তারপরও আজিজকে দেখে সুন্দর করে হাসলেন। বিনয়ী গলায় আজিজের সালামের জবাব দিয়া বললেন, আসুন বাবা, আসুন। বসুন।
সোনা মিয়া আগে থেকেই বসে আছে। সে এখন পুরা দস্তুর মুসল্লি। পরনে পরিষ্কার সাদার ওপর হালকা বেগুনি ডোরা দেওয়া লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবি পায়ের গুড়মুড়া তরি, মাথায়। গোল সাদা টুপি। নাকের তলা সুন্দর করে কামানো। দাড়ি গলা তরি নেমেছে। চোখে সুরমা।
সে বসে আছে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের পায়ের কাছে। হুজুরের হাতের কাছে একখান কাঁচের জগ পিরিচ দিয়া ঢাকা, পাশে কাঁচের একটা গ্লাস। গ্লাসে কিছুটা পানি। জগ গ্লাস দুইটারই গায়ে বাষ্প জমেছে। ভিতরের পানিটা ঘোলা দেখাচ্ছে। অর্থাৎ গরম পানি।
আজিজের সালামের জবাব দিয়াই গ্লাস থেকে এক ঢোক পানি খেলেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। আজিজকে বললেন, কেমন আছেন বাবা?
আছি হুজুর আল্লার রহমতে ভাল। আপনের দোয়ায় আল্লায় খুব ভাল রাখছে।
আজিজ খেয়াল করল হুজুরের গলার আওয়াজটা আগের মতন পরিষ্কার না, একটু ভাঙা ভাঙা। বলল, হুজুরের গলাটা ভাঙছে মনে অয়! ঠান্ডা লাগছে হুজুর? অনেক সময় গরম ঠান্ডা মিলা এইরকম হয়।
মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, গলায় অসুখ হয়েছে বাবা। গলার চিকিৎসার জন্যই ঢাকায় গিয়েছিলাম। মাসুদ খান সাহেব বড় বড় ডাক্তার দেখালেন। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে।
অনেক অমুদ দিয়েছেন ডাক্তার সাহেবরা। সেই অমুদ খাচ্ছি। আর খাচ্ছি গরম পানি।
এই প্রথম সোনা মিয়াকে খেয়াল করে দেখল আজিজ। সেও কেমন মনমরা, বিষণ্ণ চোখ দুইখান একটু যেন ছলছল করছে।
আজিজ ভাবল, হয়তো ইসলাম ধর্মের এমন কোনও ঘটনার কথা এতক্ষণ সোনা মিয়াকে বলেছেন হুজুরে, শুইনা মন অন্যরকম হইছে তার। এর লেইগা চোখ ছলছল করতাছে।
আজিজের ইচ্ছা হল সে যে আশা নিয়া আজ হুজুরের কাছে আসছে সেই বিষয়ে কিছু কথা শুনবে। কিছু না ভেবে কথাটা সে তুলে ফেলল। প্রথমে খুবই কোমল গলায় মহিউদ্দিন সাহেবকে ডাকল। হুজুর।
মহিউদ্দিন সাহেব আনমনা ছিলেন। আজিজের ডাকে তার দিকে তাকালেন। বলুন বাবা।
দুই-একখান কথা আছিল।
সোনা মিয়া বলল, আইজ থাউক আজিজ। হুজুরের শইলডা ভাল না। আরেকদিন আইসা বইলো।
মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, না না বাবা। কোনও অসুবিধা নেই। আপনি এতটা দূর থেকে নৌকা বেয়ে কষ্ট করে আসছেন, কোনও অসুবিধা নেই। বলুন।
সোনা মিয়া বলল, তয় হুজুর আপনের তো বেশি কথা কওন নিষেধ। ডাক্তার সাহেবরা বইলা দিছেন।
না না তেমন কোনও অসুবিধা আমার হচ্ছে না। আপনি আমাকে নিয়ে চিন্তিত হবেন। দীন দুনিয়ার সব কিছুর মালিক আল্লাহপাক পরোয়ারদেগার। তিনি জীবন দিয়েছেন তিনি জীবন নেবেন। আর আমার জীবন আমি আল্লাহপাকের কাজে লাগাবার চেষ্টা করি। আল্লাহর সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের কাজে লাগাবার চেষ্টা করি। আজিজ সাহেব আমার কাছে আসছেন যে কথা শুনতে, জানা থাকলে অবশ্যই আমি তাকে তা বলব। আমার জীবন। যতক্ষণ আছে ততক্ষণ আল্লাহপাকের কাজ, মানুষের কাজ আমি করতে চাই বাবা। আজিজ সাহেব, আপনি বলুন বাবা কী জানতে আসছেন?
