বড়বুজানের লগে টুকটাক কথা হয় সারাদিনই। এই কাজে ওই কাজে কত কথা যে বুড়া মানুষটা বলে। অকাজেও বলে। তার লগে কথা বলতে আগে ভালই লাগত কুট্টির। আলফু চলে যাওয়ার পর থেকে, সে ফিরা আসে না দেখে মনমেজাজ ভাল নাই কুট্টির। বড়বুজান দশ কথা বললে সে বলে একটা, তাও হু হা না, এইসব। বেশি কথা না।
আলফুর কথা বড়বুজানেও জিজ্ঞাসা করেন। রোজই একবার-দুইবার তার কথা ওঠে। কী লো কুট্টি, আউলফা যে সাত-দশদিনের কথা কইয়া গেল আর দেহি আহে না? একলা বাইত্তে আমরা দুইজন থাকি কেমতে? হাটবাজার কে করে? বাড়ির কাম কাইজ, ছাড়াবাড়ির কাম কাইজ, খেতখোলা এইডি অহন দেখব কে?
কুট্টি বাঁচে না কুট্টির জ্বালায় আর বুড়ি আছে বুড়ির হাটবাজার বাড়িঘর আর খেতখোলা লইয়া। ওইসব কথা শুনলেই চেইতা ওঠে কুট্টি। আলফু আহে না ক্যা হেইডা আমি জানিনি? আমারে কন ক্যা?
বড়বুজান অবাক হন। তরে কমু না তয় কারে কমু? এই বাইত্তে কথা কওনের আছে কে?
কেউ যখন নাই তয় কইয়েন না।
বড়বুজান ফোকলা মুখে হাসেন। তর অইছে কী রে ছেমড়ি? আগে তো এমুন আছিলি না। অহন কথায় কথায় এমুন ছ্যান ছ্যান করচ ক্যা?
আমার ইচ্ছা আমি করি।
না রে তর মনে অয় কোনও ভেজাল অইছে।
কী ভেজাল অইবো আমার?
হেইডা সেন তুই জানচ।
না আমার কিছু অয় নাই। আমি সব সময় যেমুন অহনও তেমুন।
তয় আলফু এমতে যদি বাইত্তে গিয়া পইড়া থাকে, যুদি সহাজে না আহে তয় তো আমগো সংসার বাড়িঘর বেবাক অচল অইয়া যাইবো। হাটবাজার করবো কে? বাড়িঘরের কাম, ছাড়াবাড়ি, খেতখোলা…
কুট্টি রাগী গলায় বলে, এত প্যাচাইল পাইরেন না তো। আপনের প্যাচাইলে আমার শইল জ্বলে। আমি কি আপনেরে না খাওয়াইয়া রাকছি? হাটবাজার তো কেঐরে না কেঐরে দিয়া করাইতাছি। বাদলার বাপ মতলা কইরা দিছে দুইদিন, বাদলারে বাজারে পাইছি একদিন। গাওয়ালে গোয়ালিমান্দ্রা হাট থিকা সদাইপাতি আইন্না দিছে। আপনের অসুবিদা তো অইতে দিতাছি না আমি। তাও এত প্যাচাইল পারেন ক্যা?
বড়বুজানে হাসেন। হ বেবাকঐ ঠিক আছে তয় তুই ঠিক নাই। তর জানি কী অইছে। আমি চোকে দেহি না, লড়তে চড়তে পারি না তয় কানডা আমার পরিষ্কার আছে, মনডা আর মাথাডাও ঠিক আছে, আমি বুজি।
কী বোজেন আপনে?
