বাপ মা আর ছোট দুইভাই এই চারজন মানুষের একটা দল, আরেক দলে ফুলমতি আর নিখিল, এই চলছে রামদাসের সংসারে।
আজ সকালের দিকে বাজারে গিয়েছিল রামদাস। পানের চাঙ্গারি নিয়াই গেছে। পান বেচা ভালই হয়েছে। বিড়া হিসাবে তো আর খোলাবাজারে পান বিক্রি হয় না, হয় গন্ডা হিসাবে। সেই হিসাবে বিক্রি মন্দ না। ওদিকে দুই ভাই সেন্টু-মিন্টু খালে পেনিজাল দিয়া, আর দোয়াইর তো দিন রাতই পাতা থাকে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় তুলে ইচা বাইল্লাও পেয়েছে ভালই। সেইগুলি নিয়া দুপুরের ভাত খেয়ে সেন্টু চলে গেছে বাজারে, মিন্টু রামদাসকে নিয়া জুতি টেটা আর কোষানাও নিয়া গেছে চকের দিকে খাজার মাছ মারতে। নিখিল সকালের নাস্তা করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আর ফিরেই নাই। আতাহারদের লগে আছে। ল্যাংড়া বসির আতাহারের বিয়ার ঘটকালি নিয়া উইঠাপইড়া লাগছে। মোতাহারের বউ পারুল গেছে বাপের বাড়ি। এই ফাঁকে আতাহারের বিয়ার ব্যবস্থা করতে চাইছেন মান্নান মাওলানা।
নিখিলের মুখে সব শোনে ফুলমতি। ওই বাড়ির সব ঘটনা নিখিল তাকে বলে। মোতাহারের বউ পারুর লগে কী সমন্ধ আতাহারের, কী বিত্তান্ত সবই জানে ফুলমতি। পারুর লগেই বিয়া হওয়ার কথা ছিল আতাহারের। অর্থাৎ বড়ভাইয়ের বিধবার লগে। দেওর-ভাবির সম্পর্ক ম্যালা দিনের। এখন লোভে পড়ে অন্যত্র বিয়া করছে আতাহার। ভাবি নাঐর গেছে বাপের বাড়ি আর এই ফাঁকে…। ছি, মানুষ এত বেইমান হয়! নিজের মনের মানুষের লগে বেইমানি!
আজ দুপুরের পর থেকে এরকম নানান পদের ভাবনা ফুলমতির মনে। ভাঙা দরদালানে। নিজেদের কামরার চৌকিতে কাত হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে মা। বাতের ব্যথায় কাতর হয়ে আছে। কয়দিন ধরে। এই অবস্থায়ও শুইলেই ঘুমায়া পড়ে। বাড়ির ছয়জন মানুষের চারজনঐ বাইরে। দুইজন বাড়িতে, তার একজন ঘুমে। ফুলমতি এখন একদম একা। মা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ছপ বিছিয়ে দরদালানের বারান্দায় বসে ছিল। দেওয়াল ফুটা করে ওঠা বট অশথের চারাগুলি দিন দিন বড় হচ্ছে। ঘর শালিক আর জালালি কবুতর বাসা বানছে কার্নিশের দিককার খুপরিতে। কবুতরগুলির বাকবাকুম এই দুপুরবেলাও কিছুক্ষণ ছিল। এখন নাই। শালিক পাখিগুলি কিচির মিচির করে সন্ধ্যার দিকে। তাদেরও শব্দ নাই এখন। সবকিছু চুপচাপ। আথালে একজোড়া গাইগোরু আর একটা বকনা বাছুর। মুখের সামনে কচুরির বোঝা সকালবেলাই দিয়া রাখছে সেন্টু না মিন্টু, নাকি রামদাস নিজে। বর্ষাকালে সারাদিন ওই খেয়ে কাটায় গোরুগুলি।
