দবির বলল, ভাল মানুষগো আল্লায় তাড়াতাড়ি দুনিয়া থিকা উড়াইয়া নেয়। বাঁচাইয়া রাখে শয়তানডিরে। আল্লাখোদার নাম লইয়া, ধর্মের নাম লইয়া একটা ভণ্ড মাওলানা যে মেদিনমণ্ডল গেরামডারে ছারখার করতাছে আল্লায় অরে ক্যান বাঁচাইয়া রাখছে? অরে ক্যান কোনও অসুক বিসুক দেয় না?
মরনি বলল, আল্লার মাইর, দুনিয়ার বাইর। শয়তান বদমাইশগো আল্লায় এমুন শাস্তি দিবো, মানুষ ওইডা চিন্তাও করতে পারবো না। মান্নান মাওলানার কপালে যে কী আছে ওইডা আল্লাপাক ছাড়া আর কেঐ জানে না। হেয় যেই গুনা করছে মাকুন্দার মতন একজন মাইনষের লগে, ছনুবুড়ির জানাজা পড়ন লইয়া, অরে আল্লায় ছাড়বো না। অর কপালে বিরাট শনি আছে। তারবাদে অহন লাগছে নূরজাহানের লাহান নাতিনের থিকাও কম বয়সি মাইয়াডার পিছে। তয় আল্লার রহমত যে এনামুল সাবে ঘটনা মিটমাট কইরা দিছে।
হ বুজি। এইডা অইছে তোমার লেইগাঐ। আমি তো দিশা না পাইয়া তোমার কাছে আইছিলাম। তুমি কইলা দেলরা বুজির কাছে যাইতে। গেলাম। তারবাদে তো ঘটনা মিটলো। আমার নূরজাহানরে দুইবার তুমি বাঁচাইলা।
মরনি মুখের স্নিগ্ধ একটা ভঙ্গি করল। আমি তো বাঁচাই নাই, বাঁচাইছে আল্লায়।
দবির লগে লগে বলল, হ বিপদে পড়া মানুষরে আসলে আল্লায়ঐ বাঁচায়। তয় একখান উছিলা লাগে। উছিলা আছিলা তুমি।
তয় রমিজ ঘটক পোলার খোঁজখবর পাইলো?
অহনতরি পায় নাই। দেকতাছে। ঘটকাগো কারবার তো তুমি বোজেঐ বইন। ঘটকারা হাতে পোলা পাইলেও ঘুরায়, মাইয়া পাইলেও ঘুরায়।
হ যতদিন ঘুরাইবো ততোদিনঐ টেকা খাইতে পারবো। আইজ পঞ্চাশ টেকা, কাইল একশো টেকা। পোলা পাইয়াও কয়, পোলা পাই নাই। দেখতাছি। দেন একশো টেকা দেন অমুক গেরামে পোলা দেকতে যামু।
একদোম ঠিক কথা কইছো বইন। রমিজ ঘটকারে ধরছি মাসেকহানি অইয়াইলো। এর মইদ্যে ছয়-সাতশো টেকা দিয়া দিছি। দেহা অইলেই টেকা চায়।
তা তো চাইবোঐ। আর আপনেরও দেওন লাগবো। মাইয়া যত তাড়াতাড়ি অহন বিদায়। করতে পারেন ততো সুবিদা।
হ। এনামুল সাবে কইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভাব বিয়া দিয়া দেও মাইয়ার।
কথা ভালঐ কইছে। বিয়া দিয়া দিলে আপনে এক্কেরে জানে বাঁইচ্চা যান। গোলামের পোয় যেমতে লাগছে ছেমড়ির পিছে, বিয়া না দিলে ওই শুয়োরের পোর হাত থিকা মাইয়া রক্ষা করা কঠিন অইয়া যাইবো।
হ। এর লেইগাঐ আমি টেকা পয়সার মিহি চাইতাছি না। আমার অবস্তা তো তুমি জানোঐ বুজি। কয়টেকা রুজি করি, কয় টেকা জমাইতে পারি। তাও মাইয়ার লেইগা যেডু জমাইছি হেডু খরচা করতাছি। যত তাড়াতাড়ি সমভাব, ইট্টু পছন্দ মতন পোলা পাইলেঐ বিয়া দিয়া হালামু মাইয়ার।