ভিতরে ভিতরে আজিজ একটু বেকায়দায় পড়ে গেল। আহা হুজুরের শরীরের এই অবস্থা জানলে সে আসত না। সোনা মিয়া তো তাকে বাজারে দেখা হওয়ার পর হুজুরের শরীরের এই অবস্থার কথা বলে নাই। এখন তো ফিরারও উপায় নাই আজিজের। কথা যখন একবার তুলে ফেলেছে, এখন তো বলতেই হবে।
মহিউদ্দিন সাহেব তাকিয়ে ছিলেন আজিজের দিকে। আজিজের দোনোমোনো ভাবটা খেয়াল করেছেন। হাসিমুখে বললেন, আপনি কোনও সংকোচ করবেন না বাবা। বলুন।
আজিজ ভাবল, না আর দোনোমোনো করনের কাম নাই। বইলাই ফালাই।
হুজুরের মুখের দিকে তাকাল সে। বলল, হুজুর, আমি ওই যে একদিন আইসা আপনেরে কইছিলাম আমার মা’র কথা। আমার ইসতিরি বানেছার লেইগা, মা’র লেইগা আমি আমার কর্তব্যকাজ কিছুই করতে পারি নাই। তয় হুজুর আমি তারে ঠিক কইরা ফালাইছি। মাস দেড়েক বাড়ির বাইরে থাইকা ফিরত আসনের পর আমার পুরা পরিবার অহন অন্যরকম। আমার ইসতিরি বানেছাও অহন একদম ঠিক।
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব একটোক গরম পানি খেলেন। তারপর বললেন, আল্লাপাক সুরা নিস’র ৩৪ আয়াতে বলেছেন, স্ত্রীদের মধ্যে যাহাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাহাদেরকে ভাল করে উপদেশ দাও, তারপর তাহাদের বিছানায় যেয়ো না ও তাহাদেরকে প্রহার করো। যদি তাহারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তাহাদের বিরুদ্ধে কোনও পথ খুঁজিবে না।’ বলুন সোবাহানআল্লাহ।
সোনা মিয়া এবং আজিজ গাওয়াল দুইজনই বিড়বিড় করে বলল, সোবাহানআল্লাহ।
এই আয়াতের শুরুতেই আল্লাহপাক বলেছেন ‘পুরুষ নারীর রক্ষাকর্তা, কারণ আল্লাহ তাহাদের এককে অপরের উপর বিশিষ্টতা দান করিয়াছেন, আর ইহা এইজন্য যে পুরুষরা তাহাদের ধন সম্পদ থেকে ব্যয় করে। তাই সাধ্বী স্ত্রীগণ অনুগতা এবং যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহর হেফাজতে তাহারা তাহার হেফাজত করে। বলুন। সোবাহানআল্লাহ।
সোনা মিয়া আর আজিজ বলল, সোবাহানআল্লাহ।
তারপর আজিজ বলল, হুজুর আমি আল্লাহপাকের কথা মতন চলতে পারি নাই। আমার ইসতিরি আমার মা’র লগে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে, তার ডরে আমিও মা’র পক্ষে। কথা কইতে পারি নাই। আমার ইসতিরি আমার অবাধ্যই আছিল। আমার কোনও কথা সে শোনে নাই, উলটা সে যা বলতো আমি সেইটা শুনতাম। আমার উচিত আছিলো তারে ভাল কইরা বুঝানো, তারপরও যুদি সে আমার কথা না শুনতে আমার উচিত আছিল যাতে সে আমার কথা শোনে সেই বেবস্তা নেওয়া। মাইর ধইর করা।
