শানকির চলাচলও রাজকীয়। ধীর স্থির। দিন দুপুরে বাড়ির উঠান পালানে চলে আসে কখনও, কখনও ঘরের খামের লগে প্যাঁচ দিয়া থাকে, গাছপালা ঝোপঝাড়ের ছায়ায় বিড়া বেন্ধে থাকে। মানুষজনের সামনে দিয়েই হয়তো মন্থর গতিতে চলতে শুরু করল। বাচবে কী মরবে তোয়াক্কা করল না। শানকি সাপ ভুলেও কোনও গিরস্তে কখনও মারবে না। তাতে দোষ (অকল্যাণ) হয়। বিষধর সাপে দংশে বিনাশ করবে চৌদ্দগোষ্ঠী। এসব জানে বলেই বোধহয় শানকির চরিত্র এমন। গৃহপালিত জীবের মতো আয়েশি ভঙ্গিতে বসবাস করে গিরস্ত বাড়িতে। যখন যেভাবে ইচ্ছা চলাচল করে।
কিন্তু শীত পড়ে গেছে এসময় তো গর্তের ওম, ছাই আর তুষ কুড়ার হাঁড়ি থেকে বের হবার কথা না শানকির! শীতকালটা সে অন্ধকার নির্জনে গভীর উষ্ণতায় কাটাবে। বের হয়ে আসবে ধরালিকালে। তারপর ছুলুম বদলে নতুন করে শুরু করবে জীবন। তাহলে এসময় কোন সাপে ধরল ব্যাঙ!
মরনি চিন্তিত হল।
সে বসে আছে পাটাতন ঘরের সামনে যে দুইখান বাড়তি তক্তা দেওয়া সেই তক্তায়। গিরস্তের আয়েশের জন্য পাটাতন ঘরের সামনে এরকম এক দুইখান তক্তা দেওয়া থাকে। সংসারকর্মের ফাঁকে কয়েক দণ্ডের জন্যে এই তক্তায় বসে বাড়ির লোক। পান তামাক খায়। বাড়িতে হঠাৎ করে কোনও অতিথি এলেও এই তক্তাতেই বসে। কিন্তু মরনি আজ বসে আছে তার মনটা ভাল নাই বলে। ঘণ্টাখানিক আগে খবর পেয়েছে ছনুবুড়ি মারা গেছে। কাঁচা রসে মুড়ি ভিজিয়ে মাত্র সকালের নাস্তা তখন শেষ করেছে। মজনু, মরনি কিছু মুখেই দেয় নাই, পাশের বাড়ির ইন্নত এসে বলল, চাচী ও চাচী হোনছনি, চুন্নিবুড়ি বলে মইরা গেছে। এমতে মরে নাই, মাইট্টাতেল খাইয়া মরছে।
বলেই খিট খিট করে হাসল। ইন্নতের সেই হাসিতে গা জ্বলে গেল মরনির। একজন মানুষ মইরা গেছে ওইটা লইয়াও ঠাট্টা! আল্লার দুনিয়াতে যে কত পদের মানুষ আছে!
এই কথাটা ইন্নতকে সে বলেনি। বলেছে অন্যকথা। তুই হুনলি কই?
