রহিমার লগে পোলাপান নিয়া মান্নান মাওলানার ঘরের সামনে আসল পারু। ততক্ষণে নামাজ শেষ করেছেন মান্নান মাওলানা। এখন খাটের উপর জায়নমাজে বসে তসবি টিপছেন। আর দোয়া পড়ছেন। ওদেরকে দেখে বললেন, ভিতরে আয় শিরি।
ওরা ভিতরে ঢুকল।
শিরি না, নসু বলল, আমরা যাইতাছি দাদা।
মান্নান মাওলানা উৎসাহের গলায় বললেন, হ হ যাও যাও। বেড়াইয়া আসো।
পারুর দিকে তাকায়া বললেন, বদুর ভাড়াভোড়া বেবাক আমি দিয়া দিমু। তোমগো দেওন লাগবো না। তোমরা দিলে বেশি নিবো।
পারু মাথা নাড়ল, তবে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল না। হাতের চাবি তিনি যেখানে বসে আছেন তার কাছাকাছি রাখল। মুখের দিকে না তাকায়া, কোনও সম্বোধন না। কইরা বলল, ঘরের চাবি, কেবিন আলমারির বেবাক চাবি এহেনে আছে।
আইচ্ছা আইচ্ছা।
পারু আর দাঁড়াল না, ঘর থেকে বাইর হইয়া আসল। মান্নান মাওলানা অবাক। বাড়ির বউ নাঐর যাইতাছে, শ্বশুররে চাবি বুঝাইয়া দিল, কদমবুসি করল না! ঘটনা কী! বউ তো দিহি বিরাট বেদ্দপ অইয়া গেছে।
পারু ইচ্ছা করেই কদমবুসি করে নাই। যার মুখের দিকে তাকাতে ঘৃণা হচ্ছিল তার পায়ে হাত দেয় কেমন করে!
উঠানে নাইমা আতাহারের ঘরের দিকেও তাকাল না পারু। ওই ঘরের দিকে তাকাতেও তার ঘৃণা হল। মনে হল ওটা গিরস্তবাড়ির একটা পায়খানা। পুরান মলের মধ্যে শুইয়া আছে। গুয়ের একখান পোক। ওইদিকে তাকানো যায় না।
নিজের সীমানায় আইসা পারু দেখে ফিরোজা দাঁড়ায়া আছে। দাদার ঘর থেকে বাইর হইয়াই নসু আর নূরি দৌড় দিয়া গিয়া উঠছে নৌকায়। শিরি আছে পারুর লগে। রহিমাও আছে। পারু রহিমার দিকে তাকাল। যাও, তুমি গিয়া কামকাইজ শুরু করো।
রহিমা বলল, আপনেগো নৌকা ছাড়ক তারবাদে যামু নে।
আমগো নৌকা অহনঐ ছাড়বো। তুমি যাও।
আইচ্ছা তয় যাই। যাওনের আগে কইয়া যাই, তাড়াতাড়ি আইয়া পইড়েন গো মা। হুজুরানি মইরা গেছে, আপনেও যুদি বাইত্তে না থাকেন তয় বাড়িডা খালি খালি লাগবো।
পারু কথা বলল না।
শিরি তাকায়া আছে পারুর দিকে। পারু তার দিকে তাকাল। নাওয়ে উট মা, আমি আইতাছি।
শিরি গিয়া নৌকায় চড়ল।
রহিমা তখন রানঘরের দিকে পা বাড়াইছে, পারু বলল, খাড়াও।
রহিমা দাঁড়াল।
পারু বলল, তোমার লগে কত সময় কত খারাপ ব্যবহার করছি, রাগারাগি বকাবকি করছি, তোমার মনে কত সময় কত দুঃখ দিছি, তুমি ওই হগল মনে রাইখো না। তুমি আমার মা’র বয়সি। ভুলভাল কইরা থাকলে মাপ কইরা দিয়ো।
রহিমা থতমত খেল। এই কথা কইতাছেন ক্যা গো মা? এই কথা তো তারা কয় যারা আর কোনওদিন ফিরত আহে না।
ফিরোজার লগে তখন তরি একটাও কথা বলে নাই পারু। তবু ফিরোজা কাঁদছে। নিঃশব্দে গাল বাইয়া পানি পড়ছে তার। আঁচলে একবার চোখ মুছল সে, গাল মুছল।
ফিরোজার কান্না দেখে কী বুঝল রহিমা কে জানে, পারুর একটা হাত ধরল। আপনে এমুন কইরা আমারে কইলেন ক্যা গো মা? ঘটনা কী?
