আজবপদের কুত্তা তো!
আনমনা ভঙ্গিতে রান্নাচালা আর দক্ষিণের ভিটির ঘরটার মাঝখান দিয়া বাঁশঝাড় তলার ওদিকটায় আসল নূরজাহান। ভাদ্রমাসের রোদ তেমন পড়তে পারে নাই এই দিকটায়। বাঁশঝাড় আর হিজল বউন্নার গাছগুলি রোদ আটকে রেখেছে। এই দিকটায় এসে ভাল রকমের একটা চমক খেল নূরজাহান। আরে ভাদাইম্মা তো এইখানে! মাঝিবাড়ির সাদা কালোর মিশেল দেওয়া মাইগ্না কুত্তাটা কখন সাঁতরাইয়া আসছে এই বাড়িতে। কখন গাছিবাড়ি থেকে তারে ইশারা করছে ভাদাইম্মা। সে এসে বাঁশঝাড় তলার ওইদিককার নিটাল জায়াগায় গাইট লাগছে (গাঁট লাগা, কুকুরের যৌনকর্ম) ভাদাইম্মার লগে।
কুকুরদের এই কাজটা অদ্ভুত। মাইন্নাটার উপর মরদাটা চড়ে স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই কাজটা চালায়, কাজ সারার পর মরদাটা নিজের অঙ্গ আর সহজে ছাড়াতে পারে না। মাইন্নাটার ভিতর আটকে যায়। ছাড়তে অনেক সময় লাগে। আধঘণ্টা, পৌনে একঘণ্টা। দেশগ্রামের পোলাপান এইরকম কুত্তার গাইট লাগা দেখতে ভিড় করে। নানা রকমভাবে ত্যাক্ত করে কুকুর দুইটাকে। লাঠি দিয়া বাইড়াবাড়ি করে। কুকুর দুইটা তখন দুইমুখী হয়ে থাকে, মাঝখানে মাইগ্যাটার ভিতর মরদাটার সঙ্গ। হয়তো অঙ্গের অর্ধেকটা বের হয়ে আছে। গোলাপি রঙের সেই জিনিসটায় মজা করার জন্য নুন ছিটাইয়া দেয় দুষ্টু পোলাপান। কাঁচি (কাস্তে) দিয়া পোচও দেয়।
ইস, মানুষ যে কী খারাপ জন্তু! কোনও কোনও সময় কুত্তার থেকেও খারাপ।
তবে ভাদাইম্মা আর মাঝিবাড়ির কুকুরটার গাইট লাগা দেখে শরীরের ভিতর কীরকম করে উঠল নূরজাহানের। গা কাঁটা দিল, রোমকূপে সাড়া পড়ল। বিয়া হইলে রাইত দোফরে আন্ধার ঘরে জামাইর লগে সেও তো গাইট লাগবো। বছর ঘুরতে না ঘুরতে পেট হইবো, তারপর পোলাপান। মাঝিবাড়ির কুত্তাটার যেমন কয়েক মাস পরই বাচ্চা হবে। ভাদাইম্মা হবে বাপ, তয় তার খবরও থাকবো না। এইরকম কত মাইগ্যা কুত্তার পেট বাজাইবো, কে জানে! মরদারা তো কাজ সাইরাই খালাস, কষ্ট হইল মা জীবের। পেটের ভিতরে বাচ্চা লইয়া ঘোরন লাগে, তারপর দেওন লাগে জন্ম। আর জন্ম দেওন যে কী কষ্টের, যে জন্ম দেয় সে ছাড়া দুনিয়ার কেঐ সেই কষ্ট বুঝবো না। তারবাদে বুকের দুধ দেও, লালন পালন করো, শত্রুর হাত থিকা বাঁচাও। দুনিয়ার বেবাক কষ্ট মাইয়া জীবের। এখন যেমন কষ্টে আছে নূরজাহান। ছেলে হলে এইরকম কি তার হত! তার যেমন ভাল লাগছে মজনুকে, মজনুর যদি এমন ভাল লাগত তাকে, আর সে যদি হত মজনুর জায়গায় তা হলে মা বাপে যখন তার বিয়ার জন্য ঘটকের কাছে দৌড়াচ্ছে এই দৌড়ান এক কথায় বন্ধ করে দিত নূরজাহান। সোজা বাবা মাকে বলত, আমি অন্য কোনওখানে বিয়া করুম না। আমার পছন্দের মাইয়া হইল নূরজাহান। অরে আমি বিয়া করুম। তোমরা ব্যবস্তা করো।
মা-বাপে বাধ্য হয়ে করত। ছেলের পছন্দের দাম আছে, মেয়ের পছন্দের দাম নাই। তারা পছন্দ করবে একজনকে, বিয়া করবে আরেকজনকে। সংসার করবে আরেকজনের। তার পোলাপানের মা হবে আর গোপনে মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা পছন্দের মানুষটির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে!
