যা চলে গেছে তা আপনি আর ফিরে পাবেন না বাবা। তবে এখন যেহেতু সে আপনার অনুগত, আপনার কথামতো চলে, সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই আল্লাহপাকের বিধান মেনে চলতে হবে। আল্লাহপাক সুরা নিসা’তেই বলেছেন যদি তাহারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তাহাদের বিরুদ্ধে কোনও পথ খুঁজিবে না। এখন আপনার স্ত্রী আপনার অনুগত। সুতরাং অতীত ভেবে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন না।
মহিউদ্দিন সাহেব আরেক টোক পানি খেলেন। জীবন থেকে যা হারিয়ে যায় তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। তবে অতীত জীবনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষকে চলতে হয়। আর যদি কেউ তার অতীত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, আল্লাহপাকের কাছে তওবা করে, তবে তো আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
সোনা মিয়া আস্তে করে বলল, হুজুর, আপনের তো কথা বলা নিষেধ। ডাক্তাররা বইলা দিছেন। আপনে একদম কথা বলবেন না। একদম চুপ কইরা থাকতে হইবো। গরম পানি খাইতে হইবো। গলায় যাতে কোনও চাপ না পড়ে।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব স্নিগ্ধমুখে হাসলেন। ডাক্তাররা তো বলেছেনই। কিন্তু আমার যে বাবা আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে। এই যে জহুর এবং আছরের মাঝখানকার সময়টুকু আপনাদের সঙ্গে এই ঘরে বসে কথা বলছি, এই জীবনে এই সময় আর কখনও পাব কিনা জানি না। নসিবে আল্লাহপাক কী রেখেছেন তা তিনিই জানেন। আজিজ সাহেব যে প্রসঙ্গটা তুলেছেন, তাঁর স্ত্রীর একদার আচরণ ইত্যাদি সম্বন্ধে, সেই। প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে হজরত ইব্রাহিম আল্লাইহেওয়াসাল্লামের জীবনের কিছু কথা। তার পুত্র হজরত ইসমাইল আল্লাইহেওয়াসাল্লামের জীবনের একটি বিশেষ ঘটনার কথা। বলি বাবারা। মন যখন চাইছে বলতে, আর এ তো আল্লাহপাকেরই ইশারা। আমাকে দিয়ে তিনি বলতে চাচ্ছেন। শুনুন, এই হাদিসটা দীর্ঘ, ধৈর্য ধরে শুনবেন। বুখারী শরীফে আছে ‘আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) রসূলল্লাহ্ সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করিয়াছেন, ইব্রাহিম আল্লাইহেওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা রাদিয়াল্লাহুতায়ালা আনহার গর্ভে ইসমাইল (আঃ) জন্মগ্রহণ করিলে, মাতৃজাতির মানবীয় স্বভাবের প্রবণতায় ইব্রাহিম (আঃ) এর প্রথমা স্ত্রী সারাহ্ (রাঃ) ও বিবি হাজেরা (রাঃ) র মধ্যে গরমিলের সৃষ্টি হইল। বিবি হাজেরাই প্রথম নারী যিনি পরিচারিকা নারীদের কোমরে পরিকর বা কোমরবন্ধ বাধার রীতি অবলম্বন করেন। তিনি সাধারণ পরিচারিকাদের মতো কোমরবন্ধ বেঁধে বিবি সারাহর সেবায় আত্মনিয়োগ করিলেন, বিবি সারাহর মনের আবিলতা দূর করিবার উদ্দেশ্যে। যখন ইব্রাহিম (আঃ) বিবি সারাহর মধ্যে