আমার পাগলা ঘোড়া রে
কই মানুষ কই লইয়া যাচ!
.
ছাড়াবাড়ির হিজল ডুমুরের জঙ্গলে কানিবকের ছানাগুলি এখন আর ছানা নাই। ধারিবক হয়ে গেছে। চকমাঠের পানি নামতে শুরু করেছে দেখে মা-বাপের লগে তারাও উড়ে উড়ে যায় মাছ শিকারে। পেটভরে চেলামাছ খেয়ে পুরানা বাসায় ফিরে আসে। তবে বাসায় তারা আর থাকে না। হিজল ডুমুর আর নয়তো বউন্নার ডালে দিনভর আসা যাওয়া করে, রাতভর। বসে থাকে। ভোরবেলা দিনের আলো ফুটে উঠবার লগে লগে তাদের ককর মকর শব্দ পাওয়া যায়। ডানা ঝাঁপটে, ঠোঁট ঠ্যাং তুলে মারামারি করে, নূরজাহান ঘরে বসে এইসব শব্দ পায়। উঠানে নেমে ছাড়াবাড়ির জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে বকপাখি দেখে। দুইটার জায়গায় পাখি এখন চারটা। সংসার বড় হয়েছে তাদের। বর্ষায় এদিকটায় আধার বেশি পাওয়া যায় দেখে এখনও বাসার কাছাকাছিই আছে তারা। বর্ষাকাল শেষ হলে, এদিককার চকমাঠ ভেসে উঠলে, আধারে টান পড়লে বিলের দিকে চলে যাবে বকগুলি। এইমুখী হয়তো আর হবেই না।
পাখিদের জীবন কী সুন্দর। এক গাছে সারাটা জীবন তারা কাটায় না, এক বাসায় কাটায় না। দুইজনে ভাব ভালবাসা হলে একসঙ্গে বাসা বাঁধে কোনও নিরাপদ গাছে, ডিম দেয়, বাচ্চা ফুটায়, কত আদরে যত্নে বাচ্চাগুলিরে খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া বড় করে। তারপর উড়তে শিখে কিছুদিন হয়তো মা-বাবার লগে থাকে ছানারা, তারপর যে যার মতন উড়ে যায়। নিজের দুনিয়া তৈরি করে নেয়। মা-বাবা ভাইবোন কাউকে আর চিনে না।
মানুষের লগে এই জায়গাটায় বিরাট ব্যবধান তাদের। মানুষ মা-বাবা ভাইবোন আত্মীয় স্বজন প্রিয় পছন্দের মানুষজনকে কখনও ভোলে না, মনে রাখে। তাদেরকে জড়িয়ে প্যাচিয়েই বাঁচতে চায়। যদিও সব সময় তা হয় না। তবু মনের মধ্যে থেকে যায় প্রিয় মানুষরা, চোখের ভিতরে থেকে যায় তাদের মুখ, স্মৃতিতে থেকে যায় তাদের ভালমন্দ, সুখ দুঃখ, হাসি আনন্দ আর বেদনার কথা।
ভাদ্রমাস পড়তে না পড়তেই উধাও হয়ে গেছে বৃষ্টি। নীল আকাশে শুধুই ভাসে সাদা মেঘ। সকাল থেকে রোদে ঝলমল করে দেশগ্রাম, ফুরিয়ে আসা বর্ষার চকমাঠ। চারদিক থেকে ঠিকরে আসে চুলার নিভে আসা আগুনের মতন গরম। হাঁসফাঁস লাগে। ঘরে বসে থাকতে ইচ্ছা করে না।
দুপুরের ভাত খেয়ে ঘণ্টাখানেকের একটা ঘুম দেওয়ার অভ্যাস আছে নূরজাহানের। আজও শুয়েছিল, তবে ঘুম আসে নাই। খানিক এপাশ ওপাশ করে ঘর থেকে বের হয়েছে। হামিদা আঁচলে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে। গভীর ঘুম যে ঘুমাচ্ছে বোঝা যায়। খাওয়াদাওয়া শেষ করে দবির তার কোষানাও নিয়া বের হয়ে গেছে। নূরজাহানকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলেছে, আইজ বিয়ালে জসিলদার (জসলদিয়া) হাট। হাট ঘুইরা আসি। কান্দিপাড়ার লগের গেরাম হইল জসিলদা। রমিজ ঘটকের বড়পোলা হারুনের মদিদোকান আছে হাটে। রমিজরে হাটের দিন ওই দোকানে পাওয়া যায়। পোলার লগে দোকানদারি করে। যাই ঘটকার লগে কথা কইয়াহি। কয়ডা টেকা দেও, ডাইল ডুইল মাচ তরকারি হস্তায় পাইলে কিছু লইয়ামুনে।
