তবে মুখে এই বিরক্তির ছায়া পড়তে দেয় নাই। মোতালেব হচ্ছে এনামুলের মামা। আপন মামা না হোক, মা’র চাচাতো ভাই, আপনই। তাকে আবার মাটির কাজ দিয়েছে। এনামুল। ভাবচক্করে মনে হচ্ছে মসজিদের পুরা কাজের মধ্যেই তাকে রাখবে এনামুল। শুধু মান্নান মাওলানার হাতে ছেড়ে দিবে না। এই অবস্থায় মোতালেবের লগে রাগ বিরক্ত দেখানো ঠিক হবে না। অর লগে ভাও দিয়া চলনঐ ভাল। বললেন, ওই চোরার আবার কী কথা?
আছে কই?
ক্যা জেলে। মুনশিগুইঞ্জের জেলে।
কতদিনের জেল অইছে কিছু জানেননি?
না রে মিয়া, ওই হগল চোরমোর লইয়া চিন্তা করনের টাইম কো?
মোতালেব ঠোঁট টিপা হাসল। সেই হাসিটা খেয়াল করলেন মান্নান মাওলানা। হাসো ক্যা মিয়া?
হাসনের তেমুন কোনও কারণ নাই।
তয়?
ঘটনা অইলো কী হুজুর, মাকুন্দারে লইয়াও কথা হয় দেশগেরামে। মাইনষে কয় মাকুন্দারে আপনে চোর সাজাইয়া জেলে দিছেন মাকুন্দা ছনুবুড়ির জানাজা পড়তে গেছিল দেইক্কা। ভিতরে ভিতরে আপনের হুজুর বদলাম অনেক। শেষ বদলামখান অইছে। বড়পোলার বউরে লইয়া। আমি এই হগল কথা আইজ উডাইলাম এর লেইগা যে আপনে আর আমি একলগে মজজিদের কাম কাইজ করুম, আপনের বদলাম আমার বদলাম। গেরামের নতুন মজজিদের ইমাম অইবেন আপনে, আপনের তো বদলাম থাকন উচিত না। আপনে আল্লার খাসবান্দা। আপনের বদলাম থাকবো ক্যা?
মান্নান মাওলানা বিষণ্ণ হয়েছেন। অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, যে যত ভাল মানুষ তার ততো বদলাম রে দাদা। আমার হোগার পিছে লাইগ্যা থাকনের মানুষ তো দেশ গেরামে কম নাই। তারা এই হগল বদলাম করে। এই হগল কথায় তুমি মিয়া কান দিয়ে না। তোমারে আমি অহন সোজা একখান কথা কই, ভাইগনায় তো তোমারে খালি মাডি উডানের কাম দিছিল আর মজজিদের বাকি কাম অইলো আমার। আমি তোমারে কইতাছি, তুমি খালি মাডির কামে না, মজজিদের বেবাক কামেঐ আমার লগে থাকবা। আমারে আঠরো শো টেকা বেতন দিবো তোমার ভাইগনায়, তারে আমি কমু নে তোমারে আমি আমার লগে রাখতে চাই।
মোতালেব হাসল। ওইডা আপনের আর কওন লাগবো না হুজুর। ওইডা ফাইনাল অইয়া গেছে।
মান্নান মাওলানা চমকালেন। কী ফাইনাল অইয়া গেছে?
আইজ থিকা আপনের যেমুন বেতন অইছে আঠরো শো টেকা আমারও বেতন ঠিক কইরা দিয়া গেছে ভাইগনায়।
সত্যঐ?
হ।
কত ঠিক করছে?
বারো শো। আপনের আঠরো শো আর আমার বারো শো, মোট তিনহাজার টেকা মাসে মজজিদের লেইগা ভাইগনায় খরচা করবো।
তয় তো মিয়া বিরাট লাভ হইল তোমার। মজজিদ দেখভাল করবা হেই কামের লেইগাও বেতন।
কারণ আছে হুজুর। ওই যে কইছিলাম মজজিদের কামে এক পয়সাও এদিক ওদিক করুম না আমি। আল্লার ঘরের কাম কইরা টেকা খামু না। এর লেইগা ভাইগনায় আমারে পাকাপাকি বন্দোবস্ত কইরা দিছে।
এই ব্যবস্থা তেমন ভাল লাগল না মান্নান মাওলানার। সে অন্যমনস্ক হয়ে রইল। মোতালেব তখন ভিতরে ভিতরে উৎফুল্ল। মনে মনে বলল, কী রে শালার পো শালা, কেমুন সাইজ করলাম তরে? এই সাইজের কারণ কী জানচ, আমার লগে যাতে বড়কথা। কইতে না পারচ। আমার লগে যাতে মাতবরি করতে না পারচ। হোন অহন শেষ বাড়ি তরে দেই।
হাসিহাসি মুখে মোতালেব বলল, তয় হুজুর এই কামডা আপনে ভাল করেন নাই।
মান্নান মাওলানা আবার চমকালেন। কোনডা?
