পারু মেয়ের দিকে তাকাল। কী?
তোমারে একখান কথা জিগাই?
চটপটা হাতে শালের মধ্যে গহনাগুলি জড়ায়া ব্যাগে রাখল পারু। আবার বলল, কী?
তুমি হেদিন রাইতে অমতে কানতাছিলা ক্যা?
পারু চমকাল। তুই উদিস পাইছস?
হ।
কেমতে পাইলি? আমি তো আওজ করি নাই।
তাও ইট্টু আওজ অইছে। রাইতদোফরে কীর লেইগা অমতে কানছো তুমি?
মনডা খারাপ আছিলো না।
বাবার কথা মনে অইছিলো?
পোলাপানের লগে মিছাকথা পারতিকে বলে না পারু। দুই-একটা ব্যাপারে বলতেই হয়। না বইলা উপায় থাকে না। এখন তেমন সময়। মেয়ের লগে মিছাকথা বলতে লাগল পারু। খালি তর বাবার কথা না, আরও অনেক কথা মনে পড়ছিল। কতদিন বাপের বাইত্তে যাই না, ভাই বইনগো লগে দেহা অয় না, বেক কিছু মিল্লা ঘুম অইতাছিল না। খালি কান্দন আইতাছিল।
এর লেইগাঐ আথকা খালার বাইত্তে যাইতাছো, নানাগো বাইত্তে যাইতাছো?
হ মা।
শিরি একটু চুপ করে থেকে বলল, মা, আমি ইট্টু তোমার কাছে আহি?
পারু একটু অবাক হল। তারপর বলল, আয়।
শিরি উঠে পারুর কোলের কাছে আইসা বসল। তোমারে একখান কথা কইতে চাই মা।
মেয়ের মাথায় গালে হাত বুলায়া পারু মায়াবী গলায় বলল, কও মা, কও।
আমার মনে অয় তোমার মন খুব খারাপ মা। উপরে উপরে তুমি ঠিক থাকনের চেষ্টা করতাছো, ভিতরে ভিতরে বহুত কষ্ট পাইতাছো, হেই কষ্টের কথা কেঐরে কইতে পারতাছো না! কোনও কারণে বহুত বড় দুঃখ পাইছো তুমি! এর লেইগাঐ আথকা মাজারো। খালার বাইত্তে যাইতাছো, নানাগো বাইত্তে যাইতাছো।
মেয়ের কথা শুনে কেঁপে উঠল পারু। আরে আমার দশ বচ্ছরের মাইয়া এতকিছু বুজলো কেমতে? ও তো আমারে খ্যাল কইরা দেখছে। ও তো আমার দুঃখ বেদনাটা টের পাইছে। আহা রে আমার মাইয়া, আমার কইলজার টুকরা।
শিরিকে দুইহাতে বুকে জড়াইয়া ধরল পারু। অনেক চেষ্টা করল বুক ঠেলে ওঠা কান্না ঠেকায়া রাখতে পারল না। হু হু করে কাঁদতে লাগল।
৩.৬ ফজরের আজান
মান্নান মাওলানা ফজরের আজান দিচ্ছেন, তখনই নৌকা নিয়া আসলো বদু মাঝি।
হাফিজদ্দি তাকে বুঝাইয়া বইলা আসছিল কোন ঘাটে নৌকা ভিড়াইতে হইব। সেইভাবেই মোতাহারের সীমানার ঘাটপারে আইসা নৌকা ভিড়াইল বদু। পারু আর তার তিন পোলাপান আজানের আগেই উইঠা গেছে। কাপড়চোপড় পরে রেডি সবাই। বদু নৌকা নিয়া আসার পর হাফিজদ্দি আর রহিমা আসল পারুর ঘরে। ব্যাগ দুইটা নিয়া নৌকায় তুইলা দিল হাফিজদ্দি। সে আর রহিমা অন্য সবার মতন জানে বইনের বাড়ি, বাপের বাড়ি নার যাইতাছে পারু। সামনে ভাদ্দরমাস, ওই মাস কাবার কইরা, বাইষ্যার পানি থাকতে থাকতে ফিরত আইবো। এইজন্য তাদের মনে কোনও দুঃখ বেদনা নাই। তারা এক ধরনের আনন্দেই আছে। বাড়ির বউঝিরা বেড়াইতে যাওয়ার সময় বাড়ির কাজের লোকদের কেন যে একটা আনন্দ হয়!