হামিদা কত টাকা দিয়েছে খেয়াল করে নাই নূরজাহান। আঁচলে মুখ ঢেকে শুয়েছিল। শুয়ে শুয়ে একটা কথাই শুধু তার কানে লেগে থাকল, রমিজ ঘটক। তার বিয়ার লেইগা। পাগল হইয়া গেছে মা-বাপে। একবার পাগল হইছিল মান্নান মাওলানার মুখে ছ্যাপ দেওনের পর, এইবার হেই শুয়োরের পোয়, এতদিন বাদে যখন অন্য তরিকা ধরছে, নূরজাহানরে বিয়া করতে চায়, শুইনা পাগল হইল বাপে, কেঐরে কিছু না কইয়া মরনি আম্মার বুদ্দি লইয়া, দেলরা আম্মারে ধইরা এনামুল সাবরে দিয়া থামাইলো ইবলিশটারে। এনামুল সাবে বইলা দিছে, মাইয়া তাড়াতাড়ি বিয়া দিয়া দেও। তারপর থিকা বাপে পাগল অইয়া গেছে। যত তাড়াতাড়ি বিয়া দেওন যায় নূরজাহানরে তত তাড়াতাড়িই বিপদ শেষ অয়।
আহা রে, আমার নিরীহ মা-বাপটারে কী আজাবের মইদ্যে আমি হালাইছি!
এইসব ভেবে ঘুমটা আসে নাই নূরজাহানের। খুব কান্না পাচ্ছিল। আস্তে করে উঠে বাইরে এল সে। ছাড়াবাড়ির ঝোঁপজঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইল। বকপাখিগুলি দেখে মনে। হল, তার জীবন কেন পাখির জীবন হয় নাই। তার জীবন কেন পুরুষমানুষের জীবন হয় নাই। আর নাহয় তার জীবন যদি হত বড়ঘরের মেয়েদের জীবন, স্কুল কলেজে পড়ে দেশে বিদেশে জীবন কাটাত, ইসকুল মাস্টার হত, বড় চাকরি করত, নিজের স্বাধীন জীবন! টাউনে তো অনেক মেয়ের জীবন এমন। দেশগ্রামের বড়ঘরের মেয়েরাও তো গ্রামের স্কুল শেষ করে টাউনে চলে যায় পড়তে। লেখাপড়া জানা মেয়েদের বিয়াশাদি হচ্ছে বড়ঘরে, কত সুখের জীবন। দুঃখ কষ্টের জীবন শুধু নূরজাহানদের মতন মেয়েদেরই। যাদের লেখাপড়া নাই, বাপের অবস্থা ভাল না। বড় আত্মীয় স্বজন নাই, পাশে দাঁড়াবার কেউ নাই, এইরকম মেয়েদের জীবন মানুষের জীবনই না। তাদের জীবন কুত্তা বিলাইয়ের জীবনের মতন। যে সামনে পায় সেই একটা লাথি দেয়, সেই একটা খাবলা দেয়।
ঘরের ছেমায় দাঁড়িয়ে ছাড়াবাড়ির ঝোঁপজঙ্গলের দিকে তাকিয়ে হাজামবাড়ির তছির কথা মনে পড়ে নূরজাহানের। বদ্ধ পাগল মেয়েটা এখন আরও পাগল হয়ে গেছে। দিনেরবেলা ঘর থেকে বের হয় না। তার দিন হয়ে গেছে রাত, রাত হয়ে গেছে দিন। সারাদিন তার শিথানে বসে আছে মা। কাঁথার তলা থেকে একটা হাত বের করে মায়ের হাত ঘুমের ভিতরও শক্ত করে ধরে রাখছে তছি। যেন তার ঘুমের তালে মা তাকে ছেড়ে যেতে না পারে।
