.
মাকুন্দা কাশেমের কায়দায়ঐ বাংলাঘরে থাকে হাফিজদ্দি।
সে মেঝেতে, পুবদিককার বেড়ার লগে, আর আতাহার চকিতে। সন্ধ্যারাতেই ভাতপানি খাইয়া, তামাক খাইয়া বাংলাঘরে আইসা ঢোকে হাফিজদ্দি। চকির তলা থেকে তার কাঁথা বালিশ বাইর কইরা দরজা আবজাইয়া শুইয়া পড়ে। আতাহার কত রাতে আসে, কখন খায় ঘুমায় কিছুই সে উদিস পায় না। ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর দেখে আতাহার চকিতে বেভোর ঘুমে। নিঃশব্দে কাঁথা বালিশ ভাজ করে চকির তলায় রাইখা এমনভাবে দুয়ার খোলে হাফিজদ্দি, দুয়ার খোলার শব্দটা যেন নিজেও পায় না। তারপর বাইরে থেকে এমন করে আবজায়, শব্দ বলতে কিছু হয়ই না।
আজও সেই কায়দায় দরজা আবজাল। বেলা ভালই হয়েছে। রোদে ঝলমল করছে। চারদিক। গরম লাগছে। আতাহারের উঠতে আরও আধাঘণ্টা খানিক দেরি। পারু জানে। তারপরও এককাপ চা হাতে বাংলাঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সে। আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।
আতাহার দরজার দিকে পিঠ দিয়া শুয়ে আছে। এই গরমেও তার গায়ে পাতলা একটা কাঁথা। এটা তার অভ্যাস। যত গরমই পড়ক কথা একটা সকালের দিকে গায়ে সে দিবেই।
পারু এক পলক তাকায়া আতাহারের পিঠের দিকটা দেখল, তার পিঠের কাছে এসে দাঁড়াল। মিষ্টি আদুরে গলায় বলল, আতাহার সাহেব, ও আতাহার সাহেব। ওঠেন, ওঠেন। আপনের জইন্য আমি এককাপ চা নিয়া আসছি। এই চারে বলে বেড-টি। বিছানার চা। সাহেবরা ঘুম ভাঙনের লগে লগে এই চা খায়।
পারুর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙছে আতাহারের। তবে প্রথমেই সে পারুর দিকে মুখ ফিরাল না। পারুর কথা শেষ হওয়ার পর তার দিকে তাকাল। তাকায়া হাসার চেষ্টা করল। তাই নাকি? আপনে আমার লেইগা বেড-টি লইয়াইছেন? দেন, দেন।
মাথাটা জোর বালিশের উপর দিকে তুলল আতাহার, আধশোয়া হয়ে চা নিল। ঘটনা কী? আইজ আমার লেইগা বেড-টি?
আতাহারের ঘরে ঢোকার আগ থেকেই কলিজা জ্বলছে পারুর, কোনও রাগ ক্রোধ তার উপর হচ্ছে না। কীরকম একটা অনুভূতি যে হচ্ছে। এই অনুভূতিকে অভিমানও বলা যাবে না। সত্যই যেন আতাহারের উপর রাগ ক্রোধ, অভিমান কিছু নাই পারুর। যেটা আছে। সেটা ঘৃণা। তীব্র ঘৃণা, তীব্র! তার চেয়েও যেন বেশি ঘৃণা মান্নান মাওলানার ওপর। এই দুইজন মানুষ যেন পারুর রাগ ক্রোধ আর অভিমানের যোগ্যই না। এই দুইজন মানুষ শুধুই ঘৃণা পাইতে পারে। গিরস্ত বাড়ির টংঘরের মতন পায়খানার নীচে, যেখানে দিনের পর দিন জমে মানুষের মল, বাড়ির বউঝিরা ছাই ফালাইয়া সেই মল ঢাকতে দেরি করলে, মলের মধ্যে এক ধরনের সাদা, এক কড়ের আধাআধি মাপের পোক কিলবিল কিলবিল করে। সেই পোক দেখলে