বিবি হাজেরা (রাঃ) হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এর পিছন থেকে নিজের জায়গায় চলিয়া আসিলেন। মোশকের পানি তিনি নিজে পান করিতেন আর শিশুকে তাঁহার বুকের দুধ পান করাইতেন। কিছুদিনের মধ্যেই পানি ফুরাইয়া গেল; তখন নিজেও ভীষণভাবে তৃষ্ণার্ত হইলেন আর শুষ্কতার কারণে বুকের দুগ্ধ না থাকাতে শিশুও পিপাসায় কাতর হইয়া পড়িলেন; এমনকী চোখের সামনে শিশুপুত্র পিপাসায় ছটফট করিতে লাগিল। তখন হাজেরা (রাঃ)। চোখের সামনে শিশুপুত্রের এই করুণ অবস্থা সহ্য করিতে না পারিয়া সেখান থেকে উঠিয়া গেলেন; নিকটতম ‘ছাফা” পর্বতের উপরে উঠিয়া এদিক ওদিক তাকাইতে লাগিলেন, যদি কারও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো কিছুরই খোঁজ ছিল না। সুতরাং তিনি দ্রুত ছাফা পর্বত হইতে নামিয়া তারই সম্মুখস্থ ‘মারওয়া পর্বতের দিকে অগ্রসর হইলেন। ছাফা পাহাড় থেকে নামিয়া সম্মুখের অপেক্ষাকৃত নিচু জায়গা অতিক্রম করিতে তিনি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া দৌড়াইয়া চলিলেন। তারপর মারওয়া পাহাড়ের উপর উঠিয়া চারদিকে তাকাইলেন, কিন্তু কোনও কিছুরই খোঁজ পাইলেন না। এইভাবে বিচলিত হয়ে তিনি ওই পাহাড় দুইটির মধ্যেই দৌড়াদৌড়ি করিতে লাগিলেন, এমনকী বারংবার একটি থেকে অপরটিতে যাওয়ার সংখ্যা সাতবার হইল।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসাল্লাম উক্ত ঘটনার প্রতি ইশারা করিয়া বলিয়াছেন, বিবি হাজেরা (রাঃ) কর্তৃক উক্ত পাহাড়দ্বয়ে আসা যাওয়া করার স্মরণেই আজও হজ্জসমাপণকারীগণ হজ্জের একটি বিশেষ অঙ্গ হিসাবে এই পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে বিভিন্ন দোয়া ও জিকির করিতে করিতে সাতবার সা’য়ী বা আসা যাওয়া করেন।
বিবি হাজেরা (রাঃ) সপ্তমবার ‘মারওয়া পাহাড়ে উঠিবার পর শিশুপুত্রের অবস্থা দেখিবার জন্য শিশুর কাছে ফিরিয়া যাইবার ইচ্ছা করিলে হঠাৎ একটি শব্দ শুনিলেন। তিনি সম্পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে ঐ শব্দের প্রতি ধ্যান দিলেন আর পুনরায় শব্দ শুনিলেন। এইবার তিনি। বলিলেন, “তোমার আওয়াজ তো শুনিয়েছ; সাহায্য করার কোনো ব্যবস্থা তোমার কাছে থাকলে সাহায্য করো।” তখন তিনি বর্তমান জমজম কূপের জায়গায় একজন ফেরেশতা দেখিলেন; তিনি জিব্রাইল (আঃ)। ওই ফেরেশতা তাঁহার পায়ের গোড়ালির আঘাতে সেখানে গর্ত করিলেন, তা থেকে পানি উঠিতে লাগিল। বিবি হাজেরা (রাঃ) আচম্বিত হইলেন আর মাটি দিয়া চতুর্দিকে বাঁধ সৃষ্টি করিয়া হাউজের মতো বানাইলেন; অতঃপর অঞ্জলি ভরিয়া মোশকে পানি ভরিতে লাগিলেন।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, উক্ত বিষয় উলেখ করিয়া নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসল্লাম বললেন, ইসমাইলের মাতাকে আল্লাহ্ রহম করুন! তিনি পানির চতুর্দিকে বাঁধ না দিলে জমজমের ঐ পানি কূপ না হয়ে প্রবহমান ঝরনায় পরিণত হইত।
