ইসমাইলের বিবাহ ও তাঁহার মাতার মৃত্যুর পর একদা ইব্রাহিম (আঃ) তাঁহার পরিজনদের পরিদর্শনে সেখানে তশরীফ আনিলেন। ইসমাইল (আঃ) তখন বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রীর নিকট ইব্রাহিম (আঃ) ইসমাইলের সংবাদ জিজ্ঞাসা করিলেন। স্ত্রী বলিলেন, “তিনি শিকার করে আহার্যের ব্যবস্থায় কোথাও গিয়েছেন।” অতঃপর ইব্রাহিম (আঃ) পুত্রবধূকে তাহাদের জীবনযাপনের অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলেন। পুত্রবধূ বলিলেন, “আমরা অতিশয় দুরবস্থা, দারিদ্র্য ও কষ্টে আছি।” পুত্রবধূ শ্বশুর ইব্রাহিম (আঃ) কে চিনেন নাই। ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “তোমার স্বামী বাড়ি এলে আমার সালাম জানিও আর বোলো, সে যেন তার ঘরের দরওয়াজার চৌকাঠ বদলে নেয়।” এই বলে হজরত ইব্রাহিম (আঃ) চলিয়া গেলেন।
ইসমাইল (আঃ) বাড়িতে উপস্থিত হইলে, তিনি তাঁহার পিতার আগমনের আভাস অনুভব করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাড়িতে কোনো মেহমান এসেছিলেন কি?” স্ত্রী বলিলেন, হ্যাঁ, আকৃতি প্রকৃতির বর্ণনা করিয়া বলিলেন, এমন আকৃতির এক বৃদ্ধ এসেছিলেন; তিনি এসে আপনার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি সে সম্পর্কে উত্তর দিয়েছি। আর আমাদের সাংসারিক অবস্থা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি বলেছি, আমরা অত্যন্ত কষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যে আছি।” ইসমাইল (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোনো আদেশ করে গিয়েছেন কি?” স্ত্রী বলিলেন, “হ্যাঁ, আপনাকে সালাম জানাবার আদেশ করে গিয়েছেন আর আপনাকে আপনার ঘরের চৌকাঠ বদলাতে আদেশ করে গিয়েছেন।” এই শুনিয়া ইসমাইল (আঃ) বলিলেন, “সেই বৃদ্ধ আমার পিতা; তিনি এই কথার দ্বারা আমাকে তোমায় পৃথক করে দেওয়ার আদেশ করে গিয়েছেন, অতএব তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও।” এই বলিয়া। ইসমাইল (আঃ) স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ গোত্রেরই অপর একটি মেয়েকে বিবাহ করিলেন।
কিছুদিন অতিবাহিত হইলে ইব্রাহিম (আঃ) পুনরায় আসিলেন। সেই দিনও ইসমাইল (আঃ) বাড়ি ছিলেন না। তাঁহার স্ত্রীকে ইব্রাহিম (আঃ) ইসমাইল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন; স্ত্রী জানাইল, “তিনি আহার্যের সন্ধানে বাইরে গিয়েছেন।” তাহাদের সাংসারিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে পুত্রবধূ বলিলেন, “আমরা ভাল ও স্বচ্ছলতায় আছি।” এই বলিয়া আল্লাহর প্রশংসা করিলেন। পুত্রবধূ তাঁহাকে পানাহারের জন্যও বিশেষ অনুরোধ করিলেন। ইব্রাহিম (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমাদের প্রধান খাদ্যদ্রব্য কী?” পুত্রবধূ বলিলেন, “গোশত।” পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে বলিলেন, “পানি।” ইব্রাহিম (আঃ) দোয়া করিলেন, “আয় আল্লাহ্! ওদের জন্য গোশত ও পানিতে বরকত দান কর।”
