মেন্দাবাড়ির মোতালেবের স্বভাব হচ্ছে গ্রামের যে কোনও বাড়ির যে কোনও কাজে মাতাব্বরিটা সে তার হাতে রাখতে চায়। আজও তাই চাইল। প্রথমেই মুর্দার যে ঘরে আছে সেই ঘরে ঢুকে গেল। বিলাপ করতে থাকা আজিজকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বাইরে নিয়ে এল। কাইন্দো না কাইন্দো না! মা বাপ কেঐর চিরদিন বাইচ্চা থাকে না। আল্লার মাল আল্লায় নিছে। কাইন্দা কী আর তারে ফিরাইয়া আনতে পারবা?
উঠানে এনে তামা পিতলের ভারের সামনে আজিজকে বসিয়ে দিয়েছে মোতালেব। আবার বলেছে, কাইন্দো না কাইন্দো না। আল্লার মাল আল্লায় নিছে। অহন টেকা পয়সা দেও কোলাপাড়া বাজারে যাইগা। কাফোনের কাপোড় লইয়াহি।
রাবির জামাই মতলেবের দিকে তাকাল মোতালেব। ঐ মতলা, তুই চদরি বাড়ি যা। বাঁশ কাইট্টা আন।
ভিড়ের মধ্যে বাদলাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাবি। মানুষজন দেখে বাদলা গেছে আল্লাইন্দা (আদি) হয়ে। মায়ের কোলে চড়ে বসেছে। যেদিকের কোলে চড়েছে সেদিকটা রাবির বেঁকে গেছে। ব্যাপারটা বিন্দুমাত্র পাত্তা দিচ্ছে না রাবি। মোতালেবের দিকে তাকিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, হেয় যাইতে পারবো না, হের কাম আছে।
মোতালেব একটু থতমত খেল। তারপর নিজেকে সামাল দিয়ে বলল, মানুষ মইরা গেছে হেরে মাডি দেওনডাই অহন বড়কাম। মতলা, তুই যা তো! বাঁশ কাইট্টা দিয়া তার বাদে কামে যাইচ।
এসময় হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এল তছি পাগলনী। মামানী বলে মইরা গেছে? কেমতে মরল, এ্যা? কেমতে মরল! হায় হায় সব্বনাশ অইছে তো!
কুট্টি বলল, মাইট্টাতেল খাইয়া মরছে।
দৌড়ে ছনুবুড়ির ঘরে ঢুকল তছি। হাউমাউ করে খানিক কাদল তারপর বড়ঘরের সামনে বসা বানেছার সামনে এসে দাঁড়াল। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল, মাইট্টা তেল তো ইচ্ছা কইরা খায় নাই, পানির পিয়াস লাগছিল, পানি মনে কইরা মাইট্টাতেল খাইছে। মরনের সমায় বহুত পিয়াস লাগে মাইনষের। আহা রে মরনের সমায় ইট্টু পানিও মুখে দিতে পারলো না!
