মসজিদের কাজ শুরু করতে পেরে মান্নান মাওলানা আর মোতালেব খুবই খুশি। দশটাকা বেশি রোজে মাটিয়াল জোগাড় করাটাকে বিরাট গৌরব হিসাবে নিয়েছে মোতালেব। এখন। মসজিদ বাড়ির তেঁতুলগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে আছে সে আর মান্নান মাওলানা। মাটিয়ালরা তাদের মতন কাজ করছে। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে মোতালেব বলল, আমার ভাইগনায় বিরাট চালাক মানুষ হুজুর। ঠিক আমার মতন। আমিও ভাবতাছিলাম কহেকটা টেকা বেশি রোজ দিয়া মাইট্টাল আনুম। ভাইগনায় আইয়া ঠিক ওই কথাড়াই কইলো।
মান্নান মাওলানা চালাকির হাসি হাসলেন। তোমার ভাইগনা না মিয়া! চালাক না অইয়া পারেনি!
খোঁচাটা মোতালেব টের পেল। পেয়ে অন্য দিক দিয়া মান্নান মাওলানাকে খোঁচাটা ফিরিয়ে দেওয়ার পথ ধরল। ও আইচ্ছা, আপনেরে তো জিগাইতে ভুইল্লা যাই হুজুর। আতাহারের বিয়ার কী করলেন? ঘটকায় অহনতরি বিয়া ঠিক করতে পারে নাই?
পারছে।
কন কী?
হ। গাউদ্দার বহুত বড়ঘরের মাইয়া।
ও হেই কথা তো জানিঐ। তয় ওহেনেই ঠিক অইলো?
হ। আমরা যেমুন মাইয়া পছন্দ করছি, তারাও আতাহাররে বহুত পছন্দ করছে।
আতাহাররে না পছন্দ করনের কথা না। আপনের পোলা তো দেখতে মাশাল্লা! তয় দিবো কী?
বেবাকঐ দিবো। পোলার সংসার সাজাইয়া দিবো। নগদ টেকা দিবো চাইরলাখ।
মাশাল্লা মাশাল্লা। বিয়া কবে?
এই মাসেই করাইতে চাইছিলাম। পিছাইছে।
ক্যা?
এনামুল সাবে কইলো চল্লিশ দিনের মইদ্যে মজজিদের কাম শেষ করবো। মাঘমাসের দশ তারিখে মজজিদের কাম শেষ অইবো দেইক্কা আমি আতাহারের বিয়ার দিন তারিখ করছি ফাল্গুন মাসের সতেরো তারিখ। শুককুরবাইরা দিন।
এইডা ভাল করছেন। হ মজজিদের কাম শেষ কইরাঐ পোলার বিয়া দেন। পর পর দুইখান বড় কাম অইয়া গেল আপনের জীবনের। তয় এই মাসেও বিয়া করাইতে পারতেন। আতাহারের।
মান্নান মাওলানা মোতালেবের মুখের দিকে তাকালেন। কেমতে? বিয়ার কাম কি য্যানত্যান। পোলার বিয়ার কাম লইয়া থাকলে মজজিদের কাম দেখবো কে?
ক্যা আমি দেহুম?
মান্নান মাওলানা একটু থতমত খেলেন। না না ওইডা তো তুমি দেখবাঐ। তারবাদেও আমার থাকন দরকার আছে না! আমি না থাকলে এনামুল সাবে কইবো, আপনের লেইগা গেরামে মজজিদ বানাইতাছি আমি, আর আপনে হেই মজজিদের কাম হালাইয়া পোলার বিয়া করাইতাছেন।
মোতালেব মাথা নাড়ল। হ লেইজ্য কথা।
এর লেইগাই বিয়া পিছাইলাম।
এবার আসল খোঁচাটা মোতালেব মারল। তয় চাইর লাখ টেকার লেইগা কামডা আপনে করলেও পারতেন।
মান্নান মাওলানা অবাক। কোন কামডা?
ওই আর কী! বড়পোলার বউর বিষয়ডা…
মান্নান মাওলানা দমে গেলেন। গম্ভীর মুখে বললেন, বড়পোলার বউ তো মিয়া বাপের বাড়ি গেছে গা।
হেইডা তো জানি। আর এই ফাঁকেঐ আপনে আতাহাররে বিয়া করাইতাছেন!