পারুর তখন গলা বন্ধ হয়ে আসছে, কথা বলতে পারছে না। একটু থেমে নিজেকে সামলাল সে। তারপর বলল, ফিরোজা তোমারে সব কইবো। তয় তোমার আল্লার কছম তুমি কেঐরে কইয়ো না।
রহিমা ফ্যালফ্যাল করে পারুর দিকে তাকায়া রইল। পারু আর তার দিকে তাকাল না, ফিরোজার সামনে আইসা দাঁড়াল। ফিরোজার কাঁধে হাত দিল। কানদিস না। আমি চইলা যাওনের পর রহিমারে বেক কথা কইচ। অরে আমি চিনি। মইরা গেলেও কেঐরে কোনওদিন কইবো না। আর তুইও বইন আমারে মাপ কইরা দিচ। যুদি কোনও ভুলচুক কইরা থাকি, তর মনে না বুইঝা দুঃখ দিয়া থাকি, মাপ কইরা দিচ।
ফিরোজা আর নিজেরে ধরে রাখতে পারল না, পারুরে জড়ায়া ধইরা কাঁদতে লাগল। আপনেরে আমি কী মাপ করুম, আপনে আমারে মাপ কইরা দিয়েন।
কান্নার চাপে পারুর তখন বুক ফেটে যাচ্ছে, চোখ ফেটে যাচ্ছে, তবু চোখে পানি আসতে দিল না সে, শক্ত মুখে নৌকায় উঠল। রহিমা হতবাক হয়ে তাকায়া আছে, ফিরোজা কাঁদছে, এসবে বদু মাঝির কিছুই যায় আসে না। সে লগির প্রথম খোচ দেওয়ার আগে বেশ শব্দ করে বলল, বিসমিল্লাহ বিসমিল্লাহ।
বদুর খেচে খেচে তালুকদার বাড়ি আর কামারবাড়ির মাঝখানকার চক দিয়া পুব দিকে যায় নৌকা। তখন মাত্র রোদ উঠেছে। বর্ষার পানিতে, গিরস্তবাড়ির গাছপালা আর উঠান পালানে পড়েছে সকালবেলার তাজা রোদ। তিনটা পোলাপান নিয়া ছইয়ের তলায় বসে আছে পারু, উপরে তার এক চেহারা, ভিতরে আরেক। মনে মনে সে কত যে কথা বলে। এই যে বিয়ানবেলার রোদ, আমারে তুমি মাপ কইরা দিয়ে। এই যে বাইষ্যাকালের পানি, পদ্মা নদীর হাওয়া, পানির তলার মাছ, চকমাঠের ঘাস বিচালি, কাইশ্যা ধইনচার খেত, আমারে তোমরা মাপ কইরা দিয়ে। এই যে গেরামের গিরস্তবাড়ি, গাছগাছালি, উঠান পালান আর মানুষজন, আমারে তোমরা মাপ কইরা দিয়ো। গোরুবাছুর পাখপাখালি, আর মেদিনীমণ্ডল গ্রাম, মাপ কইরো, আমারে তোমরা মাপ কইরো। এই যে মাথার উপরে আশমান, তার উপরে আছে সাত আশমান, সেই আশমানে তুমি বইসা আছো হে আল্লাহ, পাক পরোয়ারদিগার, আমি বড় গুনাগার। আমার বেক কিছু তুমি জানো আল্লাহ। তুমি দায়ারসাগর, মাপ করনেআলা, আমার গুনাহ তুমি মাপ কইরো আল্লাহ।
নিজের অজান্তে পারু যে তখন চোখের জলে ভাসছিল, সে তা টের পায় নাই। শিরি নসু আর নূরি মায়ের চোখের পানি দেখে স্তব্ধ হয়ে আছে। বদু মাঝি পারুর কান্না দেখতে পায় না। লগিতে খেচের পর খোচ দেয় সে আর মনের আনন্দে গান গায়।