প্রতিক্রিয়া সংঘটিত হইল তখন ইব্রাহিম (আঃ) বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে নিয়া বাহির হইলেন। তাঁহাদের সঙ্গে একটি মোশকে পানি ছিল, তাহারা পথে তাই পান করিতেন আর শিশু ইসমাইল মাতার দুগ্ধ পান করিতেন। এইভাবে তাঁহারা মক্কানগরীর বর্তমান অবস্থান স্থানে পৌঁছাইলেন। ইব্রাহিম (আঃ) বিবি হাজেরা ও শিশু ইসমাইলকে বড়ো একটি বৃক্ষের নীচে রাখিলেন। এই এলাকায় তখন কোনও মানুষ ছিল না, পানিরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ইব্রাহিম (আঃ)। তাহাদের কাছে শুধুমাত্র একটি থলের মধ্যে কিছু খুরমা আর মোশেকের মধ্যে অল্প পরিমাণ পানি দিলেন। এই অবস্থায় শিশু ও তার মাকে সেখানে রাখিয়া ইব্রাহিম (আঃ) তাহাদের গৃহজনের দিকে রওয়ানা হইলেন। যখন ইব্রাহিম (আঃ) শিশু ও শিশুর মা’কে ছাড়িয়া চলিয়া আসিতেছিলেন তখন হাজেরা (রাঃ) তার পিছনে ছুটিলেন আর চিৎকার করিয়া বলিলেন, “হে ইব্রাহিম। আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? অথচ আমাদের এমন জায়গায় রেখে যাচ্ছেন, যেখানে কোনো মানুষ নেই, পানাহারের কোনো ব্যবস্থা নেই। বারংবার এই কথা বলিতে লাগলেন। কিন্তু হজরত ইব্রাহিম (আঃ) সেইদিকে একেবারেই তাকাইলেন না, তাঁহার দৃষ্টি ও গতি ছিল সম্মুখ দিকেই।
অবশেষে হাজেরা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কি আল্লাহর আদেশে এই ব্যবস্থা করলেন?” ইব্রাহিম (আঃ) বলিলেন, “হ্যাঁ।”
উত্তর শুনিয়া হাজেরা (রাঃ) সান্ত্বনালাভ করিলেন আর ভয়শূন্য চিত্তে বলিলেন, “তা হলে আমাদের ভয় নেই, আল্লাহ আমাদের হালাক করবেন না।”
বিবি হাজেরা (রাঃ) আরও জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “আপনি আমাদের এই জনশূন্য এলাকায় কার আশ্রয়ে রেখে যাচ্ছেন?”
ইব্রাহিম (আঃ) বলিয়াছিলেন, “আল্লাহর আশ্রয়ে।”
তাই শুনিয়া বিবি হাজেরা (রাঃ) বলিয়াছিলেন, “আল্লাহর আশ্রয়ে আমি পূর্ণ সন্তুষ্ট।” এই বলিয়া তিনি ইব্রাহিমের অনুসরণ ছাড়িয়া ফিরিয়া আসিলেন।
ইব্রাহিম (আঃ) শিশুপুত্র ও তাঁহার মা’কে ত্যাগ করিয়া পিছন দিকে না তাকাইয়া সম্মুখপানে অগ্রসর হইতেছিলেন। যখন গিরিপথের বাঁকে পৌঁছাইলেন যেখান থেকে স্ত্রী পুত্র চোখের নজরে পড়িবার সম্ভাবনা নাই, তখন কাবাগৃহের দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইলেন আর হাত উঠাইয়া দোয়া করিলেন, “হে পরওয়ারদেগার! আমি জনশূন্য মরুর বুকে আমার পরিজনের বসতি স্থাপন করে যাচ্ছি তোমার সম্মানিত ঘরের নিকটে, এই উদ্দেশ্যে যে, ওরা নামাজকে ভালভাবে আঁকড়ে থাকবে। প্রভু হে! তুমি আরও লোকের মন এই স্থানের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও যেন এখানকার জনশূন্যতা দূর হয়ে যায়। আর ফলফলাদি খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে পানাহারের ব্যবস্থা করে দাও; যাতে তোমার নেয়ামত উপভোগ করে মানুষ তোমার শোকর গুজারি করবে।”
