মরনির বড়ঘরের সামনের তক্তায় বসতে বসতে দবির বলল, খাইগোবাড়ি গেছিলাম। তয় মনডা বহুত খারাপ বুজি। বহুত খারাপ।
মরনি চমকাল। আবার কী অইলো? নূরজাহানের ভেজাল তো সাইরা হালাইছেন। এনামুল সাবে বলে সব মিটমাট কইরা দিছে।
না না, নূরজাহানের লেইগা মন খারাপ না বুজি। মনডা খারাপ খাইগোবাড়ির হুজুরের লেইগা।
মরনি ছিল রান্নাচালার দিকে। কথা শুনে দবিরের কাছে এগিয়ে এল। কী অইছে হুজুরের? গলার আওজ একদোম বন্দ হইয়া গেছিলো। চাইরদিন আগে তারে ঢাকায় লইয়া গেছে। গলায় বলে বিরাট অসুক। তার আগেও ঢাকায় গেছিলেন হুজুরে। মাসুদ খান সাব বড় বড় ডাক্তার দেখাইছে। বহুত রকমের পরীক্ষা করাইছে গলার। ডাক্তাররা অমুইদ মষইদ দিছিল। কাম অয় নাই। পাঁচদিন আগে গলা দিয়া আর আওজ বাইর অয় না দেইক্কা আপেল মেম্বররা হুজুররে ঢাকায় লইয়া গেছে।
তয় অহন মজজিদের ইমাম কে?
নতুন একজন ইমাম আইছে। তার লগে চিন পরিচয় অইলো। তয় হেয় ওই হুজুরের লাহান না। কথাবার্তি কম কয়।
আপনে হুজুরের কাছে গেছিলেন ক্যা?
নূরজাহানের বিয়াশাদির চেষ্টা করতাছি। ঘটক ধরছি রমিজরে। হুজুরের কাছে গেছিলাম কইতে। হুজুরে যুদি দোয়া করে তয় আমার মাইয়াডার তাড়াতাড়ি বিয়া অইয়া যাইবো। গিয়া দেখি সোনামিয়া বইয়া রইছে ঘাটলায়। মনডা বহুত খারাপ। হুজুরের কথা জিগানের পর এই হগল কথা কইলো। কথা কইতে কইতে চোক্কের পানি ছাইড়া দিল (কেঁদে ফেলা অর্থে)। যেই মানুষ তার মধুমাখা গলা দিয়া জিন্দেগির কোরান হাদিসের কথা কইছে, আয়জান দিছে, ইমামতি করছে সেই মানুষটার গলায় এমুন অসুক দিল আল্লায়? গলার আওজ বন্দ অইয়া গেল? আহা রে! আহা!
মরনি এসে দবিরের পাশে বসল। হুইন্না আমারঐত্তো কান্দন আইতাছে। তার মতন ভাল মানুষ আমি জিন্দেগিতে কমঐ দেকছি। মজনু পয়লা মাসের বেতনের টেকা আইন্না আমার হাতে দেওনের পর আমি মজজিদে গিয়া পাঁচটা টেকা দিছিলাম হুজুরের হাতে। হুজুর সেই টেকাটা পয়লা হাতে লইলেন, দোয়া করলেন আমার পোলারে। তারবাদে টেকাড়া ফিরত দিলেন।
দবির অবাক। ফিরত দিলেন?
হ।
ক্যা?
কইলেন এই টেকাডা আপনে মা এমুন কোনও গরিব মানুষরে দেন, এই পাঁচ টেকায় য্যান তার বহুত উপকার অয়।
তারবাদে তুমি কারে দিলা?
আমি দিলাম নিখিলাগো বাড়ির ওইমিহি থাকে এক হিন্দু বুড়িরে।
কও কী? হিন্দু বুড়িরে?
হ। বুড়িডার দুইন্নাইতে কেঐ নাই। লাবি ঠাইরেনের বাড়ির ভাঙ্গা দালানডায় পইড়া থাকে। হিন্দুপাড়ার বাইরে ভিক্কা করতে যায় না। মোসলমান গিরস্তবাড়ির মাইনষে ভিক্কাও দেয় না বুড়িরে।
তুমি কি হুজুররে এই বেডির কথা কইছিলা?
