আমার কথা হুইন্নাও যুদি হেয় গলায় দড়ি দেয়?
না হেইডা দিবো না।
ক্যা?
হেয় বুদ্ধিমতি মাইয়া। নিজে গোপনে খোঁজখবর লইয়া বোজনের চেষ্টা করবো ঘটনা সত্য কি না। যহন জানবো সত্যঐ এমুন কারবার অইতাছে তহন হেয় যা করনের করবো। হুজুর আর আতাহারের লগে কাইজ্জাকিত্তন করতে পারে, বিয়া বন্দ করতে পারে। আমি চাই হেয় হের অধিকারডা আতাহারের কাছ থিকা আদায় করুক। তুমি তারে এইডাই। বুজাইবা। আতাহার আর হুজুরে যেই চালাকি অর লগে করছে হেই চালাকির শোদটা য্যান হেয় লয়। অগো য্যান ছাইড়া না দেয়। এই জিদটা তার মইদ্যে তুমি ঢুকাইয়া দিবা।
ফিরোজা চিন্তিত চোখে নিখিলের মুখের দিকে তাকায়া রইল।
.
অনেক কিরা কছম দিয়া ফিরোজা আমারে কথাগুলি বলছে। যেদিন নিখিল অরে বলছে তার দুইদিন পরের ঘটনা। এই দুইদিন ও চিন্তা করছে কথাগুলি আমারে বলা ঠিক হইবো। কি না! ও কোনও প্যাঁচঘোচের মইদ্যে পইড়া যাইবো কি না! তারপর সাহস কইরা বলতে আসছে। নিখিল নিজে ক্যান সরাসরি আমারে বলতে পারে নাই তাও বলছে। আর ক্যান। অরা দুইজনে মিলা ঘটনা আমারে জানাইতে চায় তাও বলছে। আতাহারের বিয়াশাদি ঠিকঠাক অইয়া যাওনের পর আমি য্যান কোনও অঘটন না ঘটাই। আগে থিকাই য্যান। আতাহার আর অর বাপের লগে, আমার হৌরের লগে কথাবার্তি কইয়া বেবাক কিছু ঠিকঠাক করি। বিয়া য্যান আতাহার আমারে করতে বাইধ্য হয়। অন্য জাগায় বিয়ার কথা য্যান চিন্তা না করে।
ফইজুর মুখে এই ঘটনা আমি আগে শুনছি। শোননের পর থিকা খালি চিন্তা করছি আমি অহন কী করুম? কেমতে সামাল দিমু বেবাক কিছু? আতাহার আর অর বাপে যেই পদের মানুষ এইরকম দুইডা শয়তানের লগে আমি পারুম? অরা তো আমারে বাঁচতে দিবো। আমার পোলাপান তিনডার মিহিও চাইবো না। দরকার অইলে অগেও ক্ষতি করবো!
তয় আতাহার মানুষ যেমুনঐ অউক, আমি তারে ভালবাসি। আমার পোলাপান তিনডার বাপ সে। সেই প্রথমদিন তার লগে সহবাস করার পর থিকা ওই একটা কারণে আমি তার। লেইগা পাগল। সে আমার মাথা ধরার অষুদ। সে আমার রাতের ঘুম, দিনের আনন্দ। এই যে বিধবা হইয়াও এত আনন্দ লইয়া আমি বাঁইচা আছি, তার কারণ সে। আমি আসলে নিজেরে বিধবা মনে করি না। আমি মনে করি আমার জামাই বাঁইচা আছে, আমার পোলাপানের বাপ বাইচা আছে। শাশুড়িরে মুখ ফুইটা তার লগে বিয়ার কথা যেদিন কইলাম, শাশুড়িও সব বুইঝা যখন বেক কিছু ঠিক করল, তার লগেঐ আমার বিয়া অইবো। সে তো মাইনা নিছেঐ, আমার শ্বশুরেও মানছে হোননের পর থিকা। আমার আনন্দ একটাই। মনে মনে যারে স্বামী মনে করি তারে অহন শরিয়ত মতন স্বামী হিসাবে পামু। পোলাপান তিনডার। ব্যাপারে আমার মনের মইদ্যে আর কোনও ঝামেলা থাকবো না। কোনও দোষে দুষি মনে করুম না নিজেরে। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার, লাখ লাখ শুকুর গুজার করছি।