ওই যে গাছির মাইয়ার কামডা?অতডুমাইয়াডারে আপনেবিয়ার পোরোসতাব পাডাইছেন। কীর লেইগা পাডাইছেন, কী উদ্দেশ্য আপনের হেইডা কইলাম দেশগেরামের বেবাকতে বুজছে। আপনে কইলাম ধরা খাইছেন। মাকুন্দার লেইগা ক্যান নূরজাহান আপনেরে ছ্যাপ দিছিল হেইডা যেমুন দেশগেরামের বেবাকতে বুজছিল, এইডাও বেবাকতে বুজছে।
মান্নান মাওলানা হঠাৎ রেগে গেলেন। থোও মিয়া এই হগল প্যাচাইল। বুজলে আমার বাল হালানি যায়! আইজ মজজিদের কাম শুরু করছি আইজ এই হগল প্যাচাইল আর পাইড়ো না।
তারপর নরম হলেন মান্নান মাওলানা। লও দুই ভাইয়ে মিল্লা কামডা ভাল মতন শেষ করি। তারবাদে আমি মজজিদে ইমামতি করুম, তুমি থাকবা আমার লগে লগে। পাঁচওক্ত নমজ পড়বা। দেশগেরামের মুসল্লিরা তোমারে খাতির করবো। আমগো এই দিককার বিচার সালিশ শরিয়ত মোতাবেক বেবাক করুম তুমি আর আমি। মাতবরি থাকবো আমগো দুইজনের হাতে। তুমি যে আমারে এই হগল কথা কইলা, আমিও তো তোমার নামে কত কথা হুনি। ছুনিবুড়ির কাফোনের কাপড় থিকাও বলে তুমি চুরি করছে। আরও কতপদের কথা মাইনষে কয়। এই হগলে কান দিলে মিয়া জীবন চলে না। দুইজন দুইজনের বদলামের কথা বাদ দিয়া লও মিয়া কামের কাম করি।
মোতালেব গভীর উৎসাহের গলায় বলল, আপনের কথাঐ সই হুজুর। আমরা দুইজন অহন থিকা একপেট অইয়া চলুম। নিজেগো দোষোষ ধইরা লাব নাই। দোষে গুণেই মানুষ। আমরা দুইজন একপেট থাকলে দেখবেন এই পাড়ার বেবাক বিচার সালিশ মাতবরি আমরা দুইজনেঐ করুম। এমনেও খাইগোবাড়ির মাইনষে আমগো এইমিহি লইয়া চিন্তা ভাবনা করে না, অহন আমরা মজজিদি বানাইয়া হালাইতাছি, শরিয়ত মোতাবেক বিচার সালিশ আপনে আমি করলে খাইগোরাও আমগো লইয়া মাথা ঘামাইবো না। তারা থাকবো। তাগো মতন, আমরা থাকুম আমগো মতন।
মান্নান মাওলানা হাসলেন। এইত্তো লাইনে আইছো দাদা। আমি তো এইডা তোমারে কইতে চাইতাছি। অহন হোনো, আরেকখান কামের কথা কই। কাইল থনে ঢাকা থি কা টেরাক আইবো। পয়লা আইবো বশ কাঠ টিন ডেরাম এই হগলের টেরাক। কাদির মিস্তিরি আইবো আরও দুই-একজন ওস্তাগার লইয়া। জোগালুরা আইবো। ইঞ্জিনিয়ার সাবে আইবো। এই মাইট্টালডিরে তুমি ছাইড়ো না। অগো দিয়াঐ কইলাম জাহিদ খাঁ-র বাড়ির ওহেন থিকা ইট বালি রড সিমিট বেবাক টানন লাগবো। মাইট্টালগো আগেঐ কইলাম বেবাক কইয়া রাইখো। সড়ক থিকা দুই-আড়াইকানি জমিন ভাইঙ্গা ইটা আইন্না সাজাইয়া রাখবো এহেনে। রড রাখবো খোলা জাগায়। তয় সিমিট রাখন লাগবো টিনের যে একচালা অইবো ওই এক চালায়। ওস্তাগার জোগালুরাও ওই ঘরে থাকবো।
