ফুলমতি আবার উদাস হল আর আরতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ফুলমতি তারপর বিষণ্ণ গলায় বলল, আমার জীবনডা এমতেই যাইবো এই বাড়িতে। এই বাড়ির বাইরে আমার আর কোনও জীবন নাই। দিন যাইবো, মা-বাপে মরবো। ভাইরা বিয়া কইরা বউ আনবো বাড়িতে। তাগো গঞ্জনা শুনুম। তিন ভাইয়ের পোলাপান হইবো, তাগো পোলাপান লালন পালন করুম। পোলাপানের গু-মুতের কথা কাপড় ধুমু। রাইন্দা বাইড়া খাওয়ামু বাড়ির মানুষরে। পূজা পার্বণে ভাইরা একজোড়া থান দিবো, ওই থান পইরা বচ্ছর যাইবো। বচ্ছরের পর বচ্ছর যাইবো। মাঝ বয়স, বুড়া বয়সে এই বাড়ির পুরানা দালানের মতন ঝুরঝুর কইরা শরিল থিকা খইসা যাইবো সইনদর্য। চামড়া কুঁচকাইবো, চুল পাকবো, দাঁত পড়বো। অসুক বিসুকে ধরবো। কেউ আমার মিহি ফিরাও চাইবো না। তারবাদে একদিন চিতায় উডুম। বাড়ির মাইনষে হাঁপ ছাইড়া বাঁচবো। যা, একটা ভেজাল আছিল সংসারে, হেইডা গেছে।
ফুলমতি আরতির দিকে তাকাল। আরতি রে, দিদি, এই হইল আমার জীবন। রাইত্রে শুইয়া শুইয়া ভগবানরে আমি কই, ভগবান, আমার জীবন তুমি এমুন করলা ক্যান? আমি কী পাপ করছিলাম ভগবান? সুন্দর মাইয়া হিসাবে দুনিয়ায় পাডাইলা তারবাদে জীবনডা কইরা দিলা অসুন্দর। আলোর জীবন কইরা দিলা আন্ধার। ক্যান ভগবান, ক্যান! আবার যুদি কোনওদিন এই জগতে আমারে তুমি পাডাও তয় আর মাইয়া মাইনষের জীবন দিয়ো না ভগবান। পুরুষের জীবন দিয়ো। পুরুষের জীবন হইলে এইরকম খাঁচার জীবন আমার হইতো না। বউ মরলে আবার বিয়া করতাম, নতুন কইরা সংসার শুরু করতাম। আর সংসার না করলে যেই মিহি দুইচক্ষু যায় হেই মিহি চইলা যাইতাম। কেঐ তো আর আমারে আটকাইয়া রাখতে পারতো না। পুরুষপোলার জীবন পাখির জীবন, স্বাধীন জীবন। মাইয়া মাইনষের জীবন জেলখানার জীবন। এমুন এক জেলখানা, মরণ ছাড়া হেই জেলখানা থিকা ছাড়া পাওয়া যায় না। আমগো মতন গরিব হিন্দুবাড়ির বিধবা মাইয়ারা অইলো যাবজ্জীবনের আসামি। তাগো জীবন কাডে এমুন এক জেলখানায় যেই জেলখানার মোটা মোটা লোহার গারদ (গরাদ) বাইরে থিকা দেহা যায় না। ওই গারদ ভাইঙ্গা বাইর অওন যায় না। মরণ, খালি মরণই পারে ওই গারদ ভাঙতে। এর লেইগা বহুত বিধবা হিন্দু মাইয়া আত্মহত্যা করে। জেলখানার জীবন সইজ্য করতে পারে না।
একটু থেমে আরতির চোখের দিকে তাকিয়ে ফুলমতি বলল, আমি আশিববাদ করি, ভগবান তরে য্যান সুখী করে আরতি। জামাই লইয়া, সংসার লইয়া তুই য্যান তর জামাইর আগে হইলোক ত্যাগ করতে পারছ। বিধবার জীবন য্যান কোনওদিনও তর না হয়।
কথা বলতে বলতে গলা ধরে এল ফুলমতির। চোখ ছলছল করে উঠল।
এত সুখ আনন্দের মধ্যেও ফুলমতির জন্য আজ এত কষ্ট হল আরতির। হঠাৎ করে শিশুর মতন দুইহাতে ফুলমতিকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগল সে।
.
