আর মিডাই। বাইত থিকা নিয়া আইবোনে। আপনে যান।
মান্নান মাওলানা বললেন, তয় দুইডা চেরও আনাইয়ো বাইত থিকা। এতক্ষুন খাড়াইয়া থাকন যায় না। ইট্ট বইতে পারলে সুবিদা।
আইচ্ছা আনামু নে।
ততক্ষণে বেলা বেশ হয়েছে। তবে রোদ উঠেছে এইমাত্র। তাও এমন পাতলা রোদ, কুয়াশা ভেঙে তেমন সুবিধা করে ছড়াতে পারছে না চারদিকে। শীতও কমে নাই।
মান্নান মাওলানা বাড়িমুখী হাঁটতে হাঁটতে একবার আকাশের দিকে তাকালেন। চকমাঠে যেটুকু রোদের আভাস দেখা যাচ্ছে সেই দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, এনামুল সাবের কথায় নূরজাহানরে বিয়া আমি করতে পারলাম না ঠিকঐ, যেইভাবে অর উপরে শোদ লইতে চাইছিলাম ওইভাবে শোদটা লইতে পারুম না। খায়েশটা মিটাইতে পারলাম না অর উপরে। তয় অরে আমি তারবাদেও ছাড়ম না। সুযুগ একখান পাইলেঐ অরে আমি খামু।
মান্নান মাওলানার এই ভাবনার লগে লগে চারদিককার রোদের আভা যেন ম্লান হয়ে গেল।
.
সকালবেলা এক ঠিলা খাজুরের রস নিয়া হাজির মুকসেদ।
এখনও রোদ ওঠে নাই। কুয়াশা এমন পড়া পড়ছে, চারদিক সাদা হয়ে আছে। মতি মাস্টারের সংসার জেগে উঠেছে ঠিকই, আছিয়া ছাড়া ঘর থেকে একজনও বের হয় নাই। এই ঘরের অর্ধেক জুড়ে বিশাল একখান চকি। এক চকিতেই চারজন মানুষ শোয় তারা। শীতের দিন বলে এই ব্যবস্থা। বেড়ার দিকটায় শোয়া হিরা তারপর আছিয়া তারপর মানিক তারপর মতি মাস্টার। কাঁথা কাপড়ের লগে চারজন মানুষের শরীরের ওমে শীত টের পাওয়া যায় না। রাত কাটে আরামে। সকালবেলা আছিয়া উঠে এক হাঁড়ি পানি গরম করে। সেই পানির হাঁড়ি রান্ধনঘরের সামনে রেখে দেয়। পাশেই থাকে পুকুর থেকে আনা এক বালতি ঠান্ডা পানি। গরম পানির লগে ঠান্ডা পানি মিলিয়ে সকালবেলার কাজগুলি শেষ করে তারা। মতি মাস্টার আর আছিয়ার তো কোনও সমস্যা নাই, সমস্যা হিরা-মানিককে নিয়া। পায়খানা ঘরের ওদিকটায় ধরে ধরে নিয়া হিরার কাজগুলি সারায় আছিয়া, মানিকেরটা মতি মাস্টার। হাঁটাচলা তারা করতেই পারে না, লেছড়ে ছেড়ে মা-বাবার লগে যায়। সিঁড়ি বেয়ে পায়খানা ঘরে উঠতে পারে না। ওদিককার জংলা মতন জায়গাটায় কাজ সারে। কাজ সারার পর মেয়েকে পয়পরিষ্কার করে আছিয়া, ছেলেকে মতি মাস্টার। সাবান টাবান দিয়া ভাল করেই করে কাজটা। কিছুদিন ধরে এইসব কাজে মতি মাস্টার আর আছিয়ার মতোই লেগে আছে মুকসেদ। সকালবেলা সে এসে পাথালি কোলে করে মানিককে নিয়া যায় পায়খানা ঘরের ওদিকটায়, হিরাকে নিয়া যায়। পরের কাজগুলি মা-বাবাই করায়। কাজ শেষ করে, পয়পরিষ্কার করে দেয় মা-বাবা, মুকসেদ গিয়া আবার কোলে করে নিয়া আসে। হিরা-মানিক এখন মা-বাবার মতোই মুকসেদের বাধুক। মুকসেদও যেন তাদের কাছে আরেকজন মতি মাস্টার, আরেকজন আছিয়া। মুকসেদকে দেখলেই আনন্দে খলবল খলবল করে হাসে তারা। উঠানে, জামগাছতলায় বসে থাকলে হেঁউচড়াইয়া হেঁউচড়াইয়া আসে মুকসেদের কাছে।
