মোতালেব কাচুমাচু গলায় বলল, কী করুম কও মামু?
মাইট্রাল জোগাড় করেন।
মান্নান মাওলানা রাগী গলায় বললেন, এই ভেজালডা লাগাইছে ওই শুয়োরের পোয়। আলী আমজাদ। শালার পো শালায় কাম লইছে, কাম শেষ করে নাই। ক্যা রে বান্দির বাচ্চা, যেই কাম শেষ করতে পারবি না হেই কাম লচ ক্যা? অহন যে কেস খাইছস, পলাইছস। ধরা পড়লে যে জেলে যাবি? সরকারের কাম লইয়া চুদুরবুদুর করো? এতবড় সাহস তোমার?
এনামুল বিরক্ত হল। ওই হগল লইয়া আমগো চিন্তার কাম নাই মাওলানা সাব। আমরা আমগো কাম কেমতে করুম ওইডা কন।
মান্নান মাওলানা কাতর হলেন। আমরা কী কমু বাজান। তুমি কও।
মোতালেবের দিকে তাকাল এনামুল। এককাম করেন মামু, খবর লন সড়কের কামে মাইট্টালেরা রোজ পায় কত?
মোতালেব উৎসাহী গলায় বলল, আইচ্ছা লইলাম। তার বাদে?
তার বাদে কী করবেন বোজেন নাই?
মোতালেব মাথা নেড়ে বলল, বুজছি। তাও তুমি কও মামু।
সড়কের কামে রোজ যা পায় তার থিকা দশটেকা কইরা রোজ বেশি দিয়া মাইট্টাল ভাগাইয়া আনেন। চাইর-পাঁচদিনে আমার যুদি দুই-চাইর হাজার টেকা বেশি যায় যাইবো, কাম আমি পয়লা তারিখেই শুরু করুম। চল্লিশ দিনে শেষ করুম।
মোতালেব তারপর একটা লাফ দিল। আমিও এইডাই তোমারে কইতে চাইছিলাম। পয়সা বেশি দিলে মাইট্টাল আমি ঠিক ঐ ভাগাইয়া আনতে পারুম।
আনেন। যেই কয়জন লাগে আনেন।
মান্নান মাওলানা বললেন, বিশ-পঁচিশজনের বেশি লাগবো না।
মোতালেব ঠিকই একুশজন ভাগায়া আনল। ডহুরি-নওপাড়ার ওদিককার একটা দল। ঠাকুরবাড়ির বাঁশঝাড়তলার ওদিকটায় ছাপরা করে থাকে। রোজ দশটাকা বেশি পাওয়ার লোভে তারা আসছে। এই কাজ শেষ করে আবার যাবে সড়কের কাজে। গেলে যে সড়কের কাজ পাবে না সেই ভয় নাই। কারণ এখন আর কন্ট্রাক্টর সাহেবরা চোখে মুখে পথ দেখছেন। না। লোক যত পাবেন নিবেন। কে কয়দিন অন্য জায়গায় বেশি পয়সার লোভে কাজ করে এল, তাদের না নিয়া শাস্তি দেওয়া উচিত, ওইসব উচিত অনুচিত ভাববার সময় তাদের নাই।
এই পদ্ধতিতে মোতালেব চাইলে আরও মাটিয়াল ভাগাতে পারত। তার তো দরকার নাই। যেই কয়জন পাওয়া গেছে তাতেই চার থেকে পাঁচদিন, মসজিদ বাড়ির মাটি তোলার কাজ শেষ।
বেশ সকাল থেকেই আজ কাজ শুরু হয়েছে। পৌষমাসের শীত এমন পড়া পড়ছে এবার, হাড্ডির ভিতরকার মজ্জা তরি শিরশির করে। বেশিরভাগ মাটিয়ালের পরনে লুঙ্গি। লুঙ্গি কাছা মেরে, মাজায় গামছা বেঁধেছে আইট (আঁট) করে। শীত আসার আগে আগেই গ্রামের হাট বাজারে পুরানা শীতের কাপড় ওঠে সস্তায়। মোটা সোয়েটার, হাতাঅলা মোটা গেঞ্জি, উলের কোট, মাফলার টুপি। পায়ের মোজা তো পাওয়া যায়ই, শীত একদম সহ্য করতে না পারা মানুষদের জন্য হাতমোজাও পাওয়া যায়। কানটুপি পরেন মান্নান মাওলানা। মাত্র গজিয়েছে এমন নরম, গাঢ় খয়েরি রঙের গাবপাতা রঙের একখান কানটুপি আজ পরে আছেন মান্নান মাওলানা।
