আতাহাররে পাইয়া সেই দুঃখটা আমি ভুলছিলাম। শরিল মন দিয়া তারে আমি চাইছি, পাইছি। জিন্দেগিড়া তার লগে কাটাইতে চাইছি। যদিও এই বাড়িডা কোনও মাইনষের বাড়ি না। এইডা শয়তানের কারখানা, দোযক, জাহান্নাম। আল্লাহর খাসবান্দা হিসাবে পরিচিত মানুষটা, আমার শ্বশুর, আমি তারে আব্বা ডাকি, ওইডা তো মানুষঐ না। ওইডা একটা বদ। মাকুন্দার লগে যেইডা করল ওইডা তো কোনও মাইষের কাম না। আমার লগে যেইডা করল, এইডা তো কোনও মাইনষের কাম না। অরে আল্লায় পাক পবিত্র মাটি দিয়া বানায় নাই, অরে বানাইছে শয়তান ইবলিসের খারাপ জাগার আড়ি গোস্ত দিয়া।
পয়লা পয়লা আল্লার কাছে কইতাম, আল্লাহ, আমারে এইরকম এক দোজকে আইন্না ঢুকাইলা? একদিকে স্বামীর এই অবস্থা আরেক দিকে একটা বদবাড়ি। মাওলানা হিসাবে পরিচিত লোকটা বদমাইশের আড্ডি। পারলে পোলার বউর লগে শোয়। বাড়ির ঝি রহিমা…
আতাহারের কারণে এই দোজকও আমার সইয়া গেছিল। আমি আছিলাম আমারে লইয়া। তিনডা পোলাপান আর আতাহাররে লইয়া, নিজের সুখ আনন্দ লইয়া। অন্য কোনও মিহি আমি চাইয়া দেহি নাই। শ্বশুরে যার লগে ইচ্ছা করুক, আতাহার কিছু না করলেঐ অয়। তাও তার টুকটাক দুই-একখান কথা কানে আইছে। যেমুন নিখিলের বাইল্য বিধবা বইন। ফুলমতিরে সে পছন্দ করে। গোপন একখান খায়েশও ফুলমতির উপরে আছে। ফিরোজার উপরেও চান্স লওনের চেষ্টা করছে। বাপ-পোলা দুইজনেই করছে। ফিরোজা চালাকি কইরা দুইজনরে ঠেকাইতাছে। এইসব লইয়া আতাহাররে দুই-একবার খোঁচাখুঁচি করছি আমি। ঠাট্টা মশকরা করছি। আতাহারও হাসি মজা লইয়াঐ ওই হগল কথার পিঠে কথা কইছে। অরা তো জাত হিসাবেই খারাপ। বাপ খারাপ হইলে পোলা আর কত ভাল হইবো? তয় কোনও কোনও পোলা মা’র স্বভাবও পায়। আহা রে, আতাহার যুদি অর মা’র স্বভাবটা। পাইতো! যুদি মানুষটা ইট্ট ভাল হইতো!