নিজের জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল নূরজাহানের। ভাদাইম্মা তখনও গাইট লেগে আছে মাঝিবাড়ির কুত্তিটার লগে।
.
ভোররাতের দিক থেকে মাথাটা ঘুরছে কুট্টির। উকাল আসছে। একদিকে আজ দেড় মাসের উপর আলফুর কোনও খবর নাই, মনের অবস্থা খুবই খারাপ কুট্টির। রাতেরবেলা একফোঁটা ঘুমাতে পারে না, খালি আবোল তাবোল স্বপ্ন দেখে। দিনেরবেলা না খাইতে নাইতে ইচ্ছা করে, না কোনও কাজকাম। মনে মনে খালি অপেক্ষা। এই বুঝি বাড়ির ঘাটে এসে লাগল কারও নাও, সেই নাও থেকে রেকসিনের খয়েরি রঙের ব্যাগটা হাতে নিয়া নামল আলফু। পরনে নীল লুঙ্গি আর সাদা ঝুলপকেটআলা শার্ট। গলায় মাজায় বান্দা গামছা। পদ্মার ওপারের মাতবরের চর থেকে বিয়ানরাতে মেলা দিয়া পদ্মা পার হইছে তারপর মাওয়ার বাজার থেকে মেদিনীমণ্ডলের কারও নৌকায় মিয়াবাড়ির ঘাটে আসছে।
না, আসে না। আলফু আসে না। অপেক্ষায় অপেক্ষায় দিন কাটে কুট্টির।
এই বাড়িতে কাজ নেওয়ার পর থেকে যতবার আলফুকে চরে যাইতে দেখছে, আলফু রওনা দিছে ভোরবেলা। যেদিন ফিরার কথা ফিরা আসছে বিকালের দিকে। এইজন্য দুপুরের পর থেকে কুট্টির শুরু হয় অপেক্ষা।
সকাল থেকে সংসারের কাজ, বড়বুজানের কাজ। করতে ভাল লাগে না তারপরও নিজের কাজগুলি করে। নাওয়াধোওয়া, খাওয়াদাওয়া। দুপুরের পর চারদিক একদম নিটাল। বড়বুজান খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েন। সন্ধ্যা তরি ঘুমান। কুট্টির তখন কিছু করার থাকে না। ইচ্ছা করলে দরজা বন্ধ করে সেও বুজানের পালঙ্কের পাশে মেঝেতে শুয়ে ঘুম দিতে পারে। দুই একদিন চেষ্টাও করেছে, ঘুম আসে না। উসপিস উসপিস লাগে। খালি মানুষটার কথা মনে হয় তার আর ঘনঘন নিয়াস পড়ে। বুক ফেটে, চোখ ফেটে কান্না আসে।
মানুষটা তার লগে এমন করল ক্যান? এত ভাল মনের মানুষ, জ্বর থেকে ওঠার পর কুট্টির কথা ভেবে সাত-আষ্ট মাস বাড়িতে যায় নাই। বউ পোলাপানের কথা ভাবে নাই। শেষ তরি গেল বউ যাতে পোলাপান নিয়া এই বাড়িতে আইসা না ওঠে সেই ডরে। বলে। গেল সাত থেকে দশদিন, ফিরত আমি আসুমই। তোমারে ছাইড়া থাকুম না। তারপর দেড় মাসের বেশি। কোনও খবর নাই। কুট্টি রোজ ভাবে, আইজ সে আসবো। দুপুরের পর। থেকে শুরু হয় অপেক্ষা। দুপুর শেষ হয়ে বিকাল হয়, বিকাল শেষ হয়ে সন্ধ্যা, রাত, সে আসে না। কুপি হারিকেন জ্বেলে রাতের কাজ করে কুট্টি। বড়বুজানকে খাওয়ায়, ইচ্ছা হলে নিজে খায় না হলে খায় না, শুয়ে পড়ে।