বারান্দা থেকে উঠে তুলসী মঞ্চটার সামনে একটু দাঁড়িয়ে ছিল ফুলমতি। তারপর আথালের দিকে একবার তাকিয়ে, গোরুগুলি দেখে পুব-দক্ষিণ দিককার পালানের মুখে আমগাছটার তলায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনকার মতন আজও তার পরনে সাদা থান। কিশোরী বয়সে বিয়া হয়েছিল। সাত মাস স্বামীর সংসার করেছে, তারপর থেকেই বিধবার জীবন। বিয়ার সময় যতটা সুন্দরী ছিল, বিধবা হওয়ার পর সেই সৌন্দর্য যেন দিন দিন। বাড়ল মেয়েটির। যত দিন গেল, এই বহুকালের পুরানা ধসে পড়া দরদালান আর ঘুপচি অন্ধকার মতন বাড়িটায়, ফুলমতি যখন ঘর থেকে বের হয়, বাড়িটা যেন আলোকিত হয়ে যায়। অন্ধকার রাতে যেন ভরে যায় ফুটফুটা জ্যোৎস্নায়।
আজ এই মন খারাপ করা, বিষণ্ণ মেয়েটির আলোয় সত্যি সত্যি যেন আলোকিত হয়ে আছে পালানের দিকটা। আমগাছের ছায়াময় পরিবেশ যেন ফকফক করছে।
এসময় এল আরতি।
বয়স হয়ে যাচ্ছে, বিয়া হচ্ছিল না, ভারী একটা মনোকষ্টে ছিল মেয়েটি। গরিব নাপিত ঘরের মেয়ে। দেখতেও ভাল না। লম্বা একহারা গড়ন। কালোকোলো গায়ের রং। বেশ রোগা। সীতারামপুরের কারিগরদের বোনা সস্তা শাড়ি পরে থাকে। যুবতী মেয়ে, তবু বুক বোঝা যায় না। চেহারা ভাঙতে শুরু করেছিল। নিজের দিকে ফিরাও তাকাত না আরতি। বিয়ার কথাবার্তা পাকা হওয়ার পর কাঁচা হলুদ বাটা মাখতে শুরু করেছে স্নানের আগে। মাথায় তেলপানি দিচ্ছে। মুখ ফরসা করার ক্রিম কিনে এনেছে মাওয়ার বাজার থেকে। ওসব ব্যবহার করে চেহারা ফিরাবার চেষ্টা করছে। রাতে বোধহয় ঘুমও আজকাল ভাল হচ্ছে। শরীর চেহারা একটু বদলেছে আরতির। মুখে সারাক্ষণই যেন আনন্দমাখা। চলাফেরা হয়ে গেছে পাখির মতন। চঞ্চল, ছটফটা। আজ দেখা গেল নখ পালিশ লাগিয়েছে লাল রঙের। চোখে কাজল, জোড়া বেণি করেছে। কপালে টিপ। দাঁতগুলিও যেন অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশি সাদা। ফুলমতির সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমারে কেমুন লাগতাছে দিদি?
ফুলমতি আরতির দিকে তাকাল। বিষণ্ণমুখ উজ্জ্বল করে হাসল। ভাল লাগতাছে। সোন্দর।
জামাই আমারে পছন্দ করবো না?
করবো না মানি, অবশ্যই করবো। তরে তো আগেঐ পছন্দ করছে। নাইলে বিয়া করতে রাজি অইতোনি?
হেইডা তো ঠিক আছে। তয় দিন দিন আমি যে সোন্দর অওনের চেষ্টা করতাছি, যেদিন তারা আমারে দেইক্কা গেছে, অহন যে হেদিনকার থিকা বেশি সোন্দর আমি, আগনমাসে বিয়া অইবো, ততোদিনে যে আরও সোন্দর অইয়া যামু, বাসররাইত্রে জামাই আমারে দেইক্কা পাগল অইয়া যাইবো না?
ফুলমতি আবার হাসল। হ যাইবো। একদম পাগল অইয়া যাইবো।
তারপর দুষ্টুমি করে বলল, পয়লা রাইত্রেঐ তরে খাইয়া হালাইবো।
আরতি লজ্জা পেল। যা।
