লজ্জা যা পাওয়ার পেল মোতালেবের বউ। মেয়েকে এককোল থেকে আরেক কোলে এনে কোনওদিকে না তাকিয়ে, কেউ যেন দেখতে না পায় এমন ভঙ্গিতে বাড়ির নামার দিকে চলে গেল। রসের ভার কাঁধে ঠিক তখনই দবির এসে উঠছিল এই বাড়িতে। গাছিকে দেখে মায়ের কোলে বসা মেয়েটা বলল, রস খামু মা।
শুনে স্বামীর ওপরকার রাগ মেয়ের ওপর ঝাড়ল মোতালেবের বউ। তীক্ষ্ণ গলায় ধমক দিল মেয়েকে। চুপ কর চোরের ঝি। রস খাইবো!
কথাটা শুনে হা হা করে উঠল দবির। ধমকায়েন না, ধমকায়েন না। রস দেকলে পোলাপান মানুষ তো খাইতে চাইব।
তারপর মেয়েটার দিকে তাকাল সে। তুমি বাইত্তে যাও মা। আমি তোমগো বাইত্তে আইতাছি। রস খাওয়ামুনে তোমারে। অহনঐ খাওয়াইতাম, ইট্টু অসুবিধা আছে দেইক্কা খাওয়াইতে পারলাম না। তুমি যাও, আমি আইতাছি।
দবির প্রায় দৌড়ে উঠল আজিজদের বাড়িতে। উচ্ছল গলায় বলল, কো ছনুবুজি কো? ও বুজি, এই যে দেহো পয়লা দিনের রস তোমারে খাওয়াইতে লইয়াইছি। তোমারে না খাওয়াইয়া একফোডা রসও আমি বেচুম না। এই রসের লেইগা মিয়াবাড়ির বুজির কাছে তুমি আমারে চোর বানাইছিলা, হেই কথা আমি মনে রাখি নাই।
তারপরই উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের দিকে চোখ পড়ল দবির গাছির, উঠানের মাটিতে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা বানেছা, আজিজের দিকে চোখ পড়ল। দবির হতভম্ব হয়ে গেল। কী অইছে, আ, কী অইছে? বাইত্তে এত মানুষ ক্যা? ছনুবুজি কো?
দবিরের কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল তছি। মামানী তো নাই, মামানী তো মইরা গেছে। তোমার রস হেয় কেমতে খাইবো গাছিদাদা! মইরা যাওনের সমায় একফোডা পানিও খাইতে পারে নাই। পানি মনে কইরা খাইছে মাইট্টাতেল।
যে উজ্জ্বল মুখ নিয়ে এই বাড়িতে ঢুকেছিল দবির সেই মুখ ম্লান হয়ে গেল তার। গভীর দুঃখে বুকটা যেন ভেঙে গেল। নিজের অজান্তে কাঁধ থেকে রসের ভার নামাল। বিড়বিড় করে বলল, মইরা গেছে, ছনুবুজি মইরা গেছে! আমারে যে কইছিলো পয়লা দিনের রস যেন তারে খাওয়াই, আমি যে তারে কথা দিছিলাম খাওয়ামু, অহন, অহন আমি কেমতে আমার কথা রাখুম!
দৌড় দিয়া ছনুবুড়ির ঘরে ঢুকল দবির। নিজের কাপড়ে গলা পর্যন্ত ঢাকা ছনুবুড়ি শুয়ে আছে চিৎ হয়ে। মুখ এখনও মাখামাখি হয়ে আছে মাইট্টাতেলে, চোখ ঠিকরে বের হতে চাইছে কোটর থেকে। মনে করে মুখটা কেউ মোছাইয়া (মুছিয়ে) দেয় নাই, মনে করে চোখ দুইটা কেউ বন্ধ করে দেয় নাই।
ছনুবুড়ির সামনে মাটিতে বসল দবির। মাজায় বান্ধা গামছা খুলে গভীর মমতায় তার মুখখানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, বুজি ও বুজি, আর একটা দিন বাইচ্চা থাকতে পারলা না তুমি! আমি যে তোমারে কথা দিছিলাম পয়লা দিনের রস তোমারে না খাওয়াইয়া কেরে খাওয়ামু না, তুমি তো আমারে আমার কথা রাখতে দিলা না। এই রস আমি অহনে কারে খাওয়ামু!
