নূরজাহানের জীবন যদি হত তছির জীবন। বদ্ধ পাগলের জীবন তা হলে কি মান্নান মাওলানা তার পিছনে লাগত? পাগল হয়ে সে যদি মান্নান মাওলানার মুখে ছ্যাপ ছিটাত তা হলে কি কেউ কিছু মনে করত?
না মনে করত না। ভাবত পাগলনির পাগলামি।
পাগল হলে মাকুন্দার জন্যও এত মায়া হত না নূরজাহানের। দেখতে শুনতে যত ভালই সে হউক, পাগল তো আর বিয়া করতে চাইতেন না মান্নান মাওলানা। যত রাগই পাগলের উপর থাউক, তাকে কি আর সংসারে নিতে চাইত। তার উপর কি আর শোধ নিতে চাইত। পাগলের উপর কী শোধ নিব? পাগল তো উলটা পাগলামি করে জান খেয়ে ফেলত ওই পোংটা মাওলানার!
আইচ্ছা, মানুষ তো বদলায়! গাওয়াল দাদায় বদলাইয়া গেল না? তার বউ, খাড়েদজ্জাল বানেছা বদলাইছে, পোলাপানডি বদলাইছে। তারা আর পুরানা মানুষ নাই, বেবাকতে নতুন হইয়া মানুষ হইয়া গেছে। মান্নান মাওলানা নতুন হইতে পারল না? আল্লায় তার মনে ইট্টু রহম দিতে পারল না? আমারে মাপ কইরা সত্যই বদলাইয়া যাইতে পারত না সে?
হ আমি অন্যায় করছি, বিরাট অন্যায় তার লগে করছি, ক্যান করছি হেইডা হে বুজছে। বুইঝা বেবাকতেরে কইছেও, নাদান মাইয়া, অরে আমি মাপ কইরা দিলাম! বান্দরডার মুখে এক অন্তরে আরেক। মাপ করে নাই। অহন অন্য তরিকায় আমারে বউ বানাইয়া শোধ লইতে চায়। অর ঘরে যাওনের আগে আমি গলায় দড়ি দিমু! তাও আমার শইল্লে অরে হাত দিতে দিমু না!
রান্নাচালার সামনে একটা ফিরি পড়ে আছে। দুইটা কাক আর একটা শালিক চরছে ওইদিকে। খাবার খুঁজছে। রোদের তাপে তিনটা পাখিই ঠোঁট ফাঁক করে শ্বাস টানছে। নূরজাহান রান্নাচালার দিকে গেল। আনমনা ভঙ্গিতে ফিরিটায় বসল। বসেই কুট্টির কথা মনে পড়ল। কেমুন পাগল হইয়া গেছে আলফুর লেইগা। বেবাক কথা আমারে কইছে। একবার বিয়া হইছিল কুট্টির। জামাইবাড়ি, হতিন, হতিনের পোলা, মাজায় ঝুনঝুনি বান্দা নয়ন, বেক কথা কইছে। এতদিন মিয়াবাইত্তে আছে, তারবাদে আথকা আলফুর লগে কেমতে কী হইল, মাতবরের চরে আলফুর বউ আর তিনডা পোলাপান, তারবাদেও আলফু হইল কুট্টির জান, আত্মা, আলফুর লেইগা কাইন্দা মইরা যাইতাছে। মনের মানুষের লেইগা তো এমুনই পাগল হওনের কথা মানুষের।
নূরজাহানের তারপর মজনুর কথা মনে পড়ল। মনে মনে মজনুর লগে কথা বলতে লাগল সে। তোমারে আমার বহুত ভাল লাগে মজনুদাদা। বহুত ভাল লাগে। তুমি দ্যাশে থাকলে রোজ আর নাইলে দুই-চাইর দিন পর পর যুদি তোমার লগে আমার দেহা অইতো, তয় আমার দশা অইতো কুট্টির লাহান। তোমার দশা অইতো আলফুর লাহান। আমারেও যে তোমার ভাল লাগে, আমারেও যে তুমি পছন্দ করো হেইডা তোমার