আলফুর কথায় সব ভুলে গেল কুট্টি। আবার জড়িয়ে ধরল আলফুকে। তার বুকে মুখ ঘষতে লাগল, পিঠে হাত বুলাতে লাগল। তুমি তো আমারেও দিছো, আমার জন্মও তো। সার্থক করছো। আইজ বিয়াইন্না রাইত্রেঐ আমি হেইডা উদিস পাইছি।
কুট্টির মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে আলফু বলল, কী অইছে?
তুমি বাপ অইতাছো?
আলফু চমকাল। কুট্টিকে বুক থেকে ঠেলে সরিয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। কী?
কুট্টি লাজুক হাসল। হ। আইজ বিয়াইন্না রাইত থিকা মাথা ঘুরাইতাছে। খালি উটকি পাড়ি। একবার উকাল করছি। কিছু খাইতে ইচ্ছা করে না।
তয় তো আর উপায় নাই।
কীয়ের উপায় নাই?
দুই-চাইর দিনের মইদ্যেই বিয়া কইরা হালান লাগে। দেরি করলে তোমার বদলাম অইবো। ওইডা আমি অইতে দিমু না।
কেমতে কী করবা?
পয়লা বড়বুজানরে কমু। তারে কইয়া ঢাকা গিয়া মাজারো বুজানরে কইয়া আইয়া বিয়া কইরা হালামু। দেরি করুম না।
আলফুকে জড়িয়ে ধরে গভীর আবেগের গলায় কুট্টি বলল, আমার কিছু কওনের নাই। আমি তো আমার সবকিছু তোমারে দিয়াঐ দিছি। আমার নিজের বইলা তো কিছু আর নাই। তোমার নিজের জিনিস তুমি রাখবা না হালাইয়া দিবা তোমার ব্যাপার।
আলফু বলল, না আমি তোমারে সারাজীবন আমার এই বুকে তুইলা রাখুম।
সমেদ খাঁ-র বাড়ির লম্বা পুকুরটার উত্তরদিক দিয়া কে যেন নাও বাইয়া যাইতে যাইতে গান ধরছে তখন,
উপরতালায় কোট কাচারি
মাঝের তালায় রয় বেপারি
নীচের তালায় কর্মচারী ধ্যান করে প্রেমের মালা
ঘরখানা হয় তিনতালা!
মিয়াবাড়ির দোতলা ঘর থেকে তার কিছুক্ষণ পর বড়বুজানের গলা শোনা গেল। ও লো কুট্টি, কার লগে কথা কচ? কে আইছে বাইত্তে?
কুট্টি না, আলফু জবাব দিল। আমি আইছি বুজান। আলফু।
আলহামদুলিল্লাহ। খুব ভাল করছস বাজান। তর লেইগা বহুত পেরেশানির মইদ্যে আছিলাম আমরা। আগে ভাতপানি খা, তারবাদে কথা কমু নে।
আইচ্ছা বুজান।
আলফু কুট্টির দিকে তাকাল। হাসি আনন্দ মাখা গলায় বলল, তোমার পোলার বাপরে ভাত দেও।
কুট্টি হাসল। আমি চাই আল্লায় আমারে একখান পোলাঐ দেউক। পোলার মাজায়। কাইতানের লগে ছোট্ট একহান ঝুনঝুনি বাইন্দা দিমু। আমার পোলা বাড়ি ভইরা দৌড় পাড়বো আর মাজার ঝুনঝুনি ঝুনঝুন ঝুনঝুন করবো। পোলার নাম রাখুম আমি নয়ন।
আলফু মুগ্ধ গলায় বলল, রাইখো।
আর রাইত্রে আমার বুকে কাছে শুইয়া থাকবো আমার পোলা, পিঠের কাছে শুইয়া থাকবা তুমি। মাঝখানে আমি। তুমি আমার উপরে একটা হাত দিয়া রাখবা, আমি আমার পোলার উপরে একটা হাত দিয়া রাখুম। আমি আল্লার কাছে আর কিছু চাই না। আল্লায় য্যান আমার জীবনডা এমতেঐ কাডায়।
আলফু বলল, আল্লাপাকে অবশ্যই তোমার মনের আশা পূরণ করবো।
.
মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তার ঘরের পশ্চিম দিককার দেয়ালে হেলান দিয়া বসে আছেন। ঘরটা মসজিদের উত্তর পাশে। উত্তর পাশের জানালার বাইরে একটা আমগাছ। ঘরের পুবদিকে দরজা। এই দরজা দিয়া তাকালে বাড়ির পুকুরটা দেখা যায়। পুকুরের উপরকার গাছপালাগুলি দেখা যায়। তার উপর দিয়া দেখা যায় আকাশ।
মহিউদ্দিন সাহেব উদাস চোখে খোলা দরজা দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাইরের রোদ দেখছেন, হাওয়া অনুভব করছেন, পাখপাখালির ডাক শুনছেন।
তার ঘরে খাট চৌকি কিছু নাই। মোটা একখান জাজিমের উপর তোষক, তার উপর সাদা চাদর পাতা বিছানা। বিছানা পশ্চিমের দেওয়াল ঘেঁষে। বিছানার বাইরে ঘরের অনেকখানি জুড়ে সাদা ফরাশ পাতা। মুসল্লিরা কেউ দেখা করতে এলে ওই ফরাশে বসে।
এখন বসে আছে সোনা মিয়া আর আজিজ গাওয়াল।
আশ্বিনমাস শুরু হওয়ার লগে লগে চকমাঠ থেকে কমতে শুরু করেছে পানি। এতটাই ধীরে ধীরে কমছে, ভাল করে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। দুই-চাইরদিন পর হঠাৎ করে বর্ষার পানিতে ডোবা কোনও ঝোঁপঝাড়ের দিকে তাকালে দেখা যায় ঝোঁপের ডালপালায় পানির যে দাগ পড়েছে সেই দাগের উপরের দিকটা শুকনা, নীচের দিকটা ভিজা ভিজা। ওই ভিজা ভিজা দাগ দেখে বুঝা যায় পানি কতটা কমেছে।
তবে নৌকা বাইতে এখনও কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। নৌকার চলাচল ঠিক আছে। অসুবিধা হবে কার্তিক মাসে। চকের উঁচু আইল, টেক এইসব জেগে উঠবে। বাইতে গেলে খানে খানে ঠেকে যাবে নৌকা। তখন আবার শেষবর্ষার বৃষ্টিটাও নামবে। পাঁচ-সাতদিনের বৃষ্টি। এই বৃষ্টিকে বলে কাইত্তানি’। কার্তিক মাসের বৃষ্টি। শরতের আকাশ হয়ে উঠবে দেখার মতন। তারপর হেমন্ত, শীত। আল্লাহর কী কুদরত। সময়ে সময়ে কেমন করে বদলে দিচ্ছেন দুনিয়া। সেই বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় মানুষের জীবনধারা।
দুপুরের ভাত খেয়ে খাইগোবাড়ির দিকে নৌকা বাইয়া আসতে আসতে এসব কথা মনে হয়েছে আজ আজিজ গাওয়ালের। অনেকদিন হুজুরের লগে দেখা হয় না। তিনি গিয়েছিলেন ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে। খান সাহেবরা কেউ বড় ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কারণ হুজুরের শরীরটা ভাল না। কী অসুখ জানে না আজিজ। সোনা মিয়ার মুখে কাল বাজারে শুনেছে হুজুর ফিরেছেন। এজন্য আজ তার লগে দেখা করতে আসছে।
তবে হুজুরকে দেখে আজিজের মনটা বড় খারাপ হয়েছে। সেই নূরানি চেহারাটা আর নাই হুজুরের। কী রকম ম্লান, ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন। মুখটা ভাঙাচোরা, চোখ দুইখান অনেকটা ঢুকে গেছে গদে। শরীরও যে খুবই দুর্বল দেখেই বুঝা যায়।
