ফিরোজা বুঝদারের গলায় বলল, হ এইডা ঠিক। তয় ভাবিছাব, হুজুরের জাগাসম্পত্তির মালিক তো মোতাহার দাদায়ও। হেয় বাঁইচ্চা নাই, জাগাসম্পত্তির ভাগ পাইবেন আপনে আর আপনের তিন পোলাপানে। এই হগল থিকা পোলাপানডিরে আপনে বনচিত করতাছেন ক্যা?
এই বাড়ির মাইনষের কথা আমি বাদঐ দিলাম, বাড়ির প্রত্যেকটা ধুলাকণার মইদ্যেও। পাপ। এই পাপের মইদ্যে আমি আমার পোলাপানরে তাগো ভাগ চাইতে পাডামু না। আমার বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ না। ওহেনে আমি কিছু জাগাসম্পত্তি ভাগে পামু। ওইসব দিয়া পোলাপান তিনডারে মানুষ করুম। আমার মা বাপ ভাই বইনে কোনওদিন। আমারে হালাইবো না। আমার লেইগা, আমার পোলাপানের লেইগা যা করনের তারা করবো। বেবাক হোননের পর তারাও এই দোযকের মইদ্যে আমারে আর পাডাইবো না।
একটু থামল পারু। তারপর বলল, আমি পড়তাম স্বর্ণগ্রাম হাইস্কুলে। আমার পোলাপান তিনডা ওই স্কুলে পড়বো। লেখাপড়া কইরা মানুষ অইবো। আমার নিজের জীবন নষ্ট অইছে, অগো জীবন আমি নষ্ট অইতে দিমু না।
আবার একটু থামল পারু। তারপর বলল, আমি যে চিরতরে এই বাড়ি ছাড়তাছি এই কথা কেঐ জানে না। খালি তরে কইলাম। তুই যেমুন আমারে ভাল জানচ, আমিও তরে ভাল জানি ফিরি। নিখিলের কথায় তুই সাহস কইরা আমারে বেক কথা কইছস। যতদিন। বাঁইচ্চা থাকুম তর কথা আমি মনে রাখুম। নিখিল আর ফইজুর কথা মনে রাখুম। ভুইল্লা যামু খালি অগো কথা, যাগো লগে এতডি বচ্ছর কাটাইলাম, আমার জীবন যারা ছ্যাড়াভেড়া করল তাগো কথা। তাগো কথা আমি একদোম ভুইল্লা যামু, একদোম। গুয়ের পোকের কথা মানুষের মনে রাখন উচিত না।
পারু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তখন শেষ বিকাল। বৃষ্টিবাদলার নামগন্ধও নাই আজ। ঝকঝকা পরিষ্কার আকাশ। বিকালের রোদে উজ্জ্বল হয়ে আছে বর্ষাকালের দেশগ্রাম। পারুর কথা শুইনা চোখ ছলছল করছে ফিরোজার। পানি আসতে চাইছে চোখে। চোখের পানি সামলাবার জন্য অন্যদিকে মুখ ঘুরায়া সে বলল, তয় আপনের লেইগা আমার বহুত কষ্ট অইবো ভাবিছাব! এত ভাল একজন মানুষ আপনে আর আপনের জীবনডা এমুন করল আল্লায়! আহা রে!
ফিরোজার কথায় পারুরও খুব কান্না পেল। জোর করে কান্নাটা সে আটকাইয়া রাখল।
.
এতদিন পর মাজারো খালার বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে, সেখান থেকে যাবে নানাবাড়ি, শোনার পর থেকে শিরি নসু আর নূরির আনন্দ উৎসাহের সীমা-পরিসীমা নাই। দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি কইরা এইটা গুছাচ্ছে, ওইটা গুছাচ্ছে। জামাকাপড় খেলনাপাতি বইপত্র, নূরি তো তার কোল বালিশটাও নিয়া যেতে চায়।
সন্ধ্যার পর পর অনেকক্ষণ তাকায়া তাকায়া এইসব দেখল পারু তারপর বলল, এত কিছু নেওনের কাম নাই। দুই-তিনটা কইরা জামা কাপড় ল এহেকজনে আর বইখাতা। জুতা স্যান্ডেল পায়ে যেইডা থাকবো ওইডাই, বেশি নেওনের কাম নাই।
শিরি অবাক গলায় বলল, ক্যা? আমরা তো মাসহানির কম থাকুম না। এত কম কাপড় চোপড়ে কেমতে অইবো মা?
