শুনে যতটা অবাক হওয়ার কথা আতাহারের তার কিছুই হল না। অতি সাধারণ গলায় সে বলল, কই বেড়াইতে যাইবা?
পয়লা যামু পয়সা। আমার মাজারো বইনের বাড়ি। ওহেনে কয়দিন থাইকা তারবাদে যামু বেসনাল। আমগো বাইত্তে।
থাকবা কয়দিন?
হেইডা ঠিক কইতে পারি না। তয় মাসেকহানির কম না।
হ হেইডা তো অইবই। মেদিনমণ্ডল থিকা পয়সা যাইতে একদিন, ওহেনে সাত-আষ্ট দিন থাকবা, তারবাদে যাইবা হেই বেসনাল। রাজাবাড়ি দিঘিরপারের ওই মিহি। পয়সা থিকাও বিরাট দূর। ওহেনে গেলে পোনরো-বিশদিন তো থাকা অইবই।
তা অইবো। যাইতাছি তো ম্যালা দিন পর। তিন বচ্ছর।
হ।
চায়ে চুমুক দিয়া কাপটা মাটিতে নামায়া রাখল আতাহার। চিন্তাডা খারাপ করো নাই। তোমগো ওইমিহি বাইষ্যাকালে বেড়াইতে যাওনঐ ভাল। কেরায়া নৌকা কইরা যাওন। যায়। খরালিকালে মাইয়া লোকের যাওন তো বিরাট কঠিন। চৌদ্দ-পোনরো মাইল হাঁইট্টা পুরুষপোলারাঐ একদিনে যাইতে পারে না। মাইয়ালোকে যাইবো কেমতে! যাও বাইষ্যা। থাকতে থাকতে বেড়াইয়া আহো। নৌকা দিয়া যাইবা নৌকা দিয়া আইবা। ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা যাইবা আইবা। পয়লা মাজারো বুজির হৌরবাড়ি, তারবাদে নিজেগো বাড়ি। যাও ফিরত আহনের পর তো অন্য জীবন। নতুন জামাই পাইবা।
পারু একথার জবাব দিল না। মনে মনে বলল, গুয়ের পোকরে, এই হগল আমারে আর কইচ না। আমি চাই না, তর লাহান মাইনষের লগে এই জিন্দেগিতে আমার আর দেখা অউক। তুই আর কোনওদিন আমারে ছুঁইতে পারচ!
আতাহার বলল, বাবারে কইছো?
না। আগে তোমারে কইলাম। অহন তারে গিয়া কমু।
মান্নান মাওলানাকে আব্বা ডাকে পারু। এখন সেই ডাকটা তার মুখে আসল না। পারু মনে মনে বলল, জিন্দেগিতেও ওইভাবে বড় গুয়ের পোকটারে আমি ডাকুম না।
আতাহার উইঠা বসল। খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল, ঠিক আছে। তয় যাও বাবারে কও। আমার মনে হয় বাবায়ও লগে লগেঐ আমার মতন রাজি অইয়া যাইবো। হেয়ও চাইবো বিয়াশাদির আগে তুমি ইট্ট বেড়াইয়া বোড়াইয়া আহো। এই বাইষ্যায় বেড়াইতে যাইতে না পারলে আরেক বাইষ্যার লেইগা বইয়া থাকতে অইবো।
হ।
পারু উঠল। তয় আমি গেলাম।
যাও। বাবার লগে কথা কওনের আগে রান্নঘরে গিয়া রহিমারে কইয়া যাইয়ো আমার নাস্তা দিতে। চা খাইয়া খিদা যেহেনে কমে, আমার গেল বাইড়া।
পারু বের হয়ে যেতে যেতে বলল, আইচ্ছা কমু নে।
মনে মনে বলল, না কমু না। অহন থিকা এই জিন্দেগিতে তর কোনও কাম আমি আর করুম না। গুয়ের পোকের কাম গুয়ের পোকেরা করে। মানুষে করে না।
পারুর চোখের কোলে যে রাত জাগার কালিমা কাজলের মতন পড়েছে এতক্ষণ সামনে বইসা থাকার পরও আতাহার তা খেয়াল করল না। মান্নান মাওলানা তো আরও করলেন না। পারুর মুখের দিকে তিনি তাকালেনই না। পারু বাংলাঘরে গিয়া ঢোকার পর নিজের ঘরে ঢুকছেন তিনি। জানালার সামনের চেয়ারে বইসা তসবি টিপছেন। পারু আইসা ঘরে ঢুকল, দরজার সামনে দাঁড়ায়া বোনের বাড়ি, বাপের বাড়ি যাওয়ার কথাটা বলল। শুইনা মান্নান মাওলানার তসবি টিপা বন্ধ হয়ে গেল, মুখের বিড়বিড়ানি বন্ধ হয়ে গেল। অতি উৎসাহে তিনি যেন লাফায়া উঠলেন। হ হ যাও যাও। বেড়াইয়া আসো। যতদিন ইচ্ছা থাইক্কা আহো বইনের বাড়ি, বাপের বাড়ি। কবে যাইতে চাও? দুই একদিনের মইদ্যে?