এত সকালে নাস্তাপানি খাওয়ার কিছু নাই। পোলাপান তিনটা পেশাব পায়খানা সাইরা নিছে। হাতমুখ ধুইয়া, দাঁত মাইজা একদম পয় পরিষ্কার। রাস্তাঘাটে নসু আর নুরির পেশাব করার দরকার হলে অসুবিধা নাই। নসু তো পোলা, তার অসুবিধা কী? ছইয়ের বাইরে গিয়া দাঁড়ায় দাঁড়ায়া ছ্যাড়ছ্যাড় কইরা ছাইড়া দিলেই হইল। নূরিরেও বসাইয়া দিলেই হবে। অসুবিধা শুধু পারু আর শিরির। সেটারও কোনও অসুবিধা মনে করে না দেশ গ্রামে নাঐর যাওয়া বউঝিরা। রাস্তায় কত গিরস্তবাড়ি। কোনও বাড়িতে নামলেই হল।
আলো ফুটছে বাইরে। বর্ষার পানির মতন আলোটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে লাগল। আমগাছ জামগাছে কাকপক্ষী ডাকছিল বিয়ানরাত থেকে। জামগাছের ওদিকটায় ওড়াউড়ি করছে শালিক পাখি। হিজল ডুমুরের ঝোঁপের ওদিক থেকে উইড়া আসল একটা দইকুলি (দোয়েল)। আথালে বান্দা গোরুগুলির একটা হাম্বা হাম্বা করছে। আস্তে ধীরে জেগে উঠছে দুনিয়াদারি। মান্নান মাওলানার নামাজ পড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আতাহার ঘুমাচ্ছে। বাংলাঘরে। যে মানুষটার লগে সম্পর্ক সে যে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে, সে জানে মাসখানেক পর ফিরবে, তাও কি একবার উইঠা আসব না! হাসিমুখে আর নাইলে মন খারাপ করা ভঙ্গিতে। বিদায় দিবো না মানুষটারে!
হালকা কলাপাতা রঙের সুতি শাড়ি পরেছে পারু। তার হাতে এক গোছা চাবি আর একটা তালা। কেবিনের আলমারি তালা মারছে সে, কেবিনের দুয়ারে তালা মারছে। এখন। ঘর থেকে বাইর হইয়া হাতের তালাটা ঘরের দুয়ারে লাগায়া দিল।
গোরুর হাম্বা শুইনা হাফিজদ্দি চলে গেছে আথালের দিকে। রহিমা আছে পারুর লগে। নসুর এমন অবস্থা, মা কেন দেরি করছে বুঝতে পারছে না। বারবার তাড়া দিচ্ছে। ওমা, লও নাওয়ে উডি। দেরি করতাছো ক্যা?
নূরি বলল, আমি ইট্টু গনিদাদাগো ওইমিহি যাই মা? হিরা মানিকরে ইট্টু দেইক্কাহি।
পারু কথা বলার আগেই শিরি বলল, অরা অহনতরি উডে নাই।
রহিমা বলল, তোমরা ফিরত আহনের পর দেহা কইরো। অহন যাও, দাদার লগে গিয়া দেহা করো। তারবাদে নাওয়ে ওডো।
বদু মাঝি বলল, দেরি কইরেন না। লন বেলা উডনের আগেঐ মেলা দেই। রইদ উডনের আগে যতাহানি আউন্নাইতে পারি। রইদ উইট্টা গেলে নাও বাইতে জান বাইর অইয়া যায়।
পারুর ইচ্ছা হল না মান্নান মাওলানার সামনে গিয়া দাঁড়ায়। তার কাছ থেকে বিদায় নেয়। ওই মুখ তার আর দেখার ইচ্ছা নাই। তবু যেতে হবে। চাবি বুঝাইয়া দেওনের ব্যাপার আছে।