তুই আগের কুট্টি নাই। তুই অহন অন্য কুট্টি।
মুখে কুট্টি বলে, হ কইছে আপনেরে। মনে মনে বলে, ঠিকঐ কইছেন আপনে। আমি আর আগের কুট্টি নাই। আমি অহন অন্য কুট্টি। আমি অহন আলফুরে ছাড়া কিছু বুজি না। হেয় আমার বাঁচন মরণ। হেয় আমার জান, আমার কইলজা।
এই জান কইলজার জন্য অপেক্ষা করতে করতে পাগল হয়ে যাচ্ছে কুট্টি। রাতেরবেলা শুয়ে পড়ার পরও তার ঘুম আসে না আলফুর জন্য। পালঙ্কে শুয়ে বড়বুজান ঘুমান। মেঝেতে শুয়ে আলফুর জন্য জেগে থাকে কুট্টি। দেশে গিয়া তার আবার অসুকবিসুক হয় নাই তো? কোনও বিপদ আপদে পড়ে নাই তো? হেয় বাঁইচ্চা আছে তো? এই দিনে পদ্মায় বিরাট ঢেউ, বিরাট কাটাল (কোটাল)। নাও ডুবলে যত সাঁতারই জানুক মানুষ, বাঁচনের পথ নাই। যাওনের সময় নাইলে ফিরত আহনের সময় নাও ডুইব্বা…
না না, না। হেয় মরে নাই, হেয় বাঁইচ্চা আছে। হের মতন ভাল মানুষরে আল্লায় এমতে মারবো না।
আসলে রাতেরবেলাও আলফুর জন্য অপেক্ষা করে কুট্টি। হয়তো মাতবরের চর থেকে দেরি করে মেলা দিছে। পদ্মা পার হয়ে মাওয়ার ওইদিকে আসতে রাত হয়ে গেছে। মাওয়া থেকে কোনও দোকানদারের লগে ভাও কইরা তার নাও লইয়া বাইত্তে আইছে। দুয়ারে আওজ দিয়া অহনই হয়তো ডাকবো কুট্টিরে। কুট্টি কুট্টি, দুয়ার খোলো। আমি আইছি।
রাত কেটে যায়। দুয়ার খুলতে হয় না কুট্টির। আলফু ফিরে না। রাতেরবেলার কত রকমের শব্দ চারদিকে। ঝিঁঝিপোকার ডাক, বাদুড়ের ওড়াউড়ি, চদরি বাড়ির দেবদারু গাছে কোড়ল পাখিটা বাগ দেয়, কপাখি ডাকে দূরে কোথায়, বাঁশঝাড়ে ভাদ্রমাসের হাওয়ার শনশন শব্দ, ভোরের দিকে মোরগে বাগ দেয়, কাক দোয়েল ডাকে, আজানের শব্দ আসে খাইগোবাড়ি থেকে, সব ঠিক আছে। খালি কুট্টি ঠিক নাই। আলফুর জন্য কুট্টি আর কুট্টি নাই।
কালরাতে ঘুমানের আগে বড়বুজান বললেন, দুই একদিনের মইদ্যে ঢাকায় খবর দেওন। উচিত। রাজা মিয়ার মা’রে জানান উচিত যে আলফু দেড় মাস ধইরা বাইতে গিয়া বইয়া রইছে। আলফুরে বাদ দিয়া অন্য মানুষ রাখনের বেবস্তা করন উচিত।
শুনে জবাই করা মুরগির মতন ধড়ফড় করেছে কুট্টির বুক। হায় হায় যদি সত্য এইডা করে এই বাড়ির মাইনষে, তয় কুট্টি এই বাইত্তে থাকবো কেমতে? আলফুরে ছাড়া সে বাঁচবো কেমতে? হয় গলায় দড়ি দিতে অইবো নাইলে মাতবরের চরে গিয়া আলফুরে। বিচড়াইয়া বাইর করন লাগবো। তারে ছাড়া বাঁচনের কোনও পথ নাই কুট্টির।
বড়বুজানের কথা শুনে একটা বুদ্ধি বাইর করল সে। বলল, বেশ উত্তেজিত গলায় বলল, হেইডা কয়দিন পরে করেন বুজি। তার আগে আলফুরে বিচড়াইতে মাতবরের চরে কেঐরে পাডাই।
বড়বুজান বিরক্ত হলেন। এত ভেজালের কাম কী? বাড়ির বান্দা কামলা। আষ্ট-দশদিনের কথা কইয়া ফিরতাছে না, অর লেইগা বইয়া থাকনের কাম কী?
না না হেইডা তো ঠিকঐ। তয় এতদিনের পুরানা মানুষ, বিশ্বাসী মানুষ…।
হ আলফু বিশ্বাসী মানুষ। চোর ধাউর না। মানুষও ভাল। তয় না আইলে কী করবি?