তছির কথা শেষ হওয়ার লগে লগে দুইহাতে বুক চাপড়ে বিলাপ করে উঠল বানেছা। ইট্টু পানিও মুখেদা মরতে পারলো না গো, আল্লা গো আমার।
বানেছার বিলাপ শুনে কান্না ভুলে তছি একেবারে তেড়ে উঠল। অহন এত বিলাপ করচ ক্যা মাগী, বাইচ্চা থাকতে তো একওক্ত খাওন দেচ নাই। দূর দূর কইরা খেদাই দিছচ। তোর অইত্যাচারে চোর অইয়া গেছিলো মামানী। মাইনষের বাড়ি বাড়ি গিয়া ঘোরছে খাওনের লেইগা। অহন আল্লাদ দেহাইয়া কান্দচ তুই, না? চুপ কর, চুপ কর তুই। তোর কান্দন হোনলে শইল জ্বলে।
তছির কথা শুনে বানেছা আর লোকজন যারা এসেছে তারা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। কুট্টি মুখে আঁচল চেপে হাসতে লাগল। এখনই বানেছা আর তছির চুলাচুলি লেগে যাবে ভেবে এইদিকে একটা ধমক দিল মোতালেব। ঐ তছি চুপ কর। এত প্যাচাইল পারিচ না।
তছির দুইভাই মজিদ আর হাফিজদ্দির দিকে তাকাল মোতালেব। বলল, তরা দুইজন আলফুরে লইয়া গোরস্তানে যা। কবর খোদ। মজনু যাইয়া মান্নান মাওলানারে লইয়াহুক। আলার মারে ক নাওয়াইতে (গোসল)। কাফোন খলফা আমি লইয়াইতাছি। দুইফরের আগেঐ দাফন কইরা হালামুনে। যা, দেরি করিস না।
আজিজের দিকে তাকাল মোতালেব। দেও আজিজ, টেকা পয়সা দেও। কাপোড় খলফা লইয়াহি।
দুইহাতে চোখ মুছে আজিজ বলল, তুমি কষ্ট করবা ক্যা, আমি যাই।
শুনে মোতালেব একেবারে হা হা করে উঠল। আরে না মিয়া, তুমি যাইবা ক্যা? মা মরছে তোমার আর তুমিই যাইবা তার কাফোনের কাপোড় কিনতে, মাইনষে কইবো কী! আমরা কি মইরা গেছিনি? আমরা কি নাই? দেও টেকা দেও।
কাফনের কাপড় কিনার ব্যাপারে মোতালেবের আগ্রহ দেখে অনেকেই মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, ঠোঁট টিপে হাসল। রবার বাপ অখিলদ্দি তার পাশে দাঁড়ানো ইদ্রিসকে ফিসফিস করে বলল, কাফোনের কাপোড় থিকাও চুরি করনের তাল করতাছে মোতালেইব্বা। মানুষ এমুন অয় কেমতে? একটা মানুষ মইরা গেছে আর তার উপরে দিয়া চুরির তাল!
ইদ্রিসও অখিলদ্দির মতোই নিচু গলায় বলল, চোরের সবাব কোনওদিন বদলায় না। সুযুগ পাইলে মার নাকের ফুলও চুরি করে চোরে।
মোতালেবের উদ্দেশ্যটা যে আজিজও না বুঝেছে, তা না। এজন্যই দোনোমোনোটা সে করতাছে। কিন্তু মোতালেব নাছোরবান্দা। আতুড় (লুলা অর্থে) মেয়েটা কোলে নিয়ে তার বউও যে এসেছে এই বাড়িতে, স্বামীর স্বভাব নিয়ে লোকের কানাকানি সেও যে শুনছে, লজ্জায় মুখখানা যে অনেক আগেই নত করে রেখেছে, সেদিকে একদমই খেয়াল নাই মোতালেবের। একটা মৃত্যুর সুযোগে তার পকেটে যে আসবে কয়েকটা টাকা সেই স্বপ্নেই বিভোর হয়ে আছে সে। বারবারই তাগিদ দিচ্ছে আজিজকে। দেরি কইরো না মিয়া। বেইল অইতাছে। কোলাপাড়া যাইতে আইতে সময় লাগবো।
শেষ পর্যন্ত না পেরে অসহায়ের মতো মোতালেবের দিকে তাকাল আজিজ। কত লাগবো?
দেড় দুইশো টেকা দেও। কাপোড় খলফা গোলাপ পানি আগরবাত্তি, এমুনঐ লাগবো। বাচলে তো হেই টেকা তোমারে ফিরত দিমু। এত চিন্তা করতাছো ক্যা?
আজিজ কাতর গলায় বলল, এত টেকা লাগবো!
তয় লাগবো না? মুদ্দারের খরচা কী কম?
অখিলদ্দি বিরক্ত হয়ে বলল, দিয়া দেও আজিজ। অরে বিদায় করো।
অখিলদ্দির খোঁচাটা বুঝল মোতালেব, গায়ে মাখল না। এই সব খোঁচা গায়ে মাখলে পকেটে পয়সা আসবে কেমনে!