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইয়ে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “ঐ সময় ওখানে শস্য ফসল ছিল না, নতুবা সে সম্পর্কেও ইব্রাহিম (আঃ) দোয়া করিতেন। ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লামের এই দোয়ার ফলেই শুধু গোশত ও পানির দ্বারা মক্কা অঞ্চলে মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক থাকিতে পারে, অন্য কোনো স্থানে শুধু এই দুই বস্তুর দ্বারা মানুষের স্বাস্থ্য টিকিতে পারে না। ইব্রাহিম (আঃ) তখন এই দোয়াও করিয়াছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাদের খাদ্য ও পানীয়ের বরকত দান কর।” নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, মক্কা শরীফে খাদ্যের ও পানীয়ের বরকত ইব্রাহিম আল্লাইহেওয়াসাল্লামের দোয়ার বরকতেই।”
ইব্রাহিম (আঃ) পুত্রবধূর সঙ্গে আলাপের পর বলিলেন, “তোমার স্বামী বাড়ি এলে আমার সালাম বলো আর বলো যে, নিজের ঘরের চৌকাঠ যেন বহাল রাখে।
ইসমাইল (আঃ) বাড়ি আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমাদের কাছে কেউ এসেছিলেন কি?” স্ত্রী বললেন, “হ্যাঁ, এক নূরানি চেহারার বৃদ্ধ এসেছিলেন, তিনি আপনার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন; আমি যথাযথ উত্তর দিয়েছি। সাংসারিক অবস্থা জিজ্ঞেস করলে আমি বলেছি, আমরা সুখে শান্তিতেই আছি।” ইসমাইল (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোনো আদেশ করে গিয়েছেন কি?” স্ত্রী বললেন, “হ্যাঁ, আপনার নিকট সালাম বলেছেন আর আদেশ করেছেন আপনি যেন নিজ ঘরের চৌকাঠ বহাল রাখেন।” ইসমাইল (আঃ) বলিলেন, “তিনি আমার পিতা, তোমাকে স্ত্রীরূপে বহাল রাখবার আদেশ করেছেন।”
কিছুদিন পর ইব্রাহিম (আঃ) আবার আসিলেন। এইবার ইসমাইল (আঃ) য়ের সাক্ষাৎ পাইলেন; তিনি জমজম কূপের নিকটে বৃক্ষের নীচে বসে তির বানাচ্ছিলেন। ইসমাইল (আঃ) ইব্রাহিম (আঃ) কে দেখামাত্র উঠিয়া দাঁড়াইলেন আর পিতাপুত্রের মধ্যে যে ব্যবহারের আদান প্রদান হয় পরস্পর তাহাই করিলেন। অতঃপর ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “হে ইসমাইল! আল্লাহ্ আমাকে একটি আদেশ করেছেন।” ইসমাইল (আঃ) বলিলেন, “আপনার প্রভুর আদেশ বাস্তবায়িত করুন।” ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “আল্লাহ্ আদেশ করেছেন, তুমি আমার সাহায্য করবে; তুমি আমার সাহায্য করবে কি?” ইসমাইল (আঃ) বলিলেন, “আমি নিশ্চয় আপনার সাহায্য করব।” ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “আল্লাহ্ আমাকে আদেশ করেছেন, এই উঁচু ভিটাটিকে ঘিরে এক ঘর তৈরি করতে।”
ঐ সময়েই দুইজনে বাইতুলাহ্ শরীফের ঘর প্রস্তুত করিতে লেগে গেলেন। ইসমাইল (আঃ) পাথর আনিয়া দিতেন আর ইব্রাহিম (আঃ) গাঁথুনি করিতেন। দেওয়াল যখন উঁচু হইয়া গেল তখন ইসমাইল (আঃ) একটি বড়ো পাথর আনিলেন; ইব্রাহিম (আঃ) তার উপর দাঁড়াইয়া নির্মাণ কাজ করিতে লাগিলেন আর ইসমাইল (আঃ) তাঁহাকে গাঁথুনির পাথর। আনিয়া দিতে লাগিলেন। তাহারা উভয়েই চতুর্দিকে ঘুরে ঘর নির্মাণ করিয়াছিলেন আর এই দোয়া করিয়াছিলেন, “হে আমার প্রভু! আমাদের এই আমলটুকু কবুল করে গ্রহণ করে নিন। আপনি সবকিছু শোনেন আর প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সবকিছু জানেন।”