পারু আসলে এই বাড়ির কোনও কিছুই নিতে চায় না। এক কাপড়ে চলে যেতে চাচ্ছে। তাও বোনের বাড়ি গিয়া এইসব জামাকাপড় ফালাইয়া দিব। দিঘলির হাট থেকে নতুন জামা কাপড় কিনা আইনা দিব পোলাপানরে। নিজের জন্য শাড়ি কিনার দরকার নাই। বাপের বাড়ির দিককার অনেক শাড়ি পারুর আছে। সে শুধু সেগুলিই নিবে। গহনাও নিবে বাপের বাড়ির দিক থেকে পাওয়াগুলি। এই দিককার সবকিছু সে আলমারিতে রেখে যাবে।
পোলাপানরে তো আর এসব কথা বলা যায় না। বলল অন্যকথা। খালার বাইত্তে গেলে খালায় কাপড় চোপড় কিন্না দিবো নে, নানাগো বাইত্তে গেলে কিন্না দিবো নে নানায়, মামারা। তহন তো পুরানা কাপড় চোপড় আর ফিনবি না। তয় এত বোঝা টাননের কাম কী?
শিরি বলল, হ ঠিক কথা।
দুইটা ব্যাগেই চারজন মানুষের সবকিছু গুছগাছ করা হয়ে গেল। সেই ব্যাগের দিকে তাকায়া পারু মনে মনে বলল, আমি এই বাড়ির কিছুই নিতাছি না। পোলাপানে যা নিবো তাও বইনের বাইতে গিয়া হালাইয়া দিমু। এই বাড়ির কোনও চিন্ন (চিহ্ন) রাখুম না।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে সকালবেলা রওনা দিবে এই উত্তেজনায় ঘুম আসে না পোলাপান তিনটার। শুইয়া পড়ছে ঠিকই, তবে উসপিস উসপিস করছে। হাকিকি করে এ ওর লগে কথা বলে। হারিকেনের আলোয় কেবিনের ভিতরকার আলমারি খুলে বসেছে পারু। বাপের বাড়ির দিক থেকে পাওয়া গহনাগুলি পোঁটলা করে বাঁধছে একটা শালে। এই শাল কলকাতা থেকে আইনা দিছিল বড় দুলাভাই। কত বছর আগের কথা। পারুর বিয়ারও দুই বচ্ছর আগে। এতগুলি দিন চলে গেছে জীবন থেকে, জিনিসটা ঠিকই আছে। নষ্ট তো হয়ই নাই, পুরানাও হয় নাই। এখনও কেমন নতুন নতুন। গয়নাগুলি শালের ভিতর জড়াবার সময় এমন একটা গন্ধ এল, সেই গন্ধে বুকটা হু হু করে উঠল পারুর। কারণ গন্ধের সঙ্গে ভেসে এল বহুদূর পিছনে ফেলে আসা সেই জীবনের গন্ধ। কত সুখ আনন্দের দিন, কত স্বপ্নের দিন। ভাল ঘরে বিয়া হবে, মনের মতন বর হবে। সুখে আনন্দে ভাসতে ভাসতে জীবন কাটবে। কোথায় মিলায়া গেল সেই স্বপ্ন। কী জীবন কী হয়ে গেল!
নসু আর নূরি কোন ফাঁকে ঘুমায়া গেছে। শিরি তাকায়া আছে হারিকেনের আলোর। দিকে। মা’কে দেখছে শালের মধ্যে গহনা জড়াতে গিয়া কেমন উদাস হয়ে গেছে।
শিরি আস্তে করে ডাকলো, মা।