পারু নরম গলায় বলল, কাইলঐ যাইতে চাই।
যাও যাও। কোনও অসুবিদা নাই। কাজির পাগলার বদু মাঝিরে খবর দিমু নে। হাফিজদ্দি আইজঐ গিয়া খবর দিয়া আইবো, কাইল বিয়ানেঐ যাতে তোমরা মেলা দিতে পারো আমি বেবস্তা নিতাছি। পয়লা তো পয়সা যাইবা?
হ।
তয় বদু তোমগো পয়সা তরি দিয়াইবোনে। এই কথা কইতেঐ আতাহারের ঘরে গেছিলা? আতাহার কী কইলো? আমি যেমতে যাইতে কইলাম অমতেই যাইতে কইছে না?
পারু মাথা নাড়ল। মনে মনে বলল, বড় ছোড দুই গুয়ের পোকের তো এককথা অইবো। দুই কথা কি আর অয়!
মান্নান মাওলানা বললেন, আমি অহনঐ হাফিজদ্দিরে বদু মাঝির বাইত্তে পাডাইতাছি। তুমি সব গুছগাছ করো গিয়া। তোমার জিনিস, তিন পোলাপানের জিনিস গুছগাছ করতেও তো সময় লাগে। যাও যাও।
মান্নান মাওলানার ঘর থেকে বের হয়ে আসার সময় পারু শোনে আতাহার চিৎকার কইরা রহিমারে ডাকছে। রহি ওই রহি, আমার নাস্তা দিলি না? তাড়াতাড়ি দে। আমার খিদা লাগছে।
পারু মনে মনে বলল, তুই গু খা, গু।
.
মান্নান মাওলানা বুঝলেন আজ ঘরে বসে সহজে সিগ্রেট ধরাবে না আতাহার।
কারণ সে জানে যখন তখন বাবা এই ঘরে আসবেন, তার লগে পরামর্শের দরকার আছে। হলও তাই। দ্রুত হেঁটে বাংলাঘরের সামনে আইসা দাঁড়ালেন মান্নান মাওলানা। আস্তে কইরা একটা কাশ দিলেন। গম্ভীর গলায় ডাকলেন, আতাহার।
আতাহার লাফ দিয়া চকি থেকে নামল। কন বাবা।
মান্নান মাওলানা ঘরে ঢুকলেন। পারু কী কইলো তরে?
ওইত্তো, বেড়াইতে যাইতে চায়।
তুই কী কইছস?
যাইতে কইছি। আপনের লগে কথা কইতে কইছি।
আমার লগে কথা কইছে। আমিও যাইতে কইছি।
হাতলআলা চেয়ারটায় বসলেন মান্নান মাওলানা। গলা নিচা কইরা বললেন, আল্লায় যা করে ভালর লেইগা করে। এইডা তো বিরাট ভাল কাম অইতাছে। পারু অগো বাইত্তে গেলে ভাদ্রমাস কাবার কইরা আইবো। আমি কাইলঐ অর যাওনের বেবস্তা করতাছি আর পশুদিনঐ ঘটকারে ডাকাইতাছি। পারু অর বাপের বাইত্তে থাকতে থাকতেঐ কাম সাইরা হালামু।