মাটিয়ালরা কাছামারা লুঙ্গির উপর কেউ কেউ পরেছে সোয়েটার আর নইলে মোটা হাতাআলা গেঞ্জি। দুইজনে কোটও পরছে। নীচের দিক খালি, উপর দিক কাপড় চোপড়ে ঢাকা। গলায় মাফলারও আছে দুই-তিনজনের। অল্পবয়েসি চার-পাঁচজন আছে, তারা পরেছে প্যান্ট। সাহেবদের ফেলে দেওয়া শীতের কাপড়চোপড় যা এদেশে আসে, ঢাকার সদরঘাটে ওরকম পুরানো কাপড়ের বিরাট মার্কেট। সেই মার্কেট থেকে সাপ্লাই দেয় সারা দেশে। দেশগ্রামের হাটবাজার থেকে গরিব মানুষরা শীত নিরাময়ের জন্য কিনে। মোতালেবের কয়েকজন মাটিয়াল ওরকম ফুলপ্যান্ট হাফপ্যান্ট পরেছে। মাটিমুটি মেখে ময়লা হচ্ছে গায়ের কাপড়, কে খেয়াল করে ওইসব, শীত মানলেই হইল?
একজন মাটিয়াল আবার এমন একটা প্যান্ট পরেছে সেটা না ফুলপ্যান্ট না হাফপ্যান্ট। মাজা থেকে হাঁটুর নীচ তরি নামছে। মাজায় পায়জামার মোটা ফিতার মতন ফিতা দিয়া গিঠটু দিয়া রাখছে। উপরে কালো সোয়েটার। কয়েকজন মাটিয়াল কোদালের কোপে কোপে নরম মাটি কেটে গোড়ায় ভরছে, ভরে তুলে দিচ্ছে অন্য মাটিয়ালের মাথায়। তারা সার ধরে উঠছে মসজিদ বাড়িতে। মোতালেব আর মান্নান মাওলানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কোনদিকে ফেলবে মাটি। কোনদিক ভরাট করে তারপর ফেলবে কোনদিক।
দুধের পুরো সরের মতন পড়ে আছে কুয়াশা। বেলা কিছুটা হয়েছে তবু সূর্যের দেখা নাই। ফজরের নামাজ শেষ করেই মসজিদ বাড়িতে চলে আসছেন মান্নান মাওলানা। তাঁর পরনে কানটুপি, গলায় প্যাচানো সবুজ মাফলার। আজ আর লুঙ্গি পরেন নাই তিনি। সাদা পায়জামা পরেছেন। পায়ে মোটা উলের মোজা আর কালো পুরানা পামশু। খয়েরি ফ্লানেলের পাঞ্জাবির তলায় প্রথমে আছে ফুলহাতা একটা গেঞ্জি। গেঞ্জির ওপর হাফহাতা সোয়েটার তার ওপর পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপর ঘিয়া রঙের আলোয়ান। মান্নান মাওলানার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, শীতের বাবার সাধ্য নাই এই জিনিসকে কাবু করে।
মোতালেবের অবস্থাও প্রায় মান্নান মাওলানার মতনই। সে পরেছে খাকি রঙের ফুলপ্যান্ট। পায়ে সস্তা ধরনের কালো কেডস, মোটা মোজা। হলুদ রঙের ফুলহাতা শার্টের তলায় গেঞ্জি আছে। শার্টের উপরে আছে হাফহাতা সোয়েটার তার উপর কালো একখান কোট। গলায় মাফলার আর মাথায় বান্দরটুপি (মাঙ্কিক্যাপ)। এই টুপিটা বহুদিন ধরে ঘরে পড়ে আছে। এইবার ব্যবহারের একটা সুযোগ পেয়েছে মোতালেব।
