আইচ্ছা।
উত্তর সীমানা থেকে ফিরার সময় মাথা ঘোরাটা বাড়ছে কুট্টির, বুকের ভার, গলার ভিতর দলা পাকানো ভাব, উটকি আসছে। উকাল আসছে। দিশাহারা কুট্টি কী রেখে কী করবে বুঝতে পারছে না। রানঘরে এসে অনেকক্ষণ বসে রইল। তারপর ভাবলো, পশশু যুদি মতলা যায়, ফিরবো তার পরদিন। যদি আলফুরে লগে লইয়াহে তয় তো একহান চিন্তা গেল। তারবাদে কী হইবো? পেডের জিনিস সামাল কেমনে দিব কুট্টি? আলফুর কী করার আছে? সে কি বিয়া করবো কুট্টিরে?
কুট্টি ভাবল, না, আলফুকে সে কোনও চাপ দিবে না। ঘটনা তাকে বলবে তারপর সে যা সিদ্ধান্ত নেয়, তাই সই। আলফুর জন্য যত কলঙ্কিনী হতে হয় হবে কুট্টি। আলফুর কাছে। বিয়া না বইসাঐ তার বাচ্চা জন্ম দিবো। যুদি এইসব নিয়া দেশ গ্রামে ঢি ঢি পড়ে, তয় বাচ্চা কুলে লইয়া যেইমিহি দুইচক্ষু যায় চইলা যাইবো। পোলা লইয়া ভিক্কা কইরা খাইবো।
এইসব ভাবার পরও মন ভাল হল না কুট্টির। মাথা ঘুরানোটা আছে, উটকি পারা, উকাল উকাল ভাব সব কিছুর পরও সংসারের সবকাজ সারল সে। রান্দনবাড়ন, বড়বুজানের নাওন ধোওন, তার খাওনদাওন সব সেরে নিজেও খাওয়ার চেষ্টা করল। খেতে পারল না। বড় বুজানকে ঘুম পাড়ায়ে দিয়া নিজে এসে বসে রইল আলফু যে বারান্দায় শোয় সেই বারান্দার বাইরের দিককার দরজার সামনে।
শেষ দুপুরের রোদে তখন ঝিমঝিম করছে চারদিক। থেকে থেকে হাওয়া আসে বর্ষার চকমাঠ থেকে। বাঁশের ঝাড়ে শনশন শব্দ হয়। দিনেরবেলাও ঝিঁঝির ডাক শোনা যাচ্ছে। একটা কাঠঠোকরা পাখি অবিরাম ঠোঁট ঠুকছে পুব-দক্ষিণ কোনার বড় আমগাছটায়। কী একটা পাখি শিস দিচ্ছে আমরুজগাছটার ওদিকে। দুইটা শালিক লাফায় রানঘরের ওদিকটায়, একটা কাক উড়াল দিয়া এসে নামে, আবার উড়াল দিয়া চলে যায়। বড়বুজান গভীর ঘুমে। কুট্টির শরীর মন দুইটাতেই উথাল পাথাল। নিজে বুঝতে পারে নাই, কখন। গাল বেয়ে নামছে কান্না। চোখের পানিতে গাল ভাসছে, বুক ভাসছে।
এসময় খুব কাছ থেকে কে বলল, এমতে কানতাছো ক্যা গো? আমার লেইগা? কুট্টি ফ্যালফ্যাল করে মানুষটার দিকে তাকাল। চোখ মুছতে ভুলে গেল। সে যেমন ভেবেছিল ঠিক তেমন বেশ মানুষটার। নীল লুঙ্গির উপর সাদা ঝুলপকেটের শার্ট। মাজায় বান্ধা গামছা। একহাতে খয়েরি রঙের রেকসিনের পুরানা ব্যাগটা।
কুট্টির তবু বিশ্বাস হয় না। কুট্টির তবু মনে হয় সে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে। যার কথা দিনরাত চব্বিশঘণ্টা ভাবে সেই মানুষটা স্বপ্নে তার অদূরে এসে দাঁড়িয়েছে।
মানুষটা বলল, এমতে চাইয়া রইলা ক্যা? সত্যঐ আমি।
কুট্টি তারপর পাগলের মতন উঠে দাঁড়াল, পাগলের মতন একটা লাফ দিল। লাফ দিয়া মানুষটার সামনে এসে দুই হাতে তার গলা জড়ায়া ধরল। কান্না আনন্দের মিশাল দেওয়া গলায় বলল, তুমি এত দেরি করলা ক্যা? ক্যা এত দেরি করলা তুমি? আমি যে এইদিকে তোমার লেইগা মইরা যাইতাছিলাম।
হাতের ব্যাগ উঠানে নামিয়ে দুই হাতে আলফুও জড়িয়ে ধরল কুট্টিকে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে, গালে গলায় মুখ ঘষে আদর করতে করতে বলল, আমিও তোমার লেইগা। মইরা যাইতাছিলাম। একদোম মইরা যাইতাছিলাম।
তয় আহো নাই ক্যা? ক্যা আমারে ছাইড়া এতদিন রইলা?