যেমন ঘৃণা লাগে, আজ সকালে আতাহারকে দেখে ঠিক তেমন ঘৃণা লাগছে পারুর। আর এই ঘরের দিকে আসার আগে কদমগাছটার ওইদিকে দেখছে তসবি হাতে, মাথায় টুপি, পরনে লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি, পায়ে নীল স্পঞ্জের স্যান্ডেল, পায়চারি করছেন মান্নান মাওলানা, তসবি টিপছেন আর বিড়বিড় করছেন। তাঁকে দেখেও রাগ ক্রোধ অভিমান কিছু হয় নাই পারুর, এই ঘরে ঢোকার আগে যে অনুভূতি সেই অনুভূতিটাই হয়েছে। এখন আতাহারের মুখ দেখে বুঝল সেই অনুভূতি হচ্ছে গুয়ের পোকা দেখে যে ঘৃণা হয় মানুষের সেই ঘৃণা।
তবু মুখে মধুমাখা হাসি পারুর। বলল, খুব জরুরি একখান কথা কইতে আইছি।
আতাহার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, আমগো কথা কওনের টাইম তো দিনে না। রাইত্রে। রাইত্রে আমুনে আইজ তোমার কাছে, তহন হুনুমনে কী জরুরি কথা।
আগে এই ধরনের কথা আতাহারের মুখে শুনলে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে শরীর ভরে যেত পারুর। রোমের কূপে কূপে সাড়া জাগত। গা কাটা দিত। মনে হত কখন রাতদুপুর হবে, কখন আতাহারকে সে পাবে!
আজ সেই অনুভূতি তো দূরের কথা, তার মনে হল পায়খানা ঘরের তলা থেকে ওইরকম সাদা দলাদলা পোকা তার শরীরের দিকে আগাচ্ছে। পারু ভিতরে ভিতরে শক্ত হয়ে গেল। একটু সইরা গিয়া টেবিলের লগের চেয়ারটায় বসল। যেন আতাহার তাকে ছুঁইতে না পারে। ছটফটা গলায় ঢঙ্গি মেয়েছেলের মতন বলল, না গো সোনার চান, না। বিয়ার আগে রাইত্রে আর দেখা হইবো না। রাইত্রে আর কথাবার্তা হইবো না।
এইটা তুমি আমারে আগেও কইছো, তারবাদেও তো রাইত্রে তোমার কাছে আমি গেছি। তয় এইডা ঠিক যে আগের থিকা কম। দুই-একদিনের মইদ্যে ইট্টু যাইতে চাই।
না, একদোম না। বিয়ার আগে আর না। কিছুতেই না।
এতদিন কেমতে থাকুম?
বেশিদিন না তো, চাইর-পাঁচমাস।
চাইর-পাঁচমাস বেশিদিন না? কও কী?
আমি কিছু বুজি না। এইডা মানতেই অইবো। তুমি যত চেষ্টাই করো রাইত্রে আমি কইলাম দুয়ার খুলুম না। তুমি জানো আমি যা কই তা করি।
চায়ে চুমুক দিয়া হাসল আতাহার। তয় আর কী করুম? ঠিক আছে। বিয়ার পরেঐ রাইত্রে দেহা অইবো তোমার লগে।
পারু খেয়াল করল সূক্ষ্ম রহস্যময় একটুখানি হাসি পলকের জন্য দেখা গেল আতাহারের ঠোঁটে। সেই হাসি দেখে পারু বুঝল তার কথা থেকে মজা নিচ্ছে আতাহার। সে তো জানেই বিয়া পারুর লগে তার হইতাছে না। সে আছে নতুন নারীশরীরের লোভে। আর পারুর শরীরের প্রতিও এই ফাঁকে তার টান একটু কমছে। সেটা না হলে সে জোর করত, রাইগা যাইত পারুর উপর।
পোক, গুয়ের পোক।
আতাহর বলল, তয় কও কী জরুরি কথা। হুনি।
পারু আবার চটপটা হয়ে গেল। আমি ইট্টু বেড়াইতে যাইতে চাই।