চোক্কের মিহি চাইয়া আমি বুজছি। তুমি হেদিন ঘুরাইয়া প্যাচাইয়া অনেক কথা কইতে চাইছো আমারে। আমি বুজছি, তোমার বেক কথাঐ আমি বুজছি। তয় মাইয়া মাইনষের তো বুক ফাডে তাও মুখ ফোড়ে না। আমি কোনওদিনও আমার কথা তোমারে কইতে পারুম না। ই পারুম, তোমার লগে যুদি আমার বিয়া অয়, তয় বিয়ার পর কইতে পারুম। বাসর রাইত্রে, নাইলে তারবাদে কোনও এক রাইত্তে, তোমার লগে শুইয়া শুইয়া, আথকা কইয়া হালামু, তোমারে আমার বহুত ভাল লাগে। তোমারে আমি ভালবাসি। তোমার লগে বিয়া অওনে আমি যে কী খুশি হেইডা তোমারে আমি কইয়া শেষ করতে পারুম না।
তারপরই অন্য একটা কথা ভেবে উত্তেজিত হল নূরজাহান। বাবায় যে ঘটকার কাছে দৌড়াইতাছে, ঘটকারে মজনু দাদাগো বাইত্তে পাড়ায় না ক্যা? মজনুদাদার লগে আমার। বিয়ার পোরোসতাব দেয় না ক্যা? মরনি আম্মায় তো আমারে জান দিয়া আদর করে। হেদিন বাড়ির বউর লাহান পোলাও মোরগ রাইন্দা খাওয়াইলাম ওই বাড়ির মাইনষেরে। লগে আমি আর আমার বাপেও খাইলাম। বেবাকতে এত গুণ গাইলো আমার। মান্নান। মাওলানার হাত থিকা দুইবারঐত্তো আমারে বাঁচাইলো। অহন হারাজীবনের লেইগা তার বাড়ির বউ বানাইয়া হারাজীবন আমারে বাঁচায় না ক্যা? মরনি আম্মায় ক্যান মজনুর লগে আমার বিয়া ঠিক করে না! ক্যান তার বাড়ির বউ বানায় না আমারে!
আর আমার মা-বাপেই বা কেমুন! তারা রমিজ ঘটকারে লইয়া চিন্তা করতাছে ক্যা? মরনি আম্মার কাছে যায় না ক্যা? তারে গিয়া কয় না ক্যা, বুজি, আমার মাইয়াডা আপনে নেন। হ দেশ গেরামের মাইনষে এইভাবে সাইধা সাইধা মাইয়া দেয় না। এইডা শরমের কথা। তয় মরনি আম্মার কাছে আমগো আবার কীয়ের শরম! আমগো সমন্দে হের তো আর অজানা কিছু নাই!
তয় সমস্যা একহান আছে। বংশ। তারা হালদার বংশ। মজনু অল্পবিস্তর লেখাপড়া শিখছে। নূরজাহান তো কিছু শিগে নাই। খাইগোবাড়ির ইসকুলে ছোডকালে দুই-চাইরদিন গেছে, কায়দা সিপারা পড়ছে, তারপর আর কিছু না। কোরান শরিফও পড়তে শিগে নাই। বাপ হইল গাছি। মজনুর লগে কি এমুন মাইয়ার বিয়াতে রাজি হইব মরনি আম্মায়!
যুদি রাজি না হয় তয় তো শরমে একদোম মইরা যাইবো নূরজাহান। জিন্দেগিতে আর মরনি আম্মার সামনে গিয়া খাড়ইতে পারবো না, মজনুরে এই মুখ দেহাইতে পারবো না!
নূরজাহানের খুবই দিশাহারা লাগল। উঠে দাঁড়াল সে। হঠাৎ মনে পড়ল ভাদাইম্মার কথা। কুকুরটা আজ গেল কোথায়? সকাল থেকে একবারও দেখে নাই নূরজাহান। বর্ষার পানি ভেঙে যেমন করে একদিন এই বাড়িতে আইসা উঠছিল সেইভাবেই চলে গেল নাকি! কাউরে কিছু না বলে চলে গেল!