তারপরও এই মানুষের লেইগা আমি পাগল। সে খারাপ হউক, বদ হউক, আর যাই হউক, আমি তো খারাপও না, বদও না। আমি তো তারে ভালবাসি, তারে চাই। সে যা। ইচ্ছা হউক, আমি থাকুম আমার মতন। তারে ছাড়া দুনিয়ার আর কিছু বুঝুম না। এর লেইগা, খালি এর লেইগা তারে ছাইড়া, এই বাড়ি ছাইড়া কোনওহানে আমি যাইতে চাই না। আইজ তিন বচ্ছর মাজারো বইনের বাইত্তে যাই নাই, বাপের বাইত্তে যাই নাই। বড় বইন থাকে ঢাকায়, ঢাকায় তো যাই নাই। বাবায় মাঝে মাঝে বাইত্তে আইয়া দুইমাস-তিনমাস থাকে, বড় দুই ভাইরা আইসা থাকে। কত আমদ আনন্দ হয় বাড়িতে। ঢাকা থিকা বড় বইন আসে, পয়সা গ্রাম থিকা যায় মাজারো বইনে। কত পোলাপান, কত। হইচই। আমার পোলাপান তিনডাও আমার লেইগা যাইতে পারে না নানার বাড়িতে। আমি আতাহারের লেইগা যাই নাই। তারে না দেইখা, তারে ছাইড়া দুইটা দিনও য্যান কোনওহানে টিকতে পারুম না আমি। রাইত্রে আমার ঘুম অইবো না, আমার খাইতে ইচ্ছা করবো না, নাইতে ইচ্ছা করবো না। পোলাপানের মিহি চাইতে ইচ্ছা করবো না, সাজতে ইচ্ছা করবো না। তার থিকা না গেলাম কোনওহানে। আতাহাররে লইয়া, নিজেরে লইয়া এই বাড়িতেই আনন্দে থাকি। মানুষের তো দোয়কখানায়, পাগলাগারদে, জেলখানায় থাকতেও থাকতেও অভ্যাস হইয়া যায়। আমারও এই বাড়িতে থাকতে থাকতে অভ্যাস। হইয়া গেছে। আতাহারের লগে থাকতে থাকতে অভ্যাস হইয়া গেছে। অরে না দেইখা আমি থাকতে পারুম না।
এই পয়লা আমার সবকিছু এলোমেলো হইয়া গেছে। আমার দুনিয়াদারি বদলাইয়া। গেছে। ভাঙ্গা মন ফাটা কইলজা, ভিতরে এক উপরে আরেক, এই অবস্থায় মানুষ বাঁচতে পারে না। আমারও মইরা যাইতে ইচ্ছা করে। ফইজুর কাছে হেননের পর ওই রাইতেই একবার ইচ্ছা হইছিল ঘরের ছাইছের আমগাছটার ডাইলের লগে গলায় দড়ি দেই। ফিরোজা। বলার পরও মনে হইছে। মরণের কথা মনে হইলেই পোলাপান তিনডার চেহারা দেহি চোকে। আমি মইরা গেলে আমার পোলাপান তিনডারে দেখবো কে? অগো জন্ম দিয়া গুনাহ করলে আমি করছি, অরা তো করে নাই। অগো মা-হারা করনের অধিকার আমার নাই। বাপ না হইয়াও বাপ একজন অগো আছিল, হেয়ও নাই। আমি মইরা গেলে আতাহার বিয়া কইরা নতুন বউ আনলে হেই বউয়ে আমার পোলাপান তিনডারে চাকর বাকর বানাইয়া হালাইবো। আমার অনাথ এতিম পোলাপান তিনডারে নানান পদের অইত্যাচার করবো। পোলাপান তিনডা আমার মাগো মাগো কইরা কানবো!
শিরি বড় হইতাছে। দুই-এক বচ্ছর পর আমার মাইয়ার উপরে বদদৃষ্টি দিবো কে না কে! আমি না থাকলে ওই হগল শয়তানের হাত থিকা অরে রক্ষা করবো কে! অল্প বয়সেই। আমার মাইয়াডারে নষ্ট কইরা হালাইবো অরা। পোলাডা যাইবো ভাদাইম্মা অইয়া। তারপর ছোড মাইয়াও বড় অইবো। অর দশাও অইবো শিরির মতন।
না না, না। এইডা আমি হইতে দিমু না। আমি আমার পোলাপানরে রক্ষা করুম। আমি আমার পোলাপানরে মানুষ করুম। এই দোয়কখানা থিকা, শয়তানের আখড়া থিকা বাইর কইরা লইয়া যামু অগো। এই বাড়ির মাইনষের বদছায়া পড়তে দিমু না অগো উপরে। অগো লেইগা আমি নতুন কইরা বাঁচুম। নতুন মানুষ হইয়া যামু। তয় এই বাড়ির কেঐরে কিছু বুঝতে দিমু না। যেমতে এতদিন চলছি অমতে চইলাই এই বাড়ি থিকা বাইর অমু। পোলাপান তিনডারেও অহন বুঝতে দিমু না কিছু। যা কওনের পরে কমু। এহেন থিকা বাইর হওনের পর।
