যে পাথরটির উপর দাঁড়াইয়া ইব্রাহিম (আঃ) কাবা শরীফের নির্মাণ কাজ করিয়াছিলেন সেই পাথরটি অলৌকিক উপায়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। এখনও ঐ পাথরটি কাবা শরীফের সন্নিকটে সুরক্ষিত আছে। এই পাথরের উপর ইব্রাহিম (আঃ) এর পদচিহ্নের রেখাপাত আছে। এই পাথরকেই মক্কামে ইব্রাহিম’ বলা হয়।
সুরা বাকারার ১২৫ আয়াতে আল্লাহ্পাক বলিয়াছেন, আর স্মরণ করো সেই সময়কে যখন আমি (কাবা) ঘরকে মানুষের মিলনক্ষেত্র ও আশ্রয়স্থল করিয়াছিলাম।’ (আর আমি বলিয়াছিলাম) “তোমরা ইব্রাহিমের দাঁড়াইবার জায়গাকেই নামাজের জায়গারূপে গ্রহণ করিও’। আর যখন আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করি যে, তোমরা আমার ঘরকে পবিত্র রাখিবে তাহাদের জন্য যাহারা ইহা প্রদক্ষিণ করিবে, এখানে বসিয়া এতেকাফ করিবে এবং এখানে রুকু ও সিজদা করিবে।
এতেকাফ কাকে বলে জানেন বাবারা?
সোনা মিয়া এবং আজিজ দুইজনেই মাথা নাড়ল। না হুজুর।
সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিছুকালের জন্য ধ্যান করাকে এতেকাফ বলে। অনেকে রমজান মাসের শেষ দশদিন মসজিদে অবস্থান করে এতেকাফ করেন।
তারপর মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম ইসমাইল (আঃ) ও তার মাতা হাজেরা (রাঃ) কে যখন মক্কার মরুভূমিতে রাখিয়া গিয়াছিলেন তখন ইসমাইল (আঃ) এর বয়স ছিল দুইবছর।
কথা বলতে বলতে গলা আরো ভেঙে আসছে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের। একটু থামলেন তিনি, গ্লাস থেকে এক টোক গরম পানি খেলেন। সোনা মিয়া কাতর চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে না, চোখ দিয়াই যেন অনুনয় করছে, আর না হুজুর, আর কথা কইয়েন না। আপনের গলার দশা খারাপ। ডাক্তাররা আপনেরে কথা কইতে একদোম না করছে। গলায় আওজ করতেই না করছে। কইছে ইশারায় কথা কইতে।
সোনা মিয়ার দিকে একবার তাকালেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। আগের মতোই স্নিগ্ধ মুখে হাসলেন। আপনি চিন্তিত হবেন না বাবা। এমন এক মহামানবের কথা আমি বলছি, আল্লাহপাক যাকে নিজের দোস্ত বলেছেন। যাকে ইসলামের জনক বলতেও অসুবিধা নেই। তাঁর কাছ থেকে অনেক অনেক পেয়েছে মুসলমান জাতি।
আজিজ গাওয়ালের দিকে তাকালেন তিনি। আপনাকে বলি বাবা, এতক্ষণকার কথার মধ্যে হজরত ইসমাইল আলাইহেওয়াসাল্লামের প্রথম স্ত্রীর সম্পর্কে ওই যে হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লামের কথা, দরওয়াজের চৌকাঠ বদলে নেওয়া, অর্থাৎ ওই স্ত্রীকে তালাক দিয়ে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা। ইসমাইল আলাইহেওয়াসাল্লাম তাই করার পর তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে এসে তার কথা শুনে বলে গেলেন, দরওয়াজার চৌকাঠ বহাল রাখতে। অর্থাৎ এই স্ত্রীকে নিয়েই যেন সংসার করেন ইসমাইল আলাইহেওয়াসাল্লাম। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমাদের বুঝাতে হবে কোন নারী সংসারের জন্য শুভ, কোন নারী শুভ নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বুঝতেই পারি না, আমাদের কী করণীয়। তবে কোনও কোনও স্ত্রীর ব্যাপারে, আমরা অকারণে বেশি কাতর হই, তাদেরকে মাথার উপর তুলে ফেলি, আবার অনেক ক্ষেত্রে অকারণে নির্দোষ সুশীল স্ত্রীর উপর অত্যাচার চালাই, তাকে কষ্ট দিই, অবিচার করি তার উপর। বিনা দোষে তাকে তালাক দিই।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব খুক খুক করে একটু কাশলেন। একটোক গরম পানি খেলেন।
সোনা মিয়া বলল, পানি কি গরম আছে হুজুর, নাকি গরম কইরা আনুম?
না বাবা, আছে। কুসুম কুসুম গরম আছে। এইরকম গরম পানিই খেতে বলেছেন। ডাক্তার সাহেবরা।
আজিজ গাওয়াল স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তাকে বললেন, আপনাকে দেখলে আর আপনার কথা ভাবলে আমার খুব ভাল লাগে বাবা। এই সোনামিয়া বাবাকে দেখলে আমার খুব ভাল লাগে। ধীরে ধীরে আমার কাছে এলেন সোনামিয়া বাবা, আমার সঙ্গে মিশে দিনে দিনে নিজেকে বদলে ফেললেন। আপনিও এলেন একদিন, এসে আপনার সংসারের কথা, মায়ের কথা, মৃত মেয়েটির কথা বললেন, তারপর নিজে একটা পথ বের করে, সংসার থেকে কিছুদিন দূরে থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফিরে এলেন। স্ত্রীকে নিজের মতো তৈরি করে নিলেন, ছেলেমেয়েদেরকে নিজের চিন্তায় সুপথে নেওয়ার পথ তৈরি করলেন। এখন আপনার জীবন একজন প্রকৃত মুসলমানের জীবন। আপনার সংসার প্রকৃত মুসলমানের সংসার। আপনার কথা ভাবলেই আমার ভাল লাগে বাবা।
আজিজ বিনয়ী গলায় বলল, আপনে আমারে দোয়া করবেন হুজুর। আমি য্যান জীবনটা এইভাবে কাটাইয়া যাইতে পারি। পোলাপানগুলিরে য্যান মানুষের মতন মানুষ বানাইয়া যাইতে পারি। আল্লায় য্যান আমার জীবনের বেবাক গুনাখাতা মাপ কইরা দেয়।
নিশ্চয় দোয়া করবো বাবা, নিশ্চয় করব। আল্লাহপাক আপনার মনের আশা পূরণ করবেন।
সোনামিয়ার দিকে তাকালেন তিনি। সোনামিয়া বাবা, আমার গলা তো আর কাজ করে না। আছরের আজানটা দিন বাবা। ওয়াক্ত হয়ে গেছে।
বাইরে তখন পুরাপুরি বিকাল। রোদের রং বদলাতে শুরু করেছে। আকাশ যেন আরও বেশি স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। হাওয়া তিরতির করে বইছে। গাছের ডালে ডালে ডাকছে পাখিরা।
সোনামিয়া আজান দেওয়ার জন্য বেরিয়ে গেল। আজিজ গাওয়াল তখনও বসে আছে। আছরের নমাজ পড়ে তারপর নৌকায় চড়বে। বাড়ির পথ ধরবে।
.
কই থিকা আইলেন গাছিদাদা।