কথা বলতে বলতে চোখ ভরে পানি এল দবির গাছির। আস্তে করে হাত বুলিয়ে ছনুবুড়ির-খোলা চোখ বন্ধ করে দিল। তারপর যে গামছায় ছনুবুড়ির মুখ মুছিয়েছিল সেই গামছায় চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
উঠানে তখন পুরুষপোলা তেমন নাই। আজিজের কাছ থেকে টাকা নিয়া মোতালেব চলে গেছে কোলাপাড়া বাজারে। মতলেব গেছে বাঁশ কাটতে। আলফু মজিদ আর হাফিজদ্দি গোরস্থানে গেছে কবর খুঁড়তে। মজনু গেছে মান্নান মাওলানাকে খবর দিতে। জানাজা তিনিই পড়াবেন।
‘উঠানে নেমে আর কোনওদিকে তাকাল না দবির। ভার কাঁধে দুঃখি পায়ে বাড়ির নামার দিকে চলে গেল। সেখানে একটা বউন্না গাছে পা ঝুলিয়ে বসে তখন চিৎকার করে গান গাইছে হামেদ। আবদুল আলিমের গান। কাঁচা বাঁশের পালকি করে মাগো আমারে নিয়ো।’
গানের কথা কানে লাগে দবির গাছির। কাঁচা বাঁশের পালকি করেই তো গোরস্থানে নেওয়া হবে ছনুবুজিকে। চদরি বাড়িতে বাঁশ কাটতে গেছে মতলেব। এই এতদূর থেকেও তার বাঁশ কাটার টুক টুক আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আজকের পর ছনুবুড়ির সঙ্গে আর কারও দেখা হবে না কোনওদিন। কাঁচা বাঁশের পালকি চড়ে এমন এক দেশে চলে যাবে সে, মানুষের সাধ্য নাই সেই দেশ থেকে ফিরত আসার।
১.২৬-৩০ রান্নাচালার পিছন দিককার গয়াগাছ
১.২৬
রান্নাচালার পিছন দিককার গয়াগাছ থেকে চি চি স্বরের করুণ একখান ডাক ভেসে এল। দুইবারের বার ডাকটা খেয়াল করল মরনি। চঞ্চল হল। কীয়ে ডাকে এমুন কইরা। সাপে ব্যাঙ ধরলো নি! এই বাড়িতে সাপ একখান আছে, শানকি। সাপের রাজা হল এই শানকি। গয়না (যাত্রীবাহী বড় নৌকা), গস্তিনাও (মালবাহী নৌকা) বাঁধবার কাছির মতন মোটা। পাঁচ ছয়হাত তরি লম্বা হয়। ধূসর বর্ণের দেহে গাঢ় কালো রঙের ডোরা। দেখতে রাজকীয়। এই সাপের মুখ দুইখান। মাথার কাছে আসল মুখখানা তো আছেই, লেজের। কাছে আছে ছোট্ট আরেকখান মুখ। দুইমুখ একত্র করে যদি কামড় দেয় কাউকে, সে যেই হোক, হাতি নাইলে মানুষ, ভবলীলা সাঙ্গ হতে সময় লাগবো না। তবে এই সাপ সাধারণত কামড়ায় না, গিরস্তের ক্ষতি করে না। যেটুকু করে সেটা ভাল কাজ। দয়া করে যে বাড়িতে বাস গাড়ে (বসবাস করা অর্থে) সেই বাড়ির ত্রিসীমানায় কোনও বিষধর সাপ থাকতে পারে না। যদি থাকে কখনও না কখনও শানকির সামনে তাকে পড়তেই হবে। আর পড়ছে তো মরছে। বিষধর সাপ দেখেই বড় মুখখানা হাঁ করবে শানকি। যদি তখন বিড়া বান্ধা (বৃত্তাকারে শরীর প্যাঁচিয়ে রাখা) থাকে, বিড়া খুলে টানটান করবে দেহখান আর বিষধর সাপ আপনা থেকেই নিজের লেজখান এনে ঢুকিয়ে দিবে শানকির হাঁ করা মুখে। শানকি আস্তে আস্তে গিলতে থাকবে। গিলতে গিলতে যখন মাথা তার মুখের কাছে আসবে তখন কট করে বিষধরে মাথাটা কেটে ফেলে দেবে।