পৌষমাসের পয়লা তারিখেই মসজিদের কাজ শুরু হল।
এনামুল যেভাবে যা বলেছিল সেইভাবেই কাজে নামল মোতালেব আর মান্নান মাওলানা। ছাড়াবাড়ির পশ্চিমদিককার গাড় (ডোবা) কেটে মাটি তুলতে লাগল একুশজন মাটিয়াল। হজরতদের বাড়ি ছাড়িয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মাটি ফেলার কাজ বাকি ছিল মাওয়া ফেরিঘাট তরি। আলী আমজাদ যে কাজ শেষ করতে না পেরে কেস খেয়েছে, কেস খেয়ে পলাতক, সেই কাজও চলছে ধুমছে। মাটির কাজ এবার আর সাবকন্টাক দেন নাই আসলাম কন্ট্রাক্টর। নিজের একজন ম্যানেজার আর শ-তিনেক মাটিয়াল, মাটিয়ালদের ছয়জন সর্দার, অর্থাৎ প্রতি পঞ্চাশজনে একজন সর্দার দিয়া কাজ শুরু করে দিয়েছেন। দিনরাত চব্বিশঘণ্টা কাজ চলছে। এক-দেড়মাসের মধ্যে মাওয়া ফেরিঘাট তরি মাটি ফেলার কাজ শেষ হবে। তারপর ইট বিছানোর কাজ, তারপর কার্পেটিং। হয়ে গেল ঢাকা-মাওয়া সড়ক, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মূলকাজ। পদ্মার ওপার থেকে কাজ করছে অন্য কন্ট্রাক্টর। সেই কাজও চলছে একই কায়দায়। দিনরাত।
আসলাম কন্ট্রাক্টরের মাটিয়ালদের ওখান থেকে একুশজনকে ভাগিয়েছে মোতালেব। সড়কের কাজে রোজ যা পায় তার থেকে দশটাকা করে বেশি দিয়া একুশজন জোগাড় করেছে। বুদ্ধিটা এনামুলেরই। কয়েকদিন আগে বাড়িতে আসছিল সে। পৌষমাসের পয়লা তারিখে কাজ শুরু করবে। মোতালেব বলল, সবঐ ঠিক আছে মামু, তয় মাইট্টাল তো পাই না। দেশের বেবাক মাইট্টাল সড়কের কামে লাইগ্যা গেছে।
এনামুল গম্ভীর গলায় বলল, আমগো কাম তো কোনও কামই না। গড় কাইট্টা চাইর পাঁচদিন মাডি উড়াইলে ছাড়াবাড়ির ভাঙ্গন ভইরা যাইবো। মাইট্টালও বেশি লাগবো না। বিশ-পঁচিশজন অইলেই অয়। নাকি?
হ তার বেশি লাগবো না।
মান্নান মাওলানা ছিলেন লগে। বললেন, মজজিদের আসল জাগা তো ঠিক আছে। ছাড়াবাড়ির যেই জাগা তুমি মজজিদের লেইগা দেহাই দিছো ওই জাগায় তো মাডি হালান লাগবো না। ওই জাগায় গদমদ (গর্তটত) কইরা ঢালাই গাঁথনির কাজ হইবো।
হ আমার ইঞ্জিনিয়ার শামিম আইসা দেহাই দিবো। মজজিদের নকশা মকশা তো রেডিঐ। শামিম আইয়া কাদির মিস্তিরিরে বেবাক বুঝাইয়া দিবো। তারবাদে আর কোনও ঝামেলাঐ নাই। জাহিদ খাঁ-র বাড়ির ওই তরি টেরাক আইবো। পয়লাদিন আইবো বাঁশ কাঠ টিন, পানি রাখনের ডেরাম এইসব। তারবাদে আইবো ইট রড সিমিট। মিস্তিরিগো থাকনের লেইগা লাম্বা টেমপরালি একখান ঘর উঠান লাগবো। আমার দিক থিকা বেবাক রেডি। অহন কইতাছেন মাইট্টাল পাওয়া যাইতাছে না।