পোলাপানের মা’রে বুজ দেওনের লেইগা। সে বড় ভেজাল করতাছিল।
গলা ছেড়ে আলফুর মুখের দিকে তাকাল কুট্টি। কী ভেজাল?
আমি তোমার কথা তারে কইয়া দিছি।
হায় হায় কও কী?
হ! কইছি আমি তোমারে বিয়া করুম। যুদি তুমি মত দেও তয় তো দিলাঐ, না দিলে তোমারে তালাক দিয়া কুট্টিরে আমি বিয়া করুম।
ক্যা এইডা কইলা তুমি? তার কী দোষ?
না তার কোনও দোষ নাই। দোষ আমার মনের। আমি তারে রাইখাই তোমারে বিয়া করতে চাইছি। কইছি তুমি আমার পোলাপানের মা। তোমগো ভরণপোষণ বেবাক আমি দিমু। বচ্ছরে একবার আইয়া তোমগো দেইক্কা যামু। আমি মানুষ ভাল দেইক্কা বেবাক কিছু খোলসা কইরা তোমারে কইলাম। না কইলে তুমি বুজতা না। আমি গোপনে কুট্টিরে বিয়া কইরা ওই বাইত্তে থাকতাম। তোমরা উদিসও পাইতা না। তয় ছলচাতুরি আমি নিজেও করি না, পছন্দও করি না। এর লেইগা তোমারে কইলাম। অহন তোমার সিদ্ধান্ত তুমি আমারে জানাও। হেয় বহুত চিল্লাচিল্লি করল, তার বাপ ভাইগো ডাকলো, বিচার সালিশ বসাইলো, হেয় হের কথা কইলো। বিয়া করলে আমার সংসার করবো না। আমি আমার কথা কইলাম। শেষমেশ মাতবররা, আমার হৌর হমুন্দি শালা ভায়রারাও আমার পক্ষ নিল। মোসলমান পুরুষপোলায় চাইরখান বিয়া করতে পারে। আলফু করলে দোষ কী? হেয় তো আর তোমাগো ছাইড়া দেয় নাই। যেহেনে কাম করে ওহেনে এক বউ থাকবো, আর তুমি চরে থাকবা পোলাপান লইয়া। এমুন ঘটনা কত ঘটে।
একটু থামল আলফু। এই হগল দরবাদরবিতে এত দিন গেল।
কুট্টি বলল, শেষতরি বড়বউ কী কইলো?
কী আর কইবো, মাইনা লইছে। অনেক কান্দাকাটি করছে। তারবাদেও মাইন্না লইছে।
এত আনন্দের মধ্যেও মন খারাপ করল কুট্টি। আমার লেইগা একজন নিরীহ মানুষরে তুমি কষ্ট দিলা?
কী করুম কও? আমার তো কোনও উপায় আছিল না। তারে তো আমি তিনডা পোলাপান দিছি, তোমারে তো কিছু দেই নাই। ওইদিক ঠিক রাইখা আমি যুদি মাতবরের চরে থাইকা যাইতাম তয় তোমার লগে বহুত বড় বেইমানি করা হইতো। ওইডা আমি করতে পারতাম না। তয় আমি তার লগে খারাপ ব্যবহার করি নাই। তারে বুঝাইয়া শুনাইয়া ঠিকঠাক কইরা আইছি। তয় তোমার লেইগা বহুত কষ্ট হইছে। একটা রাইত ঘুমাইতে পারি নাই, একটা দিন তোমারে ভুইলা থাকতে পারি নাই। আমার দেহ রইছে মাতবরের চরে, মন রইছে। বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল গেরামের মিয়াবাড়িতে, তোমার কাছে।