মরনি চিন্তিত গলায় বলল, হেইডা তো দিবেন, তয় আইজ কাইলকার পোলাগো তো চাহিদা অনেক। এইডা দেও জামাইরে, ওইডা দেও।
হ জিনিসপত্র তো চায়ঐ, ঘড়ি আংটি গলার চেন কাপড় চোপড় তো দিতে হইবোই, কোনও কোনও পোলায় মটরসাইকেল চায়, নগদ টেকা চায়। রাস্তা অইয়া যাইতাছে, দেশ গেরামে বিজলি আইয়া পড়বো। দেহা গেল টেলিভিশনও চাইতাছে পোলায়।
দবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আল্লাই জানে কী আছে মাইয়াডার বরাতে। দেহা গেল পোলা ভালঐ পাইলাম, তয় বিরাট ফর্দ দিল। এইডা এইডা চাই। তহন কী করুম কিছু বুজতাছি না।
মরনি আশ্বস্ত করল দবিরকে। আরে না, নূরজাহান দেকতে শোনতে ভাল। অর লেইগা এত কিছু লাগবে না। দেকবেন যেই পোলায় অরে দেখবো হেয়ঐ অরে পছন্দ করবে। আপনে এত চিন্তা কইরেন না গাছিদাদা। আল্লার উপরে ভরসা রাইখেন। আল্লায়ঐ পার করবো অরে।
যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে মরনি তারপর জিজ্ঞাসা করল, ও গাছিদাদা, গোলামের পোয় যে অরে বিয়া করতে চাইছিল এই কথা কি ও হোনছে?
হ বইন হোনছে। তোমার ভাবিছাবে অরে কইছে। সব মিটমাট অইয়া যাওনের পর আমি কইছি নূরজাহানের মা’রে, তারবাদে হেয় কইছে নূরজাহানরে।
হুইন্না মাইয়ায় কী কয়?
মাইয়াডা এমুন ডরান ডরাইছে, অর মায় হেদিন খিচুড়ি রানতে দিছিলো অরে, খিচড়ি আইন্না (লবণ কম হওয়া) কইরা হালাইলো।
ডরানের তো কথাঐ দাদা। এমুন একটা বেডায় যুদি অতড়ু একটা মাইয়ারে বিয়া করতে চায়, যেই বেডায় আবার অর উপরে ভিতরে ভিতরে চেতা, গোলামের পোয় তো অর উপরে শোদ লওনের লেইগা অরে বিয়া করতে চাইছে। আপনেরে জাগা সম্পত্তি দিতে চাইছে। পুরাডা অইলো অর হেই জিদ। অর জিদ যায় নাই। রইয়া গেছে। বিয়া কইরা নূরজাহানের উপরে ও জিদ মিটাইবো, এইডা নূরজাহানও বুজছে। এর লেইগাঐ বেশি ডরাইছে মাইয়ায়।
তয় অহন আর ডর ভয়ের কিছু নাই। ও জানে আমরা অর বিয়ার চেষ্টা করতাছি।
দবির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল দুপুরের ভাত খেয়ে। কোষানাও বাইয়া খাইগোবাড়ি গেছে, সেই বাড়ি থেকে আসছে হালদারবাড়ি। তারপর এতক্ষণ ধরে কথা বলছে মরনির লগে, এর মধ্যে অনেকবার মাথার ভিতর চাগা দিয়া উঠেছে তামাকের নেশা। একবার ভেবেছে রহমান হালদারের সীমানায় গিয়া একটু তামাক খেয়ে আসে। কথার তালে তালে আর যাওয়া হয় নাই। কোন ফাঁকে যেন বিকাল হয়ে গেছে।
না এখন আর তামাক খাওয়া যাবে না। এখন বাড়ির পথ ধরতে হবে। তবে মনের ভিতরে যে কথাটা জোয়াইরা পুঁটি মাছের মতন থেকে থেকে লাফ দিচ্ছে সেই কথাটা কি কোনও না কোনও কায়দায় একটু তুলে দেখবে দবির! মরনি বুজি কী বলে একটু শুনবে!