আরেকজন সঙ্গীও তাদের এই বাড়িতে ছিল। পারুর ছোটমেয়ে নূরি। সেই যে শ্রাবণমাসে চলে গেল তারা, আর ফিরল না। এই জীবনে হিরা-মানিকের লগে নূরির আর কোনওদিন হয়তো দেখাই হবে না।
মুকসেদেরও খুব মনে পড়ে নুরির কথা। কিছুদিন হিরা-মানিকের পাশে নূরিকেও দেখেছে। মান্নান মাওলানা আর আতাহারের কারণে চিরতরে এই বাড়ি ছেড়েছে তারা।
আজ সকালবেলা রসের হাঁড়ি নিয়া এই বাড়িতে আসতে আসতে নূরির কথাটাও একবার মনে পড়েছে মুকসেদের। আহা মাইয়াটা থাকলে হিরা-মানিকের লগে সেও ইট্টু রস খাইতে পারতো। রসের জাউ খাইতে পারতো। মন্নাইন্না শালার পো শালায় আর মানুষ অইলো না। আপন পোলার বউর লগে কতবড় বেইমানিডা করলো, নাতি নাতকুড়গুলির লগে করলো। বড়পোলা মোতাহার আর অর মায় মানুষ ভাল আছিল দেইক্কা আল্লায় তাগো উড়াইয়া নিছে। মন্নাইন্নাইর মাজারো পোলাডাও অইছে বাপের মতন ইবলিশ। বাপ বড় ইবলিশ, ওই শুয়োরের পোয় ছোড় ইবলিশ। আরে শুয়োরের পো, তর বাপে নাইলে টেকার ললাবে পোলার বউর লগে, নাতি নাতকুড়গো লগে বেইমানি করল। তুই করলি ক্যা রে চুতমারানির পো? পোলাপান তিনডা তো তোর। তাগো লেইগা তর মায়া লাগলো না? আর পারুর লাহান বউ তুই পাবি? অহন তো হোনতাছি ফাল্গুন মাসে তর বিয়া। বউ অইলো ট্যারি। চায় দিল্লি, দেহে লাহোর। টেকার লোবে বাপপুতে তরা এই কাম করলি? দোজকে যাবি শুয়োরের বাচ্চারা, হাবিয়া দোয়ক তগো লেইগা রেডি।
মুকসেদের পরনে আজ লুঙ্গির ওপর ফুলহাতা মোটা গেঞ্জি, গেঞ্জির ওপর নীল মোটা সুয়েটার। পায়ে মোটা কালো মোজা আর রাবারের পামশু। মাথায় পুরানা শ্যাওলা রঙের কানটুপি। হাতে রসের হাঁড়ি নিয়া মতি মাস্টারের বাড়িতে ঢুকেই সে দেখে আছিয়া গরম পানির হাঁড়ি রান্ধনঘরের বাইরে রাখছে। এক ঠিলা পানি কাল বিকালেই এনে জায়গা মতন রেখেছিল। আছিয়ার খালি পা, পরনে ত্যানা ত্যানা সবুজের কাছাকাছি রঙের সুতি শাড়ি, তার ওপর অতি সস্তা বহুদিনের পুরানা একটা চাদর জড়ানো। এইরকম শীতে এই সামান্য কাপড়ে কেমন করে আছে সে। চুলার পারে থাকলে আর কাজকাম করলে শরীর অবশ্য গরম হয়। শীত লাগে কম। তার পরও যেরকম শীত পড়ছে, তাতে এই কাপড়ে মানুষ থাকে কী করে?
