পরের পথটাই আমি বাইচ্ছা নিলাম। না, আমি যে ঘটনা জানছি এইডা কেঐরে বুঝতে দিমু না। আমি আমার মতন চলতে থাকুম। আমার মুখ দেইখা, চালচলন আচার আচরণ দেইখা কেঐ য্যান কিছু বুঝতে না পারে।
পরদিন বিয়ানে আমি আগের মানুষ অইয়া গেলাম। তয় ভিতরে ভিতরে কইলজাড়া আমার পোড়ে। উপরে আমি এক মানুষ, ভিতরে আরেক। এই ফাঁকে অন্য একখান কথাও আমার মনে অইছে। একদিনের পরিচয় ফইজুর লগে। বছির ঘটকের গোমস্তা। তার কথা বিশ্বাস করন কি আমার ঠিক অইতাছে? ফইজু মিছাকথা কয় নাই তো?
আবার চিন্তা করি, ওই বেডা আমার লগে মিছাকথা কইতে আইবো ক্যা? তার কী ঠেকা পড়ছে? একদিন খাতির কইরা মুড়ি মিডাই আর চা খাওয়াইছিলাম, আমারে ভাল মানুষ মনে করছে হের লেইগাঐ কথাডি আমারে কইছে। আমার কাছে অর তো কোনও স্বার্থ নাই। তয় ফইজু যে এই বাইত্তে আইছিল, ঘটকায় তিনশো টেকার লেইগা পাঠাইছিল এই কথা আমি কেঐরে কই নাই। আমার শ্বশুররে জানান উচিত আছিল। জানাই নাই ইচ্ছা কইরা। পরে যুদি তারা কোনওরকমে জাইন্না যায় ঘটনা আমারে ফইজু জানাইছে, তয়। একজন নিরীহ মানুষ বিপদে পড়বো। আতাহার অরে মাইর ধইর দিবো। ঘটকার কাম থিকা ছাড়াইয়া দিবো। ভাবলাম, পরে যুদি আব্বায় আমারে জিগায়, ঘটকায় অর গোমস্তা পাডাইছিল হেইডা আমারে কও নাই ক্যা, তহন মিছাকথা কমু। ভুইল্লা গেছিলাম আব্বা। হেয় বিরক্ত অইবো, অউক গিয়া, আমার কী?
ফইজুর পর আইজ শুনলাম ফিরোজার কাছে। আতাহার নিজেই কইছে নিখিলরে। নিখিল পোলাডা ভাল। আমারে জানানের পথ হিসাবে ধরছে ফিরোজারে। এরপর আর বিশ্বাস না করনের কী আছে। ফইজুর মুখে শুইনা আমি একবার মইরা গেছিলাম, একবার কইলজাড়া আমার ফাটছে, ফিরোজার মুখে শুইন্না আমি আবার মরলাম, ফাটা কইলজা আবার ফাটলো। ফাইট্টা চৌচির হইয়া গেল। মনে অইলো আমারে লইয়া বাপ-পোলার চালাকির কথা নিজ কানে শুইন্না আমার শাশুড়ি যেমুন সইজ্য করতে পারে নাই, হাট এটাক। করল, উঠানে পইড়া মইরা গেল, আমিও মনে অয় অমতেই মইরা যামু। ফিরোজার মুখের মিহি চাইয়া রইলাম। চোক্ষে পলক নাই।
তখন বিকাল। বিকালের দিকে আমার একটু সাজগোজের অভ্যাস। ফইজুর মুখে ঘটনা শোনার পর থিকা আমি তো আসলে দুইজন মানুষ। উপরে এক, ভিতরে আরেক। কাউরে কিছু বুজতে দিতাছি না। এই অবস্থায়ও পুরানা অভ্যাসটা চালু রাখছি। সাজগোজ ইকটু করছি। শিরি নসু নূরি তিন ভাইবইনে মিল্লা কুতকুত খেলতাছে উঠানে। নূরি আইজ বিকালে আর গনি কাকাগো সীমানায় যায় নাই। সকাল দোফর বিকাল তিনবেলাই হিরা মানিকের লগে থাকে। তিনটা পোলাপানের লগে মুকসেদ অইছে আরেক পোলাপান। একদম পোলাপানের মতন পোলাপান তিনডার লগে মিলামিশা গেছে। অগো মতন কইরা অগো লগে খেলে, হাসে, মজা করে।