হ।
কী কইলা?
কইলাম এমুন এক বেড়িরে আমি চিনি হুজুর, তার থিকা গরিব আর কষ্টে থাকইন্না মানুষ মনে অয় মেদিনমোল গেরামে আর নাই। তয় বেডি হুজুর হিন্দু। শুইনা হুজুরে কইলো, আল্লাহপাকের তৈরি সেরা জীব হইল মানুষ। একজন মানুষ পয়লা মানুষ তারবাদে হইল মোসলমান আর নাইলে হিন্দু, খিরিসটান আর কত জাইত ধর্ম আছে। তয় মা আপনে এই। টেকা পাঁচটা ওই মহিলারেঐ দেন। তার কাম হইবো। আল্লাহপাকও খুশি হইবেন যে তাঁর তৈরি একজন মানুষরে আরেকজন মানুষ উপকার করতাছে। আর আপনেরে আমি কী কমু। গাছিদাদা, টেকা পাঁচটা পাইয়া বুড়ি যে কী খুশি অইলো! জিন্দেগিতে এমুন খুশি অইতে আমি কম মানুষরেঐ দেকছি। কত রকমভাবে যে আমার পোলাডারে, আমার মজনুরে সে দোয়া করল। হিন্দুরা তো দোয়া কয় না, কয় আশিববাদ। খালি কপালে টেকাডা ছোঁয়ায় আর আমার পোলাডারে আশিববাদ করে।
দবির আনন্দের একটা শ্বাস ফেলল। এই হইল হুজুরের লাহান হুজুর। পয়লা মানুষ। বিচার করে তারপর জাইত ধর্ম বিচার করে। তার জাগায় যদি ওই শালার পো শালায় অইতো, ওই মন্নাইন্না, তয় টেকাডা পয়লাঐ নিজের পকেটে হান্দাইতো।
মরনি বলল, তয় হুজুরের কথাডা হুইন্না মনডায় কষ্ট পাইলাম গাছিদাদা।
হ বুজি পাওনেরঐ কথা। আমি তোমারে কইলাম না, আমার মনডা বহুত খারাপ অইছে। হুজুরের লগে এই জিন্দেগিতে মনে অয় না আর কোনওদিন দেহা অইবো।
ক্যা? অসুক ভাল অইলে হেয় ফিরত আইবো না?
দবির মরনির মুখের দিকে তাকাল। এই অসুক কি ভাল অইবো?
কী অসুক যে ভাল অইবো না?
সোনামিয়া পুরাপুরি খোলসা কইরা কইলো না। তয় তার কথায় মনে অইলো ভাল অওনের মতন অসুক না। আমিও হেইডা বুজলাম।
কেমতে?
যুদি ভাল অওনের মতন অসুক অইতো তয় খাইগোরা এত তাড়াতাড়ি নতুন ইমাম আনাইতো না তাগো মজজিদের লেইগা। হুজুররে এক-দুইমাস চিকিচ্ছা করাইতো। ঢাকায় হাসপাতালে রাকতো আর হেই ফাঁকে সোনামিয়ারে দিয়াঐ টেমপরালি (টেমপোরারি) ইমামতি করাইতো। সোনামিয়ারে তো হুজুরে সবই হিগাইছে। নতুন ইমাম দেইক্কাঐ আমার মনডায় কামড় দিছে। ওই হুজুরে আর মনে অয় ফিরবো না।
মরনি চিন্তিত গলায় বলল, কী এমুন অসুক অইলো, গলা বন্দ অইয়া গেল হুজুরের? অহন আপনে কইতাছেন আর ফিরতও আইবো না।
সোনামিয়ার কথায় আমার সন্দ অইছে বুজি।
কী সন্দ অইছে?
হুজুরের গলায় মনে অয় ক্যান্সার ধরা পড়ছে।
হায় হায় কয় কী!
হ আমার মনে অইলো।
মরনির মুখটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। উদাস চোখে গয়াগাছটার ওদিক দিয়া আকাশের দিকে তাকাল সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এমুন একজন মানুষরে আল্লায় এমুন অসুক দিল। আহা রে, আহা।
