সত্যঐ। দেহিচ।
আমি তারে খাইতে দিলে তো।
না দিয়া মনে অয় পারবি না। তর বয়স অইছে না। তুইও চাবি।
ফুলমতির চোখের দিকে তাকাল আরতি। আপনে চাইছিলেন?
ফুলমতি একটু থতমত খেল। তারপর উদাস হল। আমার তো তহন চাওনের বয়স হয় নাই। মাত্র এগারো বছর বয়স আছিল আমার। ওই বয়সে এই হগল বোঝেনি মাইয়ারা?
আইজ কাইলকার মাইয়ারা বোজে।
আমি বুঝি নাই রে দিদি। একদম কিছু বুঝি নাই।
বাসররাইত্রে জামাইবাবু আপনের লগে কিছু করে নাই?
না।
কন কী?
হ। আমি এগারো বচ্ছর বয়সের মাইয়া। এই এতডু। বিয়ার শাড়ি গয়না পইরা পুঁটলি অইয়া গেছিলাম। তার উপরে বিয়ার ধকল। বাসরঘরে জামাইর লেইগা বইয়া থাকতে থাকতে কুনসুম ঘুমাইয়া গেছি, উদিসঐ পাই নাই। চকু মেইলা দেহি বিয়ান অইয়া গেছে। আমার পাশে ধুতি পানজাবি পইরা ঘুমাইতাছে আমার জামাই। মুখটা আমার মিহি, আমার মুখটাও তার মিহি। আমি গুটলি পাকাইয়া (কুকুর কুণ্ডলী) তার বুকের সামনে শুইয়া রইছি।
সে তোমারে রাইত্রে আদর ওদর করছে কি না উদিস পাও নাই?
না। শইল্লে হাত দিলে উদিস পাইতাম। তয় তরে একখান কথা কই, এতদিন আগের কথা তাও আমার কইলাম বেবাক মনে আছে। সে খুব ভাল মানুষ আছিল, ভদ্ৰ আছিল। আমগো জাতের পোলা। সাহা। সাহারা তো হয় কারবারি। কায়কারবার করে। তাগো বাড়ির মাইনষেও করতো। তয় সে আছিল লেখাপড়া জানা মানুষ। মেট্রিক পাশ। ইছাপুরা গেরামে বাড়ি। ইছাপুরা স্কুলে মাস্টারি করত। নাম আছিল অমল সাহা। নামের মতনই পবিত্ৰ আছিল সে, সুন্দর আছিল। কী সুন্দর কইরা কথা কইতো, কী সুন্দর কইরা হাসতো। গলায় মধুমাখা আছিল। ওই বয়সেই, কিছুই বুজতাম না আমি, তয় তারে খুব ভাল লাগতো আমার। আমি ঘুইরা ঘুইরা তারে দেখতাম। সে যহন স্কুলে থাকতো, আমার ভাল্লাগতো না। আমি তার লেইগা ছটফট করতাম। বিকালে সে বাড়িতে আসলে আমার মন ভাল অইয়া যাইতো।
ফুলমতি আরতির দিকে তাকাল। আইজকাইল তো ধর্মের বিধান সহাজে কেঐ মানতে চায় না। আগের দিনের মাইনষে মানতো। বাসর রাইত্রে বা বিয়ার রাইত্রে তো বউর শরিলে হাত দিতোই না জামাইরা। পরের রাইত তো কালরাইত। সূর্য অস্ত যাওনের পর থিকাই দুইজন দুইদিকে। জামাই দেখতে পারবো না বউর মুখ, বউ দেখতে পারবো না জামাইর। মুখ। দুইজন দুইঘরে। তৃতীয় রাইত হইতাছে ফুলশয্যা। আদর সোহাগের রাইত, প্রেম ভালবাসার রাইত। আমার বর বেবাক নিয়ম কানুন মাইনা চলছিল। লোভীলোক আছিল না, ভাল লোক আছিল।
আবার উদাস হল ফুলমতি। ফেলে আসা সেই জীবনের কথা একের পর এক মনে পড়ল তার। মানুষটার ছবি এতদিনেও ম্লান হয়নি চোখে। এখনও চোখের ভিতর রয়ে গেছে তার হাসিমাখা মুখখানি। শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে সেই মুখ দেখতে লাগল সে।
আরতি বলল, আপনের কথা শুইনা আমার আইজ বহুত ভাল লাগল দিদি। আমি আইজকাইলকার মাইয়াগো লাহান করুম না। জামাইরে কমু, আমি ধর্মের বিধান মাইন্না চলুম। বাসর রাইত মানুম, বেহুলার মতন। কালরাইত মানুম। তারবাদে ফুলশয্যা। পূজাআর্চা করুম, শাখে ফুঁ দিমু, ধূপ দিমু বাড়িতে। গোবর দিয়া উঠান লেপুম, তুলসীতলাটা লেইপ্পা পুইচ্ছা ঠিক রাখুম। জামাইবাড়িতে জবা ফুলের গাছ লাগামু, বেলি গন্ধরাজ গেন্দা, সব পূজার ফুল রাখুম। আমি আমার জামাইরে লইয়া সুন্দর একখান জীবন কাটামু। গরিব সংসারও সুখের করুম।
ফুলমতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমিও তাই চাইছিলাম রে আরতি। ওই বয়সেই জামাই, দেওর ননদ শ্বশুর শাশুড়ি বেবাকতেরে লইয়া ধীরে ধীরে সুন্দর একখান জীবন তৈরি করতে চাইছিলাম। ভগবান আমার কপালে সুখ দিল না। মাত্র সাতমাস, তহনও আমার বারো বচ্ছর পুরা অয় নাই, বিধবা অইয়া গেলাম। ব্লাড়ি অইয়া গেলাম। কপালের সিন্দুর মুইচ্ছা গেল আমার। সাদা থান ফিনদা বাপের বাড়িতে ফিরত আইলাম।
আরতি দুঃখী গলায় বলল, ওই রকম তরতাজা মানুষটা কেমনে মরলো দিদি?