বিয়া হইবো হইবো, তখন গেল শাশুড়ি মারা। বিয়া পিছাইয়া গেল। আতাহার এক রাইতে কইলো শীতের দিনে বিয়া অইবো। আব্বায় বলে কইছে। আমি হেই আশায়। আছি। তারবাদে আথকা কই থিকা কেমতে কইরা ফইজু আইলো, ঘটনা জানলাম। অর্থাৎ আল্লায় আমারে জানাইয়া দিল। হেই জানানের ধাক্কায় কইলজাড়া আমার ফাইট্টা গেল। ভিতরে ভিতরে ছ্যাড়াভেড়া অইয়া গেলাম আমি। আথকা এমুন একখান খবর, কী থুইয়া কী করুম পয়লা কহেক মিনিট নাকি কহেক ঘণ্টা বুজতেই পারলাম না। ঘরে গিয়া খাটে ইট্টু বইয়া রইলাম, ভাল্লাগে না। ইট্টু শুইয়া রইলাম, ভাল্লাগে না। উইট্টা মন্তাজ কাকাগো সীমানায় গেলাম, গনি কাকাগো সীমানায় গেলাম, ভাল্লাগে না। খালি মনে অয় দম বন্ধ হইয়া অহনঐ মইরা যামু। কেউ আমার মনের অস্থিরতা বোঝে না, মুখের মিহি চাইয়াও বোঝে না কিছু। সন্ধ্যা হইল, রাইত হইল, রহিমারে কইলাম, আমার শইলডা ইট্ট খারাপ লাগে। আমি হুইয়া রইলাম। তুমি বেবাকতের খাওনদান দিয়ো।
হঠাৎ ঝমঝমাইন্না বিষ্টি। হেই বিষ্টির মইদ্যেই রাইতের খাওনদাওন বেবাকতেরে দিল রহিমা। আমি একটা কেতামুড়া দিয়া খাটে শুইয়া রইলাম। পোলাপানে খাইয়াদাইয়া আহনের পর দুয়ার মুয়ার লাগাইয়া কেবিনে গিয়া শুইলাম। শিরি আর নসু হারিকেনের আলোয় অনেকক্ষুন পড়ল। নূরি শোওনের লগেঐ ঘুমাইয়া গেছে। আমি নূরির পাশে শুইয়া কাঁথা মুড়া দিয়া এমুন ভাব করলাম, য্যান বেভোর ঘুমে।
শিরি বড় হইছে। সংসার টুকটাক বোঝে। দুই ভাইবইনে পড়া শেষ কইরা হারিকেন নিভাইয়া শুইয়া পড়ল। পোলাপান মানুষের ঘুমের কোনও সমস্যা নাই। শোওনের লগে লগেঐ ঘুম। আমার ঘুম আহে না, কইলজা জ্বলে, বুক ফাইট্টা কান্দন আহে। এই কান্দন আমি ঠেকাইতে পারি না। রাইত দোফরে আর শুইয়াও থাকতে পারি না। মনে অয় বুক ফাইট্টা মইরা যামু। কেঁতার তলে দম বন্দ হইয়া আসে। তহন আর বিষ্টি নাই। নিটাল হইয়া আছে আল্লার দুনিয়া। কেঁতার তল থিকা আস্তে কইরা বাইর অইলাম আমি। চুপচাপ বইয়া রইলাম। তনহ দেহি আর নিজেরে ঠিক রাখতে পারি না। কান্দনের চাপে বুক ফাইট্টা যায়। কোনও মতেই চাইপ্পা রাখতে পারি না।
কানলাম, দুই হাতে মুখ চাইপা কানলাম। তাও আওজ মনে হয় পুরাপুরি ঠেকাইতে পারি নাই। ইট্টু ইট্টু আওজ মনে হয় হইছে। অনেকক্ষুন কানছি, অনেকক্ষুন। দেহি বুকের ভার ইট্টুহানি কমছে। আর এই ফাঁকে একহান সিদ্ধান্তও নিতে পারছি। কী করুম অহন, কেমতে চলুম। বাড়ির মাইনষেরে বুজতে দিমু যে আমি তাগো বাপ পোলার চালাকি জাইন্না ফালাইছি, নাকি কেঐরে কিছু বুঝতে না দিয়া দেহুম তারা কেমতে কী করে? ঘটনা কোনমিহি যায়?