ইন্নত বলল, মরনের খবর এমতেঐ ভাইসসাহে। এক বাড়ির মানুষ মরলে তাগো চিইক্কর বাইক্কঐর হুইন্না বোজে লগের বাড়ির মাইনষে। তাগো কাছ থিকা হোনে আরেক বাড়ির মাইনষে, আবার তাগো কাছ থিকা হোনে আরেক বাড়ির মাইনষে, এমতে দেহা যায় পাঁচ মিনিটের মইদ্যে পুরা গেরাম হুইন্নালাইছে।
মজনুর দিকে তাকাল ইন্নত। ঐ মউজনা, যাবিনি? ল যাই, চুন্নিবুড়িরে শেষ দেহা দেইক্কাহি।
এবার আর ইন্নতের কথা সহ্য হল না মরমির। বেশ রাগল সে। ঝাঁঝাল গলায় বলল, চুন্নি চুন্নি করতাছস ক্যা? তগো কিছু কোনওদিন চুরি করতাছে? বাইচ্চা থাকতে যাঐ থাকুক মইরা যাওনের পর মানুষ আর চোর ধাউর থাকে না।
শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ইন্নত। মাথা দুলিয়ে বলল, দামী কথা কইছো চাচী, বহুত দামী কথা কইছো।
শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে মজনু তখন ঘর থেকে বেরিয়েছে। ইন্নত বলল, ল যাই।
তারপর থেকে ঘরের সামনের তক্তপায় বসেই আছে মরনি। একটুও লড়েচড়ে নাই। শুধুই মনে হয়েছে মৃত্যুর কথা। কত মানুষজন ছিল এক সময় চারপাশে, মৃত্যু কোথায় নিয়ে গেছে তাদের মৃত্যু এমন এক নিয়তি, মানুষের সাধ্য নাই তাকে ঠেকিয়ে রাখে। কত চেষ্টা কত রকমভাবে করে মানুষ, তবু ঠেকাতে পারে না মৃত্যু।
একে একে মরনির তারপর মা বাবার কথা মনে হয়েছে, বোনদের কথা মনে। হয়েছে, শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে এই বাড়ির সেই মানুষটার কথা। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে বেঁচেছিল এক সময়, মৃত্যু কেমন করে আলাদা করে দিয়েছে তাদের! ছনুবুড়ির মৃত্যুর কথা শুনে আজ সকালে সেই মানুষটার কথা তারপর থেকে মনে পড়ছে মরনির। কত সুখ দুঃখের স্মৃতি, কত আনন্দ বেদনার স্মৃতি রয়ে গেছে সেই মানুষ ঘিরে। যেন মরনির মন একখান কচি কলাপাতা, সেই কলাপাতায় ইরল চিরল দাগে লেখা ছিল প্রিয়তম সেই মানুষের কত কথা, বহু শীত বসন্তের হাওয়া দূর দূরান্ত থেকে বয়ে এনে সেই কলাপাতার ওপর ফেলে গেছে ধুলার ধূসর আস্তরণ, নিজে কিছুই টের পায়নি মরনি, স্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সেই মানুষ। আজ অন্য এক মৃত্যু সংবাদ এল, যেন অনেকদিন পরে চারদিক থেকে ঝেপে এল বৃষ্টি। বৃষ্টি ধারায় কচি কলাপাতা ধুলামুক্ত হল, জেগে উঠল স্মৃতিলেখা। মরনি মগ্ন হয়েছিল সেই লেখায়। তখনই এক সময় রান্নাচালার পিছন দিককার গয়াগাছের কাছে ওই চি চি শব্দ। মগ্নতা ভেঙে গেল। মরনির। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তক্তা থেকে নামল। দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল রান্নাচালার পিছনে, গয়াগাছ তলায়।
কই গাছতলায় তো কিছু নাই! সাদা মাটির গাছতলা খা খা করতাছে।
দিশাহারা ভঙ্গিতে মরনি তারপর গাছটার দিকে তাকিয়েছে, তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। গয়ার ডালে একটা দাঁড়কাক বসে আছে। দুইপায়ে খামছে ধরা একটা কুকরার ছাও (ছানা)। বড়সড় ছাও। দুইচারটা ঠোকর ছাওটাকে দিয়েছে দাঁড়কাক, তবে সুবিধা করতে পারছে না। ছাওটা তার ছোট্ট ডানা, মাথা ও পা দাপড়িয়ে চি চি ডাকে দিশাহারা করে তুলেছে দাঁড়কাকটাকে। কাকটা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। জোর ঠোকরে ছাওটাকে কাবু করতে যেন সাহস পাচ্ছে না।
কয়েক পলক এই দৃশ্য দেখে বুক তোলপাড় করে উঠল মরনির। নিশ্চয় মা ভাই বোনদের লগে গিরস্তর উঠান পাথালে চড়তে বেরিয়েছিল ছাওটা। গাছের ডালে আততায়ী দাঁড়কাক ছিল ঘাপটি মেরে, সুযোগ বুঝে ছো মেরে তুলে এনেছে। চোখের পলকে চিরকালের তরে আলাদা করে দিয়েছে আপনজনদের থেকে। এও তো এক রকমের মৃত্যু। দাঁড়কাক নিয়েছে আজরাইলের ভূমিকা।