আরে না মিয়া। কোনও ফাঁকফোকের আমার দরকার নাই। আমি আর আতাহারের মায় চিন্তা করছিলাম মোতাহারের বউর লগেঐ আতাহারের বিয়া পড়াইয়া দেই। বউ রাজি অইলো না।
কন কী?
হ।
আতাহার রাজি অইছিলো?
হ মিয়া। আমগো দিক থিকা কোনও অসুবিদা আছিল না। বউঐ রাজি হইল না। পোলাপান লইয়া বাপের বাড়ি গেল গা। অহন থিকা ওই বাড়িতেই থাকবো। তয় খরচাপাতি আমিঐ দিমু। মোতাহারের ভাগের জাগাসম্পত্তির দাম ধইরা টেকাপয়সাও দিয়া দিমু। যুদি টেকা অরা নিতে চায়। আর যুদি না নিতে চায় তয় ভাগের জাগা সম্পত্তিঐ মোতাহারের পোলাপানরা বড় অইয়া, সাবালক অইয়া যার যার ভাগেরটা নিবো। আমি কেঐরে ঠকামু না। যার যা পাওনা বুঝাইয়া দিমু। আমি হইলাম মিয়া আল্লার খাসবান্দা। আমি নিজের নাতি নাতকুড়রে, পোলার বউরে ঠকামুনি।
মোতালেব মনে মনে বলল, তরে আমি চিনি না শালার পো শালা। তুই দিবি জাগা সম্পত্তি বুঝাইয়া? সড়ক অইছে দেইক্কা এই এলাকার জাগাজমিনের দাম বহুত বাইড়া গেছে। হেই জমিন তুই দিবি নাতি নাতকুড়রে, পোলার বিধবা বউরে? কোন প্যাঁচ খাড়াইয়া বউডারে বাড়ি থিকা খেদাইছস কে জানে। আতাহারের বিয়ার রাস্তা কিলিয়ার করছস। তুই যেমুন শয়তান তোর পোলা তর থিকাও বড় শয়তান। দুইজনে মিলাঐ বউডারে বাইত থিকা খেদাইছস।
এই খোঁচাটাই মান্নান মাওলানাকে মারল মোতালেব। খুবই বিনয়ের গলায় বলল, হোনা কথার কোনও দাম নাই হুজুর। হোনা কথায় আমি কানও দেই না। তাও কথাডা আপনেরে আমার কওন উচিত। আমার কানে আইছে আপনেরা বলে বাপপুতে মিলা বড়পোলার বউরে বাড়িত থিকা খেদাইছেন। এমুন ষড়যন্ত্র করছেন, বউডা পোলাপান লইয়া চইলা যাইতে বাইধ্য হইছে।
মান্নান মাওলানা চমকালেন। কও কী মিয়া? হ। এই হগল কথা তো দেশগেরামে হইতাছে। আমার কানে আইছে। আমি তো হুনি নাই? আপনেরে ডরে কেঐ কয় নাই। আমি কইলাম এর লেইগা যে আপনে আর আমি মিলা মজজিদ বানাইতাছি। দুইজনের পেডের কথা দুইজনের জানন উচিত। না কী কন?
মান্নান মাওলানা কোনও কথা বললেন না।
চুপ করে রইলেন। মোতালেব মনে মনে বলল, কী রে শালার পো শালা অহন কথা কচ না ক্যা? ভাইগনারে লইয়া আমারে যে খোঁচাইলি, অহন উলটা খোঁচা খাইয়া কেমুন লাগতাছে?
তারপর আরেক লাইনে গেল মোতালেব। যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, অনেকদিন ধইরা ভাবতাছি একখান কথা জিগামু আপনেরে, ভুইল্লা যাই।
কী?
মাকুন্দার কথা।
মান্নান মাওলানা তাকিয়ে ছিলেন মাটিয়ালদের দিকে। কীভাবে মাটি কাটছে তারা, কীভাবে মোড়া ভরে তুলে এনে জায়গা মতন ফেলছে, কীভাবে বদলাচ্ছে ছাড়াবাড়িরটার এতদিনকার পুরানা চেহারা। ভিতরে ভিতরে বিরক্তও হয়ে আছেন মোতালেবের উপর। চুতমারানির পোয় এত প্যাচাইল পারতাছে ক্যা? আমার পোলা, পোলার বউ এই হগল লইয়া অর এত চিন্তা ক্যা?