আর কইছ না। কপাল, কপালের দোষ। স্কুল থিকা ফিরছে। বাইষ্যাকাল। শাওনমাস। এমুন বিষ্টি নামছে। বিয়ালেই আন্ধার হইয়া গেছে চাইরদিক। রান্ধনঘরে আমার হরি রানতে বইছে। গোয়ালঘরের একপাশে আরেকখান খোলা ঘর। উপরে টিনের চাল, চাইরমিহি খোলা। লাকড়ি খড়ি রাখে ওই ঘরে, ঘহি (ঘঁটে) রাখে। সে বাড়িতে আসতে আসতে বিষ্টিতে ভিজ্জা চুইঙ্গা গেছে। আমার হরি কইলো, বাবা অমল, ভিজছস যহন, তহন একহান। কাম কর। বিষ্টির হ্যাঁচলায় (ছাটে) ওই ঘরের লাকড়ি খড়ি ভিজতাছে। লাকড়ি খড়িডি ইট্টু ঘরডার মাঝখানে আইন্না রাখ, ঘহি আছে গোড়ায়। গোড়াড়ি সরাইয়া রাখ। সে গেছে ওই কাম করতে। লাকড়ি খড়ির ভিতরে বিষ্টি দেইক্কা যে একখান কালজাইত অইয়া হাইন্দা রইছে, কে জানে! হেই সাপে তারে দংশাইলো। ডাইন হাতের রগের মইদ্যে দিছে ঠোকর। হেয় একখান চিইইর দিয়া উডানে পড়ল। বিষ্টির মইদ্যেই বাড়ির বেবাকতে দৌড়াইয়া নামলো উডানে। হেয় তহন চিত অইয়া পইড়া রইছে উডানে, মুখ দিয়া ছেবড়ি (ফেনা)। উঠতাছে। ওঝামোঝ ডাকনের আগেঐ শ্যাষ। শাওনমাসের বিষ্টিতে ধুইয়া গেল আমার কপালের সিন্দুর, জীবনের বেবাক স্বপ্ন!
একটু থামল ফুলমতি। আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষজন মন্দ আছিল না। তারা চাইছিল আমি ওই বাইত্তেঐ থাইক্কা যাই। আমি থাকি নাই খালি একজন মাইনষের লেইগা। আমার শাশুড়ি। সে আমারে ভালই জানতো। বিয়ার সাতমাসের মাথায় পোলা মরল সাপের কামড়ে, হেয় তারপর থিকা আমারে দেখতে পারতো না। উঠতে বসতে খালি কথা হুনাইতো। পোড়াকপালি মাগি, ভাতারখাগি মাগি। অপায়া। সাত মাসও আমার পোলাডারে বাঁচতে দিলি না। সাপে তো আমার পোলারে খায় না, খাইছে ওই মাগি। পোলা মরণে তার মাথাডা বিগড়াইয়া গেছিল। এর লেইগা ওই বাইত্তে আমি আর থাকি নাই। বেবাক হুইন্না মা-বাপে আমারে লইয়াইলো। তারবাদে তাগো লগে আমার আর কোনও সম্পর্ক নাই। ওই বাড়ির কেউ কোনওদিন আমার খোঁজখবর লইতে আহে নাই। আমগো এই দিককার কেউও আর কোনওদিন যায় না। মানুষটা মরল, বেবাক কিছু শেষ অইয়া গেল!