এই লোকটার ঘটনা শুইনা বহুত খুশি লাগছে আমার। নামকরা দাগি চোর আথকা দুইডা পঙ্গু পোলাপান আর গরিব মাস্টার মানুষের পরিবারের লগে জড়াইয়া গেল। চুরি ধাউরামি ছাইড়া দিল, পঙ্গু পোলাপান দুইডার সেবাযত্ন করে, এমনকী গু-মুত তরি সাফ করে। হিরা মাইয়া, মোল্ল-সতরো বচ্ছর বয়স, পঙ্গু অউক আর যাই অউক, মাইয়া তো, অরে পয়পরিষ্কার করে মাস্টারের বউ আর মানিকরে করে মুকসেদ। নিজে কোষানাও কিন্না মাস্টাররে লইয়া ছাত্রগো বাড়িতে যায় নাও বাইয়া। বাড়িত থিকা নিজের ভাগের চাউল ডাইল টেকাপয়সা আইন্না দেয় মাস্টাররে। বাজার কইরা দেয়।
কারণডা কী?
কারণডা হইলো, তার চোর জীবন মানুষের জীবন আছিলো না। জন্মাইছে মানুষ হইয়া কিন্তু জীবন মানুষের হইল না এর লেইগা শেষ জীবনডা সে মানুষ হইয়া বাঁচতে চায়। জীবনের বেবাক গুনা আল্লায় য্যান মাপ করে এর লেইগা মাস্টারের পঙ্গু পোলাপান দুইডার দায়িত্ব নিছে। মাথায় টুপি দিয়া মাস্টারের মতন একজন ভাল মানুষের লগে থাইকা মানুষ হওনের চেষ্টা করতাছে। চোর বদলাম ঘুচাইয়া মরণের সমায় য্যান মানুষ হিসাবে মরতে পারে।
এইসব কথা আমারে বলছে মাস্টারের বউ।
সেদিনের পর থিকা মুকসেদের কথা আমার খুব মনে হয়। একটা খারাপ মানুষ ভাল। হইয়া গেল আর আল্লার খাসবান্দা হিসাবে পরিচিত আমার শ্বশুর, মান্নান মাওলানা সে করতাছে এই কাম? স্ত্রীর লগে আমারে লইয়া বেইমানি করল, আপন পোলার বউ আমি, আমার লগে করল এই কাম! আতাহার পুরুষপোলা, অল্প বয়স, এই বয়সে তার মতিগতি নানান পদের অইতে পারে, হেয় পরহেজগার লোক, হেয় ক্যান পোলারে ধমক দিয়া ঠিক করলো না?
আমি মনে করি আতাহারের থিকা ওই শুয়োরের পোর দোষ বেশি। টেকার লোভে ওঐ কলকাঠি লাড়তাছে। পোলা বিয়া করাইয়া ধান্দা করবো। একবারও আল্লাহর কথা ভাবে না। হাসরের দিনে আল্লাহয় যে অরে কেমতে তেল মজাইবো!
ফইজুর কাছে যা শুনছি ফিরোজাও তাই কইলো। নতুন কথা খালি একখান, আমার শাশুড়ির মরণের ঘটনা। আহা রে, আমার লেইগা শেষ চেষ্টাটা সে করল! স্বামী আর পেটের পোলার চালাকি সইজ্য করতে না পাইরা মরলো। আল্লাহ, আল্লাহ তুমি তারে বেহস্ত নসিব কইরো। সে মানুষটা বড় ভাল আছিল। আমার লাহান তারও পোড়া কপাল, একটা বদের লগে জীবন কাটাইয়া গেল। আমি পয়লা পয়লা মনে করছিলাম, আমার স্বামীর শরিলের খবর জাননের পর মনে করছিলাম, আমার জীবনডা আল্লায় ক্যান এমুন কইরা পাডাইলো। আমি এমুন মাইয়া আর আমার কপালে জুটলো এমুন স্বামী?