বিবি হাজেরা (রাঃ) এই পানি পান করিয়া দিন কাটাইতে লাগিলেন; তার বক্ষেও দুধের সঞ্চার হইল; শিশুকে পর্যাপ্ত দুধ পান করাইতে লাগিলেন। জিব্রাইল (আঃ) তাহাকে এই সান্ত্বনাও দিয়াছিলেন যে, আপনি আশঙ্কা করিবেন না যে, এই পানি নিঃশেষ হইয়া আপনি আবার বিপদের সম্মুখীন হইবেন। জানিয়া রাখুন, এখানেই আল্লাহর ঘরের স্থান নির্দিষ্ট আছে এবং এই শিশু তাঁহার পিতার সঙ্গে সেই ঘর পুনর্নির্মাণ করিবেন। এই ঘরের নির্মাতাগণকে আল্লাহতায়ালা ধ্বংস করিবেন, তা হতে পারে না। ঐ সময় সেখানে আল্লাহর ঘরের নিদর্শন শুধুমাত্র তার ভিটে জমিনের উপর উঁচু টিলার মতো ছিল, তাও পাহাড়ি বন্যার স্রোতে ভাঙ্গিয়া যাইতেছিল।
বিবি হাজেরা (রাঃ) একাকিনী এই এলাকায় বাস করিতে লাগিলেন। কিছুদিনের মধ্যে ইয়ামন দেশীয় “জুরহুম গোত্রের কিছু লোক এই এলাকা অতিক্রম করিবার সময় নিকটবর্তী জায়গায় বিশ্রাম নিল। তাহারা হঠাৎ দেখিতে পাইলো, কতকগুলি পাখি কোনো কিছুকে কেন্দ্র করিয়া উড়িতেছে। ইহা দেখিয়া তাহারা অনুমান করিতে পারিল যে, এই পিপাসার্ত জীবগুলি নিশ্চয় পানিকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরিতেছে এবং আশ্চর্য হইল, ‘আমরা তো এই এলাকায় বহুবার এসেছি; এখানে পানি দেখিনি। তখনই তাহাদের দুই-একজন লোক পাঠাইল ঐ জায়গা থেকে সংবাদ আনিবার জন্য। এই প্রেরিত লোকেরা পানির সংবাদ আনিলে তাহারা সকলে সেখানে উপস্থিত হয়ে বিবি হাজেরা (রাঃ) কে দেখিতে পাইল। ওরা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “আমরা আপনার এই স্থানে বসতি স্থাপন করতে চাই, অনুমতি দেবেন কি?” বিবি হাজেরা (রাঃ) বলিলেন, “অনুমতি দিতে পারি, কিন্তু এই কূপের উপর তোমাদের স্বত্ব হইবে না।” ওরা সম্মত হয়ে সেখানে বসবাস আরম্ভ করিল।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, বিবি হাজেরা (রাঃ) লোকের সাহচর্যের আশা করিয়াছিলেন, তিনি সেই সুযোগও পাইলেন। এই পর্যটক দলটি সেখানে বসতি স্থাপন করিল, তাহারা নিজেদের আরও লোককে সংবাদ দিয়া সেখানে আবাদ করিল; এমনি ভাবে সেখানে কয়েকটি পরিবারের বসতি হইল। এদিকে ইসমাইল (আঃ) এর বয়সও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি হইল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জ্বরহুম গোত্র থেকে তাহাদের ভাষা আরবি শিক্ষা করিলেন। ফলে তিনি জ্বরহুম গোত্রের লোকেদের প্রিয় হইয়া উঠিলেন। ইসমাইল (আঃ) বয়স্ক হইলে তাহারা নিজেদের একটি মেয়েকে তাঁহার সঙ্গে বিবাহ দিল। বিবাহের পর ইসমাইল আলাইহেওয়াসাল্লামের মাতা হাজেরা (রাঃ) ইন্তেকাল করিলেন।
